ঢাকা, শনিবার 11 March 2017, ২৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনেই অধিকাংশ দলের অংশগ্রহণ ছিল অনুপস্থিত

 

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: স্বাধীনতার ৪৭ বছরের ইতিহাসে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর কোনোটিই সুষ্ঠু হয়নি। এমনকি এসব নির্বাচনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণও ছিল অনুপস্থিত। সর্বশেষ নির্বাচনে দেশের ২৮টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতাসীনদের আবারো সরকারে থাকার অন্যায় আবদারের কাছে জনগণকে মাসের পর মাস জি¤িী থাকতে হয়েছে। যার ফলে দেশে বারবার জ্বালাও-পোড়াওসহ হরতাল অবরোধের ন্যায় কঠোর কর্মসূচি পালিত হয়েছে। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও চলছে সন্দেহ-সংশয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, তাদের সরকারের অধীনেই আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট বলছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে কখনই সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। এমনকি দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনেও তারা যাবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ন্যায় আবারো যদি দলীয় সরকারের অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় তাহলে সেটিতেও অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। উত্তপ্ত হবে রাজপথ। দেশে আবারো শুরু হবে সংঘাতের রাজনীতি। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একদিকে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে বলছে তাদের হাতে ক্ষমতা যেতে দেয়া যাবে না। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তাহলে আওয়ামী লীগ কী চায়? আওয়ামী লীগ আসলে সেটাও বলছে না। তাহলে কি আওয়ামী লীগ আসলে জোর করেই ক্ষমতায় থেকে যেতে চায়। যদি তারা (আওয়ামী লীগ) আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করতে চায়, তখন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংলাপ-আলোচনায় আপত্তি কেন? 

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, বাংলাদেশের ৪৭ বছরের ইতিহাস যদি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যায় যে আগামী জাতীয় নির্বাচন কোনোভাবেই সুষ্ঠু হবে না। তিনি বলেন, আমাদের বর্তমান যে বড় দু’টি প্রধান রাজনৈতিক দল রয়েছে তাদের অধীনে কখনই সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৪৭ বছরে ১০টি নির্বাচনের মধ্যে ৬টি হয় দলীয় সরকারের অধীনে। এর মধ্যে ৪টি হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধীনে, আর ৬টি হয়েছে দলীয় সরকারের অধীনে। যে ৬টির মধ্যে এখন পর্যন্ত একটাও ভালো নির্বাচন হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ওই নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের অধীনে ২টি হয়েছে, বিএনপির আধীনেও ২টি নির্বাচন পরিচালিত হয়েছে। এমনকি জাতীয় পার্টির অধীনেও ২টি নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। যে নির্বাচনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় যে, কোনোভাবেই ভালো হয়নি। শাহদীন মালিক আরও বলেন, ওই সময়গুলোতে আওয়ামী লীগ ’৮৮, ’৯৬ ও ২০০৭সহ ৩ বার তারা নির্বাচন বয়কট করেছেন। বিএনপি বয়কট করেছে ’৮৬, ’৮৮ ও ২০১৪সহ ৩টি। এমতাবস্থায় মূল কথা হলো, দলীয় সরকারে অধীনে যে ৬টি নির্বাচন হয়েছে সেই ৬টি নির্বাচনের একটাও ভালো হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী নির্বাচন ভালো হবে কিনা সেটা আমরা সবাই বুঝতে পারছি।

তিনি আরও বলেন, ধরে নিলাম আমরা যে আগামী নির্বাচন আওয়ামী লীগের অধীনেই ভালো হবে, কিন্তু আমার কথা বা প্রশ্ন হলো ভালো যে, হবে তেমন কোনো কর্মকাণ্ড তো এখন পর্যন্ত আমরা দেখতে পাচ্ছি না বা সামনে যে এক বছর সময়ে আছে তার মধ্যেও যে পরিবর্তন ঘটাবে তারও কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।

শাহদীন মালিক বলেন, আমাদের রাজনৈতিক আলোচনার ৫০ বছর হয়ে গেল। তার পরেও আমরা গণতন্ত্রের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না যে, নির্বাচন আমরা কেমন করে করবো, নির্বাচনে ভালো হবে কিনা, নির্বাচনে কি গণতান্ত্রিক? নির্বাচনে কি কালোটাকার ছড়াছড়ি হবে? এই আলোচনা থেকেই আমারা কাটিয়ে উঠতে পারছি না। সুতরাং আমাদের মনে হয় এটা রাজনৈতিক বড় ব্যর্থতা যেটা আমাদের জাতির জন্যও বড় ধরনের ব্যর্থতা। আমার মনে হয় আফ্রিকায় যাদের গণতন্ত্রের কোনো ইতিহাস-ঐতিহ্য নেই তাদের সাথে আমরা একাকার হয়ে গেছি। কারণ, আফ্রিকার প্রতিটা দেশেও সরকারও সংবিধানের দোহাই দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন করে না এমন কোনো নেতা আফ্রিকায় নেই। এমতাবস্থায় আমার কথা হলো, আমরা কেন ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না? যেখানে আমাদের পাশে ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ বেশ কয়েকটি দেশ বেরিয়ে গেছে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ব্রতির নির্বাহী পরিচালক শারমিন মোরশেদ বলেন, আমি এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে চাইব, এমনভাবে একটি নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হোক যেখানে দেশের সব রাজনৈতিক দল অংশ নিতে পারে। জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে নিশ্চয় সরকার ওয়াকিবহাল। তারা চাইবে না আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেটা আরো ঘনীভূত হোক। 

সূত্র মতে, বাংলাদেশ এখন হতাশার কাল পার করছে। ভবিষ্যতে কি হবে এটা নিয়ে জনগণ খুবই উদ্বিগ্ন। অনেকেই মনে করেছিলেন, সার্চ কমিটির মাধ্যমে যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে সেটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। যোগ্যতমদের নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। আর দেশে একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ সুগম হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরই ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটলো। তাদের দল ও জোটের পছন্দের লোকদের দিয়েই নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলো। বলা হচ্ছে, এই নির্বাচন কমিশন সাবেক সর্বজন সমালোচিত রকিব কমিশনার থেকেও খারাপ হবে। যার প্রমাণ এরই মধ্যে পাওয়া শুরু হয়েছে। যদিও সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদকে জানিয়েছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব অনুযায়ী সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সকল কার্যক্রম গ্রহণ করবে। 

অভিযোগে প্রকাশ, কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচন কমিশন শুরুতেই অনেকটা হোঁচট খেয়েছে। নতুন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনেই জনগণের সাড়া মেলেনি। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা ও উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়নি। এর মধ্যেও কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি, এজেন্টদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে। বেশকিছু কেন্দ্রে জাল ভোট, প্রকাশ্যে সিল, কেন্দ্র দখল ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নানা অনিয়মের অভিযোগে কয়েকটি স্থানে নির্বাচন বর্জন করেছেন বিএনপির প্রার্থীরা। বরিশালের গৌরনদী উপজেলা পরিষদের উপ-নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের প্রকাশ্যে সিল মারতে দেখা যায়। অনিয়মের ছবি তুলতে গেলে সাংবাদিকদের ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে ছবি ডিলিট করে দেয়া হয়। ১৪টি উপজেলা পরিষদ ও ৪টি পৌরসভায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৫০ শতাংশেরও কম ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। আর এ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন ইসিকে সাধারণ মানুষ কিভাবে গ্রহণ করেছে তা প্রতীয়মান হয়েছে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞগণ। নির্বাচন যেমন ছিল নিরুত্তাপ, তেমনি উৎসবহীন। 

নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বর্তমান সিইসি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বুলি শুনিয়ে আস্থা অর্জনের কথা বলেছেন। অথচ সামান্য মাত্র কয়টা উপজেলা ও পৌর নির্বাচনে যেভাবে কেন্দ্র দখল করে ভোট ডাকাতি হয়েছে, যেভাবে বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া হয়েছে, যেভাবে মারধর করে বিএনপির এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে তার উত্তর তিনি কি দিবেন? শুধু তাই নয়, তিনি নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে ব্যর্থ হওয়ায় মাত্র কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মতো নির্বাচনেও সর্বনি¤œ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল। সুতরাং তিনি ব্যর্থতা দিয়েই যাত্রা শুরু করলেন। আসলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর আস্থা অর্জনের জন্য, জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য নয়।

ক্ষমতাসীনদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেযার বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ছাড়া এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না। নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে এবং সেটি হতে হবে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আগামী দিনে নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বিএনপি নির্বাচনে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে না। 

বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বিএনপিকে জুজুর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। প্রয়োজনে তারা কেয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন, তবুও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে জাতীয় নির্বাচনে যাবেন না। 

সূত্র জানায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সাফ কথা, নির্বাচনকালীন যে সরকারেই হোক না কেন, সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো নয়ই, এমনকি দলীয় কাউকে মানা হবে না। সরকারপ্রধান নির্দলীয় হতে হবে। তাই জনগণের ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সর্বশক্তি দিয়ে রাজপথে নামা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। জোটের একাধিক নেতা জানান, নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে তারা আপোষ করবেন না। 

আন্দোলনের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, আমরা একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা কি হয়েছে সবাই দেখেছে। তারপরও আমরা নির্বাচনে যেতে চাই। তবে সেজন্য নির্বাচনকালীন সরকারকে নিরপেক্ষ হতে হবে। সরকার যদি এটি না করে তাহলে আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি আদায় করা হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার বিএনপিকে নিয়ে যেসব কথাবার্তা বলছে, সেটি তারা ভয়ে বলছে। কারণ তারা জানে, নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে। তাই তারা যেনতেনভাবে ক্ষমতায় থাকতে চায়। এবার দেশের জনগণ সেটি হতে দিবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ