ঢাকা, শনিবার 11 March 2017, ২৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত

সন্তান মা-বাবার বুকের ধন। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও মা-বাবা সন্তানের সুখ প্রত্যাশা করেন। সন্তান কষ্টে থাকুক, অসুখী জীবনযাপন করুক কোনও মা-বাবাই তা চান না। চাইতে পারেন না। তবে মা-বাবা কখনও কখনও বাধ্য হয়ে সন্তানকে সাময়িক শাস্তি দেন। দূরে সরিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে পড়েন। এমনই এক ঘটনা ঘটেছে উত্তরের জনপদ বগুড়ার ধুনটে। বাবার অভিযোগে ১৯ বছর বয়স্ক ছেলে রিপন মাহমুদকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। খবরটি খুব ছোট করে গত বুধবার বাংলাদেশ প্রতিদিনের ভেতরের পাতায় ছাপা হয়। ধুনটের পাঁচথুপি সরোয়া গ্রামের সাইফুল ইসলাম মাদকাসক্ত ছেলে রিপনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সোপর্দ করেন। গত মঙ্গলবার দুপুরে ধুনট উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইব্রাহীম পিতার অভিযোগের ভিত্তিতে রিপনকে ৬ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেন।
পত্রিকাটিতে খবরটি যত ছোট করে ছাপা হয়েছে ঘটনাটি কিন্তু তত ছোট নয়। নিজের সন্তানকে কোনও বাবা সহজে আদালতে সোপর্দ করেন কি? নিশ্চয় না। বরং অনেক বাবা অপরাধ গোপন রেখে ছেলেকে শাস্তি থেকে বাঁচাবার চেষ্টাই করেন সাধারণত। তবে ব্যতিক্রমও মাঝে মাঝে দু’একজন ঘটান। এমন ঘটনা কেবল এটাই নয়। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে এদেশে। অতীতে আরও কয়েকজন মা-বাবা নিজের সন্ত্রাসী, অবাধ্য ও মাদকাসক্ত সন্তানকে পুলিশে অথবা আইনের হাতে তুলে দেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অনেকে সন্ত্রাসী ও অবাধ্য সন্তানকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেন। এটাও একরকম কঠিন শাস্তি। তবে এতে অনেক সময় ছেলে সোজা না হয়ে আরও বাঁকা হয়। বিগড়ে যায়। বাবাকে নানাভাবে উৎপীড়ন করে। সুযোগ পেলে জোর খাটিয়ে সম্পত্তি কেড়ে নেবারও দুঃসাহস করে বসে ছেলে। শুধু তাই নয়। কুলাঙ্গার সন্তান মা-বাবাকে প্রাণে মেরে ফেলতেও দ্বিধাবোধ করে না। অবাধ্য সন্তানকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করলে বা আইনের হাতে তুলে দিলে জীবন পর্যন্ত দিতে হয় অনেক মা-বাবাকে। তবে এমন মর্মান্তিক ঘটনা সমাজের স্বাভাবিক চিত্র নয়। সমাজে যখন অবক্ষয় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে; অবিচার মাদকাসক্তি যখন সমাজে বেড়ে যায়, মা-বাবা কিংবা গুরুজনদের প্রতি সম্মানবোধ যখন কমে যায়; আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তখন সমাজে অস্থিরতা প্রকট হয়ে ওঠে। যুবসমাজ উচ্ছন্নে যায়। ধুনটের ঘটনাটি এমন অস্থিরতা ও সামাজিক-পারিবারিক সম্পর্কের শিথিলতারই লক্ষণ বলা যায়। অন্যথায় একজন বাবা তার সন্তানকে নিজ হাতে আদালতে সোপর্দ করবেন কেন? আগের দিনে অবশ্য শাসক অথবা বিচারক বা কাজী সাহেবরা নিজের অপরাধী সন্তানের দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি দিতে দ্বিধা করতেন না। আজকাল অতীতের সেই উদাহরণ বিরল।
ধুনটের পিতা সাইফুল ইসলাম নিশ্চয়ই তার সন্তানকে মাদকের ছোবল থেকে বাঁচাতে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু তিনি ছেলেকে ফেরাতে পারেননি। দিন দিন ছেলে রিপন নিশ্চয়ই অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিল। সেই কেবল মাদক খেতো না। মাদকই তাকে খেতে বসেছিল। আরও বড় সর্বনাশের কবলে হয়তো তলিয়ে যাচ্ছিল ছেলে রিপন। তাই তার নিরুপায় বুদ্ধিমান বাবা বাধ্য হয়ে তাকে আদালতে সোপর্দ করেছেন। এতে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। সব পিতা যদি তাদের মাদকাসক্ত, সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গি সন্তানকে সময় থাকতেই আইন-আদালতের হাতে তুলে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন, তাহলে সমাজের অস্থিরতা ও মানুষের উদ্বেগ অনেকটা এমনিতেই কমে যাবে। আমরা রিপন মাহমুদের পিতা সাইফুল সাহেবকে সাধুবাদ জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ