ঢাকা, শনিবার 11 March 2017, ২৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সড়ক দুর্ঘটনার আইন কাগুজে বাঘ

জিবলু রহমান : সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ, সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজনের প্রাণহানির মামলায় ঘাতক বাসের চালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দেয়া এই রায়ের প্রতিবাদে প্রথমে আঞ্চলিকভাবে পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। এর ঠিক ২ দিন আগে সাভারে ট্রাকচাপায় এক নারীকে হত্যার দায়ে চালকের বিরুদ্ধে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন আদালত। এরপরই সারা দেশে ধর্মঘট আহ্বান করা হয়।
২৮ ফেব্রয়ারি থেকে শুরু করে ১ মার্চ ২০১৭ দুপুর পর্যন্ত সারা দেশের মানুষ জিম্মি ছিল পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের কাছে। যানবাহন আটকে যাত্রীদের হেনস্তা, ব্যক্তিগত গাড়ি ভাঙচুর, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সের পথরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, সরকারি সম্পদের ক্ষতি-সবই ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত নিঃশর্তেই পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো।
শ্রমিকদের নেতা হিসেবে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ১ মার্চ বেলা আড়াইটার দিকে যানবাহন চালু করার জন্য শ্রমিকদের আহ্বান জানান। এর মাধ্যমে প্রায় ৩৯ ঘণ্টার দুর্বিষহ অবস্থার অবসান হয়। এর আগে বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্লাহ বৈঠক করেন। সেখানেই ধর্মঘট প্রত্যাহারের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এরপর মতিঝিলে সড়ক পরিবহন সমিতির কার্যালয়ে শাজাহান খান, মসিউর রহমান ও এনায়েত উল্লাহ মালিক-শ্রমিকদের নিয়ে বৈঠক করে পরিবহন চালু করার ঘোষণা দেন।
শ্রমিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি মসিউর রহমান। আর এনায়েত উল্লাহ এই সংগঠনের মহাসচিব।
২৮ ফেব্রুয়ারি শাজাহান খান বলেছিলেন, চালকেরা মনে করেছেন, তাঁরা মৃত্যুদ-াদেশ বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশের মতো রায় মাথায় নিয়ে গাড়ি চালাবেন না। তাই তাঁরা স্বেচ্ছায় গাড়ি চালাচ্ছেন না। ধর্মঘট নয়, এটাকে ‘স্বেচ্ছায় অবসর’ বলা যেতে পারে। ধর্মঘটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে শাজাহান খানের শ্রমিক ফেডারেশন মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আর মসিউর রহমানের মালিক সমিতি এতে সমর্থন দেয়। এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে, নৌমন্ত্রীর মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে। ওই বৈঠকে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের প্রায় ৫০ জন নেতা ছিলেন, যাঁদের বেশির ভাগই সরকারপন্থী বলে পরিচিত। সড়ক দুর্ঘটনায় চালকের শাস্তির রায়ের বিরুদ্ধে তাঁরা একটা ‘বার্তা’ দিতে এই ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ধর্মঘট পালনকারীরা জোরজবরদস্তি, ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে সরকার বেকায়দায় পড়ে যায়। সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি জনমতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন-এমন আলোচনা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে নেতারা কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। এরপরই সমঝোতার পথ খোঁজা শুরু হয়।
সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠকটি হয়েছে মালিক-শ্রমিক নেতাদের আগ্রহেই। তাঁরা আইনমন্ত্রীকেও সেখানে পেতে চেয়েছিলেন। দুপুর ১২টার দিকে এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শাজাহান খান ১১টার দিকেই ওবায়দুল কাদেরের দপ্তরে চলে যান। কয়েক মিনিট দু’জনের একান্ত আলোচনার পর অন্যরা যোগ দেন। ওই বৈঠক প্রায় আধা ঘণ্টা স্থায়ী হয়। শাজাহান খান আইনমন্ত্রীর সহায়তা চান। উচ্চ আদালতে আপিল করা হলে আইনমন্ত্রী আইনি সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেন।
২৬ ফেব্রুয়ারি রাত থেকেই সরকারের শীর্ষমহলের মধ্যে এমন উপলব্ধি হয় যে দুই মন্ত্রী ও সরকার-সমর্থক পরিবহননেতারা ধর্মঘট ডেকে সরকারকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। এমনকি শাজাহান খানের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত ছাড়া সারা দেশে এত বড় নৈরাজ্য সৃষ্টি করার সুযোগ নেই-এটাও নিশ্চিত হয় সরকার। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, চালকের বিরুদ্ধে আদালতে যে সাজার রায় হয়েছে, এর প্রতিবাদে বেপরোয়া হয়ে ওঠার কোনো যুক্তি নেই।
নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হলেও মামলা হলো শ্রমিকদের বিরুদ্ধে। বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধের সময় শাজাহান খান শ্রমিকদের নিয়ে মাঠে ছিলেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসা ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি পালন করেন। এ জন্য তাঁর মধ্যে ‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস’ চলে আসে, যা বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে।
শাজাহান খানের সায় না থাকলে উত্তেজনার বশে কেউ সারা দেশে ধর্মঘট ডাকার সাহস পেত না। ধর্মঘটের কারণে সাধারণ পরিবহন মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চালক-শ্রমিকদের অনেকেরই দৈনিক রোজগারের ওপর জীবন চলে।
দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘মন্ত্রীর বাসায় ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত’ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে শাজাহান খান দাবি করেন, তাঁর বাসায় বৈঠক করেছিলেন যানবাহন চালানোর জন্য, বন্ধ করার জন্য নয়। শাজাহান খান আরও বলেন, সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সড়কমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী মালিক-শ্রমিকদের সমস্যা উপলব্ধি করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাঁরা আইনগতভাবে সমস্যার সমাধানে সম্ভাব্য সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এই আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে যান চলাচলের জন্য মালিক-শ্রমিকদের তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন। (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো ২ মার্চ ২০১৭)
বছর তিনেক আগের তথ্য- গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মামলা না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই ধারায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে মামলা হবে ৩০৪(খ) ধারায়। এই ধারায় সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর কারাদণ্ড।
সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফলে যেসব মামলা ৩০২ ধারায় করা হয়, সেগুলো ৩০৪(খ) ধারায় স্থানান্তর হয়।
সরকারি হিসেব মতে, ১৯৯৯ সালে ৪ হাজার ৯১৬ জন, ২০০০ সালে ৪ হাজার ৩৫৭ জন, ২০০১ সালে ৪ হাজার ৯১ জন, ২০০২ সালে ৪ হাজার ৯১৮ জন, ২০০৩ সালে ৪ হাজার ৭ ৪৯ জন, ২০০৪ সালে ৩ হাজার ৮২৮ জন, ২০০৫ সালে ৩ হাজার ৯৫৪ জন, ২০০৬ সালে ৩ হাজার ৭৯৪ জন, ২০০৭ সালে ৪ হাজার ৮৬৯ জন, ২০০৮ সালে ৪ হাজার ৪২৬ জন, ২০০৯ সালে ৪ হাজার ২৯৭ জন, ২০১০ সালে ৫ হাজার ৮০৩ জন, ২০১১ সালে ৩ হাজার ৬৮৮ জন, ২০১২ সালে ৫ হাজার ৯১১ জন, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ৮৬৫ জন এবং ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৯৭৫ জনের প্রাণহানি হয়েছে।
‘বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন-২০১৫’-এ জানানো হয়, ২০১৫ সালে সারা দেশে ছোট-বড় ৬ হাজার ৫৮১ সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৬৪২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ২১ হাজার ৮৫৫ জন। (সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক ১৮ জানুয়ারি ২০১৬)
এভাবেই রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিদিন সড়ক-মহাসড়কে চলছে মৃত্যুর মিছিল। সড়ক হয়ে উঠেছে যেন মৃত্যুফাঁদ। সড়কে আর কত প্রাণ ঝরবে এমন প্রশ্ন থাকলেও এর জবাব নেই কারও কাছে। এ যেন দেখার কেউ নেই। রাস্তায় বের হয়ে নিরাপদে আবার বাসায় ফেরাটা এখন জীবনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৬ জানুয়ারি ২০১৬ তেজগাঁও ও শিল্পাঞ্চলে দুইজন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। ৯ জানুয়ারি ২০১৬ বঙ্গবন্ধু সেতুতে পর পর দু’টি দুর্ঘটনায় ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের ছেলেসহ সাতজন নিহত, আহত হন অন্তত ৩০ জন। এছাড়া সারা দেশে আরোও ১৩ জন নিহত হয়েছেন।
৯ জানুয়ারি সড়ক দুর্ঘটনায় রাজধানীর গাবতলী, বিমানবন্দর সড়কসহ পৃথক স্থানে তিনজন নিহত হন। এর আগের দিন রাজধানীর রমনা ও কদমতলীসহ একাধিক স্থানে নিহত হন চারজন।
১৬ জানুয়ারি ২০১৬ ব্যবধান মাত্র ৮ ঘণ্টার। এলাকাও একই; রাজধানীর শাহবাগ। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হাইকোর্টের বার কাউন্সিল ভবনের সামনে সড়কে বাসচাপায় নির্মমভাবে প্রাণ হারায় স্কুলছাত্রী সাবিহা আক্তার সোনালী। এ ঘটনায় ওই সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্বজন ও স্থানীয় উত্তেজিত জনতা। এমন একটি ঘটনার মাত্র ৮ ঘণ্টা পরই বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শাহবাগ মোড়ে বাসচাপায় প্রাণ হারিয়েছে খাদিজা সুলতানা মিতু নামে আরেক স্কুলছাত্রী। দুইটি ঘটনা ঘটিয়েছে যাত্রাবাড়ী-গাবতলী রুটে চলাচল করা ৮ নম্বরের যাত্রীবাহী বাস।
২০১৬ সালেই সেগুনবাগিচার রহিমা খাতুন আদর্শ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাস (জিপিএ-৫) করেছে সোনালী। তাই নতুন স্বপ্ন নিয়ে তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে ভর্তির উদ্দেশে বাসা থেকে বেরিয়েছিল সে। কিন্তু তার স্কুলে আর যাওয়া হলো না। নিমিষেই সোনালীর সব স্বপ্ন ভেঙে গেল। সড়কে বেপরোয়া বাস কেড়ে নিয়েছে কিশোরী সোনালীর প্রাণ। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ যার জন্য অপেক্ষা করছিল, তাকে কিনা এভাবেই অকালে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হলো কেবল উদাসীন চালক-হেলপারের কারণে।
সোনালীর মৃত্যুর ঘটনায় সকালে মৎস্য ভবন এলাকায় সড়ক অবরোধকালে ক্ষুব্ধ লোকজন বলছিলেন, বেপরোয়া বাস ও চালকের কারণে প্রতিদিনই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছে। দুর্ঘটনার নামে কেড়ে নেয়া হচ্ছে পথচারী-যাত্রীদের প্রাণ। কিন্তু তাতে কী? কারইবা এতে আসে-যায়? মরছে তো ‘সাধারণ মানুষ।’ দীর্ঘদিন ধরেই এ অবস্থা চলছে, কিন্তু ভ্রুক্ষেপ নেই সংশ্লিষ্টদের।
৯ জানুয়ারি ২০১৬ মিতু রাজধানীর শ্যামপুরে বড় বোন আয়শা আক্তার শিমু ও ভগ্নিপতি ওমর ফারুকের বাসায় বেড়াতে আসে। সে কুমিল্লার লক্ষণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এবার পিইসি (পঞ্চম শ্রেণী) পাস করে। মিতুর বাবার নাম বাচ্চু মিয়া। দুপুরের পরে বোন-ভগ্নিপতিসহ মিতু শাহবাগে শিশু পার্কে এসেছিল। শাহবাগ মোড়ে রাস্তা পারাপারের সময় বোনের হাত ধরেই ছিল। হঠাৎ হাত ছেড়ে রাস্তা পার হতে গেলেই ৮ নম্বর বাসটি তাকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় মিতু।
১৬ জানুয়ারি ২০১৬ দুপুরে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন; আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। ময়মনসিংহ ছাড়া ঢাকার বাইরে কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনায় আরও আটজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়।
প্রতিবছর ঈদ উপলক্ষে গ্রামের বাড়ি যাওয়া-আসার পথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। বেশ কিছু মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু তাঁদের স্বজনদের ঈদের আনন্দকে মাতমে পরিণত করে। ২০১৬ সালে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর, রাজশাহীর চারঘাট, বরিশালের গৌরনদী, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ও নেত্রকোনায় সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ১১ জন নিহত হয়েছেন ঈদের ঠিক আগের দু’তিন দিনে। এছাড়া ঈদের দিন ঢাকার অদূরে কাঁচপুর ব্রিজের কাছে একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে অটোরিকশার সংঘর্ষের ফলে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আর ঈদের পরদিন বিকেলে রংপুরের তারাগঞ্জে এক মিনিবাস একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দিলে অটোরিকশার চালকসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে পাঁচজন একই পরিবারের সদস্য। একই দিনে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় যাত্রীসহ এক ভটভটি রাস্তার পাশে একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ভটভটির যাত্রী তিন কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো ১০ জুলাই ২০১৬)
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন, রাজপথ প্রতিনিয়ত আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সড়ক আইন মানছেন না চালক-হেলপাররা। ঘন কুয়াশার কারণে সরকার থেকে মহাসড়কে গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটারের বেশি না বাড়াতে বলা হলেও সেটি কোনো চালকই মানছেন না, যে কারণে মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা বেড়েছে। ফলে এসব বিষয়ে পুলিশ, যাত্রী-পথচারীর পাশাপাশি গাড়ির মালিক ও চালক-হেলপারদের সচেতন হওয়া খুবই জরুরি। (সূত্রঃ দৈনিক  আলোকিত বাংলাদেশ ১৭ জানুয়ারি ২০১৬)
২৫ অক্টোবর ২০১৫ ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনদের মতামতে বলা হয়েছিল-সড়ক দুর্ঘটনায় যেসব অমূল্য জীবনের হানি হয়, তা কোনো দিন ফিরে পাওয়ার নয়। তাই এটি কমিয়ে আনতে যেসব পদক্ষেপ দ্রুত নেয়া দরকার তা হলো-সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন ও শাস্তির বিধান রাখা; কারণ দোষী চালকদের উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ থাকলে চালকরা সাবধানে গাড়ি চালাতে বাধ্য। সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে দ-বিধির ৩০২ ধারায় সর্বোচ্চ মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে মামলা দায়েরের বিধান রাখতে হবে; তা না হলে ড্রাইভাররা সচেতন হবে না এবং অ্যাক্সিডেন্টের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। বিআরটিএর এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী টাকার বিনিময়ে অবৈধ লাইসেন্স দেয়, এটি বন্ধ করতে হবে; ১৯৮৩ সালের পুরনো মোটরযান আইনকে আধুনিক, কার্যকরী ও জনবান্ধব করতে হবে; দোষী চালকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিলে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও শ্রমিক নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে তাদের ছাড়িয়ে আনতে পরিবহন সেক্টর এক রকমের জিম্মি করে রাখা হয়। এ জিম্মিদশা থেকে পরিবহন খাতকে মুক্ত করতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনেক সময় উদাসীন হতে দেখা যায়; তাদের আরও ‘অ্যাকটিভ’ করতে হবে। রোড অ্যাক্সিডেন্ট কমাতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর এবং বিআরটিএর প্রতিরোধ সেলগুলোকে কার্যকর করতে হবে। সারা দেশের ১৪৪টি মারাতœক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক বা কেন্দ্রের কাজ দ্রুত শুরু করে তা শেষ করতে হবে। কারণ যত দেরিতে এ বাঁকের কাজ শেষ হবে মৃত্যুর মিছিল ততই লম্বা হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। প্রয়োজনে বাঁকগুলো তুলে দিতে হবে। সড়ক-মহাসড়কে নকশাসংক্রান্ত ত্রুটি দ্রুত সারাতে হবে। সারা দেশে গাড়ির ড্রাইভারদের ব্যবহারিক, তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন সড়কে একেবারে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং কেউ এটি চালালে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও শাস্তি দিতে হবে। সড়কের পাশে কিংবা সড়কের মধ্যে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাজার, দোকানপাট, প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন ও সহযোগী সংগঠনের সাউনবোর্ড সর্বস্ব অফিস তুলে দিতে হবে। ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটাতে হবে। পথচারীর ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার রোধে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন ধরনের মিডিয়া ক্যাম্পেইনের ব্যবস্থা করতে হবে।  [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ