ঢাকা, শনিবার 11 March 2017, ২৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি কী গণবিরোধী নয়!

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : গ্যাস নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ছোট বেলায় শুনেছিলাম বাংলাদেশ নাকি গ্যাসের ওপর ভাসছে। আর এখন দেখছি গ্যাসের অভাবে গিন্নির রান্নার চুলায় আগুন জ্বলছে না। শাসকেরা যখন বলছে দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে তখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগ ৩ মার্চ ২০১৬ সালের বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বাংলাদেশের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখানো হয়েছে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হচ্ছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। আর এর পেছনে সরকারের মদদ রয়েছে বলে রিপোর্টটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও শাসক দল প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রতিবেদনটি যদি বিএনপি অথবা জামায়াতের বিরুদ্ধে হতো তাহলে শাসক লীগের নেতাকর্মীদের বক্তব্য বিবৃতিতে ঝড় উঠতো। নিকট অতীতে কানাডার আদালত বিএনপির ব্যাপারে একটা মন্তব্য করলেও আওয়ামী লীগের ব্যাপারে ভালো না মন্দ কিছুই বলেননি। আর সে সুযোগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সুরে যে সব কথা বলেছেন তা সত্যিই রাজনীতির জন্য বেমানান। দেশের সন্তানতুল্য নাগরিকদের প্রতি সরকারের আচরণ কতটা জনবান্ধব হওয়া উচিত তা নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন করতেই পারে! কারণ একটি সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকে, সরকার জনগণের সেবক হয়ে কাজ করবে। কিন্তু সরকার যখন তার উল্টো কাজ করে তখন জনগণের ভোগান্তি ছাড়া অন্য কিছু ভাগ্যে  জোটে না। যে দেশের রাজনীতিতে সরকারি দল আর বিরোধীদল একই কোরাস গায় সে দেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় চেক এন্ড ব্যালেন্স থাকে না। আর সে সুযোগে গণতান্ত্রিক সরকারও স্বৈরতান্ত্রিক সরকারে পরিণত হয়। একটি শক্তিশালী বিরোধীদল দেশের উন্নয়নের পেছনে ছায়া সরকার হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে। সরকার দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে ভুল করবে না এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। সরকার জনবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নিলে বিরোধী দল জনগণের হয়ে প্রতিবাদ করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এ সরকারের আমলে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না। গৃহপালিত বিরোধী দল আছে ক্ষমতার সুযোগ সুবিধা লুটে-পুটে ভাগিয়ে নেয়ার জন্য। যে কারণে তারা জনগণের যৌক্তিক দাবির পক্ষেও একটু টুঁশব্দ পর্যন্ত করছে না। সরকার তার ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত জনগণের মাথার ওপর চাপিয়ে দিতে পারছে। জনগণকেও তা বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হচ্ছে। যদিও আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯ এর (২)-এ বলা হয়েছে যে, মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য,নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধা দান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। এই যে গ্যাসের দাম এক লাফে প্রায় ৬০ ভাগ বাড়িয়ে দিলেও গৃহপালিত বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো প্রতিবাদ করা হয়নি।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়ার পরদিন সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মূল্য বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিষয়ে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে মাত্র ৩০-৩৫ লাখ গ্রাহক পাইপলাইনে গ্যাস পান। বাকি কোটি কোটি মানুষের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। নিশ্চয়ই সরকারের উচিত কোটি কোটি মানুষের কথা ভাবা। তবে সমস্যা হলো, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এই কোটি কোটি মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লাভবান হবে মাত্র কিছুজন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে এলপিজি বা সিলিন্ডার ব্যবসার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি এখন এই ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি। বর্তমানে এলপিজি বা সিলিন্ডার ব্যবসার প্রধান অংশ বসুন্ধরা ও যমুনা গ্রুপের হাতে এ খবর কয়জনে রাখে। গ্যাসের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, বিদ্যুতের দাম বাড়বে, বাসা ভাড়াসহ অন্য সব দ্রব্যসামগ্রীর দাম, বাড়বে শিল্প কৃষির উৎপাদন ব্যয়। যেসব ব্যবসায়ী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পান, কিংবা বড় ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও যাঁদের জন্য ব্যাংকের সিন্দুক সব সময় খোলা থাকে তাদের বাদে বাকি সব উদ্যোক্তার জন্যই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি মানে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। প্রথম ধাপে মার্চ থেকে এক চুলার জন্য ৭৫০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৮০০ টাকা দিতে হবে। এর ফলে এক চুলার জন্য শুধু নয়, দুই চুলার জন্যও মানুষকে ১৫০ টাকা বেশি গুণতে হবে। বিইআরসি কর্তা ব্যক্তিরা আগাম জানিয়ে রেখেছেন যে, আগামী জুন থেকে আবারও বেড়ে যাবে গ্যাসের মূল্য। তখন এক চুলার জন্য ৯০০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৯৫০ টাকা দিতে হবে। হঠাৎ করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। এটা সরকার বাহাদুরের অজানা থাকার কথা নয়। গ্যাসের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়িভাড়ায় যে বাড়তি খরচ মানুষকে বহন করতে হবে, তার জন্য সরকার কি তাদের বেতন বাড়ানোর দায়িত্ব নেবে? নেবে না। সীমিত আয়ের মানুষের কান্নার আওয়াজ কান পাতলেই শোনা যায়। কেননা নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে গেলে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েন। এসব মানুষের জীবন আসলে কীভাবে চলে তার খোঁজ সরকারের কোনো সংস্থার কাছে কী আছে? রাষ্ট্র পরিচালনার গুরু দায়িত্বে যারা নিয়োজিত রয়েছেন তাদের কাছে বাসাবাড়ির গ্যাসের এ মূল্যবৃদ্ধি সামান্য কিছু টাকার ব্যাপার হতে পারে! কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায় এমন লাখ লাখ পরিবারের কাছে চুলা প্রতি দেড়শ টাকা মূল্য বৃদ্ধি কত যে বাড়তি বোঝা তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। এখন কোনো বাড়িওয়ালাই আর গ্যাস, পানি-বিদ্যুতের বিল নিজে বহন করেন না চাপিয়ে দেন ভাড়াটিয়ার ঘাড়ে। আর ভাড়াটিয়ারা নিরুপায় হয়ে সে বোঝা বহন করতে বাধ্য হন। নইলে বাসা ভাড়া মেলে না। এ অবস্থায় গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির চাপ সরাসরি ভাড়াটিয়াদের উপরই গিয়ে পড়েছে। এতে করে হাজারো ভাড়াটিয়ার উপর সৃষ্টি করেছে বাড়তি চাপ।
সরকারের কাজ হচ্ছে দেশের সন্তুানতুল্য নাগরিকদের জীবনযাপনকে সহজ করার জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা। তাদের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা। আমরা সরকারের মধ্যে এধরনের প্রবণতা দেখছি না। সরকার জনগণকে ভর্তুকি না দিয়ে নিজের ভর্তুকি পূরণ করার জন্য নাগরিকদের কাছ থেকে যত রকমে পারা যায় আদায় করে নিচ্ছে। সরকারের আচরণে এটা প্রতীয়মাণ হচ্ছে যে, তারা ক্ষমতার জন্যে যা যা করা প্রয়োজন করবে, কিন্তু জনগণের জন্য কিছুই করবে না। তা নাহলে ভর্তুকি দিয়ে হলেও জনগণের সুবিধা নিশ্চিতের ব্যবস্থা গ্রহণ করতো। জনদরদী সরকারের কাজই তো এটা। সরকার জনগণের ওপর একের পর এক যে মূল্যবোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে তা লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না। গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে দারিদ্র্যতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। মনে হয় গ্যাস বিদ্যুৎ ব্যবহারকীরা এ দেশের নাগরিক নন। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। তখন দুই চুলার বিল ৪৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫০ টাকা আর এক চুলার বিল ৪০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৬০০ টাকা। যে আইন দ্বারা বিইআরসি পরিচালিত তাতে সুনির্দিষ্টভাবে একথা বলা আছে যে, প্রতি অর্থবছরে সে কেবল একবার দাম পরিবর্তন করতে পারবে। অথচ বিইআরসির ঘোষণায় প্রথমে ১ মার্চ একদফা এবং তিন মাস পর ১ জুন আরেক দফা গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। জনগণকে ধোঁকা দেয়ার ফন্দি তারা করেছিল কিন্তু তা ধোপে টেকেনি। এই চালাকি করতে গিয়ে বিইআরসি নিজেই নিজের আইন ভঙ্গ করেছে। আদালত ইতোমধ্যে এই বরখেলাপের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্বিতীয় দফার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে দিয়েছে। বলা হয় যে, আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সমন্বয় না করলে বিশ্বায়নের অংশীদার হওয়া যাবে না। এই কথা যে কতোটা ভাঁওতাবাজি তা বোঝা যায় যখন পাল্টা প্রশ্ন করা হয় যে, জ্বালানির দাম সমন্বয় করা যদি বিশ্বায়নের কারণে অপরিহার্য হয় তাহলে শ্রমিকের মজুরির হার তথা তার শ্রমশক্তির দাম কেন বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়ানো হবে না? পশ্চিমা দেশে যে ন্যূনতম মজুরি বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে, এদেশে তা বাস্তবায়নে কী সরকার উদ্যোগী হবে? গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি কেবলমাত্র গ্যাস ব্যবহারকীদেরকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে বিষয়টি এমন নয়, তা ক্ষতিগ্রস্ত করবে সবশ্রেণী পেশার সব ধরনের মানুষকে। দেশে গ্যাসের মজুদ নিয়ে যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে তাতেও হিসাবের গরমিল রয়েছে। আমাদের সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টি মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রতিবেশী দেশের সাথে গ্যাস নিয়ে যেসব চুক্তি হচ্ছে তা থেকে আমাদের উপকৃত হবার সুযোগ কতটা রয়েছে তা পরিষ্কার নয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো এক থেকে অন্য দেশে গ্যাস রফতানি করছে। অথচ আমাদের প্রতিবেশী ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এবং মিয়ানমারে অতিরিক্ত গ্যাসের মজুদ থাকার পরেও আমরা তা আমদানি করতে পারছি না। সেদিকে নজর না দিয়ে এলপিজি চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা কেন এই বিষয়টির বিশদ বিবরণ থাকা দরকার।
গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করতে একদিকে দামবাড়ানোর পাঁয়তারা অন্যদিকে সরবরাহের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা দুঃখজনক। চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দাবস্থার মধ্যেই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি যেন ১৬ কোটি মানুষের ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ