ঢাকা, শনিবার 11 March 2017, ২৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গ্যাস নেই তবুও টাকা গুণতে হচ্ছে নাগরিকদের

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : গ্যাস নেই তবুও টাকা গুণতে হচ্ছে নাগরিকদের। প্রতিদিন সকাল ৮টার পর থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর অনেক এলাকাতেই গ্যাসের অভাবে রান্না হয়না। দেশের অন্যান্য এলাকার চিত্রও একই। অভিযোগ করেও লাভ নেই। বছর যেতে না যেতেই বাড়ানো হচ্ছে গ্যাসের দাম। নিয়ম মতে, বছরে একবারই কেবল দাম বাড়ানো যায়। কিন্তু এই সরকার এতই জনবান্ধব যে, মাত্র তিনমাসের ব্যবধানে দাম বাড়ার ঘোষণা দিয়েছে দুইবার। যদিও আদালত সেটি ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেছে। গৃহস্থালিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে এলএনজির দামের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলেছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। সেই সঙ্গে ভর্তুকির চাপ কমানো জন্যও এই সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণ বলে তিনি জানান। এর আগে গত বছরের (২০১৫ সাল) ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবাসিকসহ কয়েকটি শ্রেণির গ্রাহকের গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। তখন ২ চুলার বিল ৪৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫০ এবং ১ চুলার বিল ৪০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছিল। এ ছাড়া সব গ্রাহক শ্রেণির ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম সর্বশেষ বাড়ানো হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারি। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গৃহস্থালিতে ও গাড়িতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ায়। আবাসিক গ্রাহকদের আগামী ১ মার্চ থেকে এক চুলার জন্য মাসে ৭৫০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৮০০ টাকা দিতে হবে। আর দ্বিতীয় ধাপে ১ জুন থেকে এক চুলার জন্য মাসিক বিল ৯০০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৯৫০ টাকা হবে। তবে জুন থেকে বাড়ানোর ঘোষণা আদালত স্থগিত করেছে।  পাশাপাশি যানবাহনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম ১ মার্চ থেকে প্রতি ঘনমিটারে ৩৮ টাকা এবং ১ জুন থেকে ৪০ টাকা হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতেও গ্যাসের দাম দুই ধাপে ৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বিইআরসি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্যাসের একটা বিশাল জায়গাতে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে দাম বাড়াতে হয়েছে। যদিও সমস্যাগুলো সাধারণ জনগণের ওপরই বর্তায়। আরেক কারণের বিষয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যে এলএনজি আসবে সেটার প্রাইস কিন্তু অনেক বেশি। সেটার মূল্য এডজাস্টমেন্টের জন্য আমাদেরকে গ্যাসের দাম বাড়াতে হয়েছে। বিদ্যুৎ এবং কারখানায় যারা বড় গ্রাহক তাদেরকে আগে থেকেই বলে দিয়েছি যে, আপনাদেরকে প্রস্তুতি নিতে হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে আপনারা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি পাবেন। তবে এলএনজি আসলে, এটা মিক্সড করলেও কিন্তু এটার মূল্যটা অনেক বেশি হবে। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বাম দলগুলো হরতালও আহবান করেছে। সরকার তাদের বিক্ষোভে হামলা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া বিএনপি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং ঢাকায় অবস্থান কর্মর্সূচি পালন করেছে। এছাড়া রাজধানীতে কয়েকদিন ধরে এর প্রতিবাদে গণসংযোগ করেছে। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিসহ সরকারের যে কোনো গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানিয়েছে বিএনপি। তারা বলেন, গ্যাসের দাম কমাতে হবে- এটা সবার দাবি। রমনার কর্মসূচিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে বলতে চাই, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা যাবে না। তিনি বলেন, এ ধরনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণকে উজ্জীবিত করে তুলতে হবে, সরকারের গণতন্ত্রবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এখন সময় হয়েছে আমাদের জেগে ওঠার, প্রতিবাদ করার এবং সোচ্চার হওয়ার। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন প্রাঙ্গণে নেতাকর্মীদের ঢল নামে। রাজধানীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড থেকে তারা সেখানে আসতে থাকেন। তাদের হাতে ছিল ‘গ্যাসের দাম বাড়ল কেন, শেখ হাসিনা জবাব চাই’, ‘গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করো, করতে হবে’ লেখা নানা প্ল্যাকার্ড।  অবস্থান কর্মসূচির সময় দুই পৃষ্ঠার একটি লিফলেটও বিতরণ করা হয়- যার শিরোনাম ছিল- ‘আসুন, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই।’
বাসায় বাজার আছে কিন্তু রান্না করা যাচ্ছে না সময় মতো। কারণ একটাই। সময় মতো গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না চুলায়। এটা এখন রাজধানীবাসী অনেক এলাকার মানুষের নিত্যদিনের ব্যাপার। যখন পাওয়া যাচ্ছে তখন আর পরিবারের সদস্যরা বাসায় নেই। না খেয়েই চলে যেতে হয়েছে চাকরি কিংবা কর্মস্থলে। দিনের পর দিন অবস্থা আরও নাজুক আকার ধারণ করছে ঢাকায় অবস্থানরত মানুষের। মাঝেমধ্যে খানিকটা গ্যাস এলেও একঘণ্টা পর উধাও। এভাবে আর কত দিন চলতে হবে সে প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের। বিশেষ করে গ্যাস সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে রাজধানীতে বসবাসরত নিম্ন আয়ের মানুষ। প্রায়ই না খেয়ে পোশাক কারখানায় চাকরি করতে যান শ্রমিকরা। অনেক সময় উপোস পার করে দেন সারাদিন। ভিকটিমরা বলেন, সময়মতো রান্না করতে পারছি না। হোটেলে খাইতে খাইতে গ্যাস্ট্রিক হইয়া গেছে।
নগরবাসী বলছেন, সারাদিনের রান্না ভোররাতেই শেষ করতে হচ্ছে। অনেকটা ক্ষোভ নিয়ে এমন দুর্বিষহ অবস্থার কথা জানালেন রাজধানীর বাসাবো এলাকার বাসিন্দা সানজিদা বেগম বললেন, শহরের মানুষেরে কষ্ট দিতাছে। অনেক সময় ঘুম নষ্ট কইরা ভোর ৪টায় রান্না বসাতে হয়। খুব খারাপ লাগে। ভোরে রান্নার পর সারাদিনটা অনেক কষ্টে যায়। কয়দিন পর পরই অসুস্থ হই। সব গ্যাস সরকার বেইচা খাইছে। খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা লাকি আক্তার বলেন, রান্নার রুটিন এলোমেলো হয়ে গেছে। আগের দিন রাতে পরের দিনের রান্না করে রাখতে হয়। কিন্তু এভাবে কয়দিন চলে? মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডের বাসিন্দা রেহানা আক্তার বলেন, দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত খুব অল্প গ্যাস থাকে। তাতে কেবল ভাত রান্না করা যায়। আর রাতে ১০টার পর গ্যাস পাওয়া যায়। ফলে সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বনশ্রী, রামপুরা, পল্লবীসহ পুরনো ঢাকার কোনো কোনো এলাকায় গ্যাস সংকট প্রকট। এছাড়া রায়েরবাজার, শাহীনবাগ, শ্যামলী, হাজারীবাগ, মুগদা, বাড্ডা, কাওলা, উত্তরা, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও, টিকাটুলি, দক্ষিণ মৌসুন্দী, লালমোহন সাহা স্ট্রিট, লালবাগ, ধানমন্ডি জিগাতলা এলাকায়, রামপুরা, বনশ্রী, নন্দীপাড়া, খিলগাঁও, মালিবাগ, মগবাজার, শান্তিনগর, সিদ্ধেশরী, মাদারটেক, বাসাবো, গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকুঞ্জ, বসুন্ধরা, নিকেতন, কাফরুল, ইব্রাহিমপুর, পীরেরবাগ, মনিপুর, মিরপুর, নারিন্দা, গোপীবাগ, ধোলাইরপাড়, জুড়াইন, কাজলা, নারিন্দা ফুলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে গ্যাস সংকট চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারা দেশে প্রতিদিন কমবেশি ২৩৪ কোটি ১৮ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। এই সময় চাহিদা ছিল দুই হাজার ৫০০ ঘনফুটের বেশি। বর্তমানে মোট গ্যাসের ৬০ শতাংশই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার হয়। আবাসিকে মাত্র ১০ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। সরকার আস্তে আস্তে এই গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সিলিন্ডার গ্যাসে উদ্বুদ্ধ করছে জনসাধারণকে। নতুন বাসা-বাড়িতে আর গ্যাসের সংযোগ দেয়া হচ্ছে না। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এস এম শামসুল আলম বলেন, ১৯৯৮ সালে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্যাস বিক্রির অর্থ থেকে ৫৫ শতাংশ রাজস্ব (৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ১৫ শতাংশ মূসক) না নিয়ে গ্যাস খাত পরিচালনায় তা ব্যয় করার বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যে এসআরও (২২৭ নম্বর) জারি করেছিল, এখন তার অন্যথা করা জনস্বার্থের অনুকূল নয়। এদিকে সরকার গ্যাসের দাম বাড়ালে বাসাবাড়িতে গ্যাস-সংকট দূর করতে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের সংকট তীব্র হচ্ছে। এই সংকট দূর করার ব্যাপারে তিতাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো আশার কথা শোনাতে পারেননি। তারা বলেছেন, সমাধানের চেষ্টা করছেন। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের এই সংকটের মধ্যে বাড়তি পাওনা মূল্যবৃদ্ধি।
ই-মেইল: jafar224cu@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ