ঢাকা, শনিবার 11 March 2017, ২৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দুর্নীতি দূর করতে না পারলে গ্যাস নিঃশেষ হয়ে যাবে অতিদ্রুত

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি ইংরেজি হলো Price increase of gas. প্রাকৃতিক গ্যাস মহান আল্লাহ তায়ালার কুদরতী গ্যাস যা বাংলাদেশের ভূগর্ভে প্রচুর পরিমাণে সঞ্চিত রয়েছে বলে ভূ-তত্ত্ব বিশেষজ্ঞগণ জানিয়েছেন। স্বাভাবিক চাপ ও তাপে গ্যাস বা বাষ্পাকারে অবস্থিত হাইড্রোকার্বনই প্রাকৃতিক গ্যাস; যার প্রদান গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মিথেন (CH4) আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক গ্যাস অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গৃহস্থালী, শিল্প-বাণিজ্য ও কৃষিতে উৎপাদিত গ্যাসের ২০% এবং ৮০% গ্যাস ব্যবহৃত হয় বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন ও সার উৎপাদনের কাজে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৩নং অনুচ্ছেদে সম্পদের মালিকানা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্পত্তিতে জনগণের পক্ষে রাষ্ট্র ঐ সম্পত্তির মালিক। গ্যাস প্রাকৃতিক সম্পদ যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং জনগণের পক্ষে রাষ্ট্র বা সরকার উহার ব্যবস্থাপনা করবেন। জ্বালানী ও খনিজ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন ‘‘আবাসিক খাতে গ্যাসের যে সমস্যা এ সমস্যা থাকবেই।
আমরা চাচ্ছি আপনারা যারা আবাসিক গ্যাস ব্যবহার করছেন, তারা ধীরে ধীরে এল.পি.জি-তে চলে যান। কারণ, এল.পি.জি এখন অ্যাপার্টমেন্টে ব্যবহার করা যায়।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে নবায়ন যোগ্য শক্তি: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট শীর্ষক সেমিনারের পর প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন। অথচ ২০১৩ সালে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন বর্তমান জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী। তৎকালীন রিহ্যাব সভাপতি নসরুল হামিদ এমন যুক্তিও দেখিয়েছিলেন যে, আবাসন খাতে মোট উৎপাদিত গ্যাসের ১৫ শতাংশেরও কম ব্যবহার হয়। অথচ উপকার ভোগী জনসংখ্যা বিপুল। এখন তিনি বলেন ভিন্ন কথা। জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পেতে আর এল.পি.জি’র ব্যবহার বাড়াতেই গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।’ আর গ্যাসের দাম বাড়াতে গিয়ে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন বলেছেন,‘ IOC (International Oil Companies) এর কাছ থেকে পেট্রোবাংলা বেশি দামে গ্যাস কিনছে আর বিক্রি করা হচ্ছে কম দামে। এই দাম সমন্বয় করতেই গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।’ গ্যাসের দাম বাড়াতে গিয়ে এর আগে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন থেকে বলা হতো, ‘গ্যাস উন্নয়নের জন্যই দাম বাড়ানো হচ্ছে।’ কোথায় গেল নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ আর কোথায় গেল উন্নয়ন তহবিল। সব যেন ছেলে ভুলানো গল্প। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ খ্রিঃ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার ১১নং পৃষ্ঠায় সাংবাদিক এবি সিদ্দিক ‘গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি: অন্ধকে হাইকোর্ট দেখানো’ শিরোনামে লিখাটিতে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছেন, ‘গ্যাসের দাম বাড়িয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কত কিছুই না করা হবে। বলা যায়, জনগণের কাছ থেকে টাকা নিয়ে লুটপাট।’
শ্রী দীনেশ চন্দ্র দেবনাথের লিখা ভূমি আইন বইটি পড়তে যেয়ে দেখলাম বইটির ৯নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে ‘১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে এক জরিপে দেখা গিয়েছিল যে, ভূমি রাজস্ব হতে বাংলাদেশের জমিদারগণ লাভ করেছিলেন দুই কোটি পাউন্ড।’ কিন্তু সরকারের ঘরে নির্দিষ্ট রাজস্ব জমা হয়েছিল মাত্র দুই লক্ষ পাউন্ড।
পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের আয় এবং জমিদারদের আয়ের ব্যবধান আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।’ উক্ত অবস্থার চেয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট কোন অংশে কম? আমরা কি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনের চেয়ে বর্তমান গণতান্ত্রিক! শাসনে ভালো আছি? ৪ মার্চ আমাদের সময় পত্রিকার সম্পাদকীয় ৪নং পৃষ্ঠায় কলাম লেখক, গবেষক মাহমুদুল বাসার-এর ‘স্বাধীনতার মাস, তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য’ লিখাটিতে উল্লেখ রয়েছে, ....বলেছিলেন, বাংলাকে শোষণ করে ইসলামাবাদ ও লন্ডনের ড্যান্ডি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদেরও সম্পদ আছে, আমরাও উঠে দাঁড়াব।’ গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করে জনগণের টাকা শোষণ করার পক্ষে তিনি ছিলেন না। উক্ত লিখাটিতে আরও রয়েছে, ‘বাংলার মাটিতে পা দেয়ার আগেই তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী, মহীয়সী নারী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন। অন্য নেতারা একবারই দেশ স্বাধীন করেছেন, তিনি দু’বার দেশ স্বাধীন করেছেন।’
আমাদের প্রতিবেশী দেশ আমাদের সীমান্তবর্তী সব এলাকায়ই গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রে বরাবরই বাধ সাধে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়কাল থেকেই তারা আমাদের গ্যাস সম্পদসহ বিভিন্ন খনিজ দ্রব্যের উত্তোলন এবং অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আসছে।
কারণ প্রকৃতিগতভাবে আসাম এবং বাংলাদেশের জ্বালানী সম্ভাবনার গ্যাস ক্ষেত্রগুলো সাধারণতঃ একই লেয়ারে থাকার জন্যই এ ধরণের একটি আগ্রাসী মনোভাবে তারা বরাবরই বাধা দিয়ে আসছে।
সুনামগঞ্জ জেলা এবং নেত্রকোণা জেলার সঙ্গম স্থলে একটি বিশাল গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান করে পাওয়া যায় যার নামকরণ করা হয়ে ‘সুনেত্র’। কিন্তু তা এখন গ্যাস শূন্য বলে ঘোষণা দিয়ে কর্মকান্ড স্থগিত রয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়।
বাহ্যিক আগ্রাসন এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দূর করতে না পারলে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক গ্যাস নিঃশেষ হয়ে যাবে অতিদ্রুত। মূল্যবৃদ্ধি করেও লাভ হবেনা এবং তা কোথায় যাবে তার ইঙ্গিত রয়েছে, বাংলা পিডিয়া বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত গ্রন্থের ৬ষ্ঠ খন্ডের ৬৫-৬৬ নং পৃষ্ঠায়।
-আবু মুনির

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ