ঢাকা, মঙ্গলবার 14 March 2017, ৩০ ফাল্গুন ১৪২৩, ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বোরো মওসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত

 

* সেচ বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি ৩৪২ মিলিয়ন ঘনফুট

* এপ্রিল ও মে মাসে আরো লোডশেডিংয়ের আশংকা পিডিবি’র

* ডিসিদের সতর্ক থাকতে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের নির্দেশ 

কামাল উদ্দিন সুমন : গ্যাস সংকটে আবারো বেড়েছে লোডশেডিং। সংকটের কারণে চাহিদা মাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো। আর এর প্রভাব পড়ছে বোরো মওসুমের উপর। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা নিয়ে খোদ আশংকা প্রকাশ করছে পিডিবি। আর যে কোন উপায়ে সেচ কাজে বিদ্যুৎ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ। 

সূত্র জানায়, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় দেশের সব জেলায় কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়ার কথা বলা হয়েছে বিভাগীয় কমিশনারদের।

সূত্র জানায়, চলতি মওসুমে তিন লাখ ৫৩ হাজার সেচযন্ত্র চলবে বিদ্যুতে। এতে দুই হাজার ২৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। আগামী দুই মাসে বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড রয়েছে প্রায় ৭হাজার মেগাওয়াট। 

এদিকে চাহিদা মোতাবেক সেচ কাজে বিদ্যুতের জন্য গ্যাসের প্রয়োজন হবে দৈনিক এক হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে এ পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছে পেট্রোবাংলা। এতে আগামী দুই মাসে লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা করছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ আশঙ্কা করা হয়। চলতি সেচ মওসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সভাটি আয়োজন করা হয়।

 বৈঠকে পিডিবি’র পক্ষ থেকে জানায়, প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সেচ মওসুম চলে মে পর্যন্ত। তবে বেশি চাহিদা থাকে এপ্রিল ও মে মাসে। গত বছর ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল সাত হাজার ৫৭১ মেগাওয়াট। চলতি সেচ মওসুমে গড়ে ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। চাহিদা পূরণের জন্য গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

সূত্র জানায়, গত বছর গ্যাসের চাহিদা ছিল দৈনিক এক হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে সরবরাহ করা হয় এক হাজার ১২ মিলিয়ন ঘনফুট। এ বছর গ্যাসের চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে কমপক্ষে এক হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ প্রয়োজন।

 পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৯১৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হবে। তবে সেচ মওসুমে এক হাজার ১১৪ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। চলতি সেচ মওসুমে এক হাজার ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এতে লোডশেডিং বাড়বে বলে মন্তব্য করেন পিডিবি সংশ্লিষ্টরা।

তাদের তথ্যমতে, চলতি বছর সেচে বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়বে। কারণ গত বছর তিন লাখ ৪৬ হাজার ৬৮টি সেচযন্ত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। এ বছর সাত হাজার ১১৮টি সেচযন্ত্রে সংযোগ দেয়া হয়েছে। এতে সংযোগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৫৩ হাজার ১৮৬। আরও আট হাজার ৫২১টি আবেদন পেন্ডিং আছে। এতে আরও ৫৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগবে।

সব মিলিয়ে সেচে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ২৯৬ মেগাওয়াট। গত বছর এ চাহিদা ছিল দুই হাজার ১৮৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চলতি বছর সেচে চাহিদা বাড়ছে ১০৮ মেগাওয়াট।

সূত্র জানায়, চাহিদা পূরণে এপ্রিল ও মে মাসে দিনে গড়ে আট হাজার ৮৬৫ মেগাওয়াট ও রাতে ৯ হাজার ৪০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করতে হবে সন্ধ্যায়, ১০ হাজার ১৭ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে। এ জন্য এক হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দরকার হবে।

এদিকে সেচ মওসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে গ্যাসের পাশাপাশি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার কথা বলা হয়েছে। এজন্য জ্বালানি পরিবহনে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সহায়তা চাওয়া হয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু রাখতেও একই ধরনের নির্দেশনা দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। এছাড়া সেচপাম্পে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতে গ্রিড উপকেন্দ্র, সঞ্চালন লাইন, বিতরণ লাইন ও উপকেন্দ্র সংরক্ষণ এবং মেরামত কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশনা দেয়া হয়। 

এদিকে চলতি বোরো মওসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রাখতে ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়েছে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি)। সেচ কাজ যেন সুষ্ঠুভাবে হয়, সে ব্যবস্থা বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করতে সংশ্লিষ্ট ডিসিদের বলা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার মো. নূর-উর-রহমান বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। 

মন্ত্রিপরিষদ সূত্রে জানা গেছে, পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে রাতে ধানচাষের জন্য সেচ কাজে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এ সময় বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন রাখার বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনারদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনাররা জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকরা স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে জানান বিভাগীয় কমিশনাররা।

বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান বলেন, কৃষি কাজে বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। 

পিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ বলেন, সেচে বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে গেছে। তাই চলতি বছর গ্যাসের চাহিদাও বেড়ে যাবে। এজন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় নির্বিঘ্নে গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। তবে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে। বিষয়টি বৈঠকে জানানো হয়েছে। অবশ্য চাহিদার সবটুকু পূরণ হবে কি না, তার আশ্বাস পাওয়া যায়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ