ঢাকা, বুধবার 15 March 2017, ০১ চৈত্র ১৪২৩, ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ফ্লাইওভারে দুর্ঘটনা

রাজধানীর মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের মালিবাগ রেলগেট এলাকায় একটি গার্ডার পড়ে যাওয়ায় নিচে অবস্থানরত একজন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে। গত রোববার গভীর রাতের এ দুর্ঘটনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর- এলজিইডির একজন প্রকৌশলী এবং অন্য এক শ্রমিকের পা থেতলে গেছে। হাসপাতালে নেয়ার পর ওই প্রকৌশলী পলাশ বরুণ ধরের পা কেটে ফেলতে হয়েছে। ফ্লাইওভারের জন্য সিমেন্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের গাড়ি চালক এবং আরো বেশ কয়েকজন গুরুতররূপে আহত হয়েছে। তাদের একজনেরও একটি পা কেটে ফেলা হয়েছে। আহত অন্যদের অবস্থা আশংকাজনক। দৈনিক সংগ্রামসহ জাতীয় গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, গত মাস ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ফ্লাইওভারটির একই অংশে একটি গার্ডার ওঠানোর চেষ্টা করার সময় ওই কাজে ব্যবহৃত ক্রেনটি ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু কেউ হতাহত হয়নি। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা সে সময় ওঠানো গার্ডারটিকে যথাযথভাবে স্থাপন করার পরিবর্তে তার ও দড়ি দিয়ে কোনোভাবে বেঁধে রেখে এসেছিলেন। দুর্ঘটনার আগে পর্যন্ত গার্ডারটি অন্য গার্ডারের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় ছিল।
এরই মধ্যে রোববার রাতে শুরু হয়েছিল আরো একটি গার্ডার ওঠানোর কাজ। এবারও সেই পড়ে যাওয়া ক্রেন দিয়েই গার্ডার ওঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তার আগে এ ধরনের কার্যক্রমের জন্য যেসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার আইন রয়েছে সে অনুযায়ী কোনো কিছুই করা হয়নি। নিচে চারদিকে ঘেরাও দেয়ার ব্যবস্থা না করায় সেখানে কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমেছিল। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শ্রমিকও আনা হয়নি। ঘটনাস্থলে উপস্থিতজনদের মধ্য থেকেই আগ্রহী কয়েকজনকে নিযুক্তি দিয়েছিলেন কর্তা ব্যক্তিরা। স্বপন নামের যে শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে সে ছিল তাদেরই একজন। ওদিকে রেললাইনের ওপর গার্ডার পড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার পর সাড়ে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ট্রেন চলাচল বন্ধ থেকেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন এবং এলজিইডি’র কর্মকর্তারা। যথারীতি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের মালিবাগ রেলগেট অংশের এই দুর্ঘটনাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখার বা বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্তদের চরম গাফিলতিরই নতুন একটি উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। স্মরণ করা দরকার, রাজধানীতে না ঘটলেও ২০১২ সালে চট্টগ্রামে একই ধরনের গার্ডার পড়ে ১৬ জনের মৃত্যু ঘটেছিল। রাজধানীতে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারগুলোতেও বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় দুর্ঘটনা কম ঘটেনি। সে কারণে তো বটেই, নির্মাণ কাজের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনাসহ আইন থাকার কারণেও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যথেষ্ট সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা। অন্যদিকে আলোচ্য ফ্লাইওভার নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটি শুধু দায়িত্ব পালনেই অবহেলা করেনি, আইনও লংঘন করেছে। প্রথমত ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে ক্রেন পড়ে যাওয়ার পর তারা একটি গার্ডারকে নামকাওয়াস্তে তার ও দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে, যার কারণে যে কোনো সময় গার্ডারটি পড়ে গিয়ে প্রাণহানি ঘটাতে পারতো। হতে পারতো নিচ দিয়ে চলাচলকারী গাড়িসহ বিপুল সম্পদেরও ক্ষয়ক্ষতি। ঘেরাওসহ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নিয়েই নতুন একটি গার্ডার ওঠানোর উদ্যোগ এসেছে গাফিলতির দ্বিতীয় প্রমাণ হিসেবে। তৃতীয় প্রমাণ হলো, প্রতিষ্ঠানটি গার্ডার ওঠানোর কাজে দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শ্রমিকদের নিযুক্তি দেয়নি। তেমন শ্রমিকদের আগে থেকে নিয়েও আসেনি। অমন একটি কঠিন ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রতিষ্ঠানটি বরং সেখানে ভিড় করা লোকজনদের ব্যবহার করেছে। এরকম একজন শ্রমিকই গার্ডারের আঘাতে ঘটনাস্থলে মারা গেছে।
বিশেষজ্ঞসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন এবং আমরাও মনে করি, নির্মাণ আইন লংঘন এবং অমার্জনীয় গাফিলতির দায়ে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্তা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার। ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্লাইওভার বা অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণের সময় যাতে কারো পক্ষেই এ ধরনের গাফিলতি দেখানো সম্ভব না হয় তাও নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই, ফ্লাইওভারসহ প্রতিটি স্থাপনা নির্মণের সময় এ সংক্রান্ত আইন মেনে চলতে সকলকে বাধ্য করা হোক। এজন্য এলজিইডি তথা সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত মনিটরিং থাকা দরকার। আমাদের মতে জনগণের জান ও মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এখন থেকেই নির্মাণাধীন প্রতিটি স্থাপনার ব্যাপারে সরকারের উচিত মনিটরিং জোরদার করা। আমরা নিহত শ্রমিক এবং আহত সকলকে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানাই। আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করাও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ