ঢাকা, বুধবার 15 March 2017, ০১ চৈত্র ১৪২৩, ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ড্রোন আর রোবটের নিয়ন্ত্রণে ক্লাসরুম

আবু হেনা শাহরীয়া : রোবট আর ড্রোনের ব্যবহার নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, রোবটের কারণে মানুষের উপস্থিতি দিনদিন কমে যাচ্ছে। এখন হাসপাতাল, বিমানবন্দর, চেকপোস্টসহ অনেক স্থানেই রোবটের ব্যবহার হচ্ছে। এবার তারা ক্লাশ রুমও দখলে নিচ্ছে। তাদের উপস্থিতিতে ক্লাসরুমগুলো হালে লক্ষণীয় রকমের অধিকতর হাইটেক হয়ে উঠেছে। সেগুলোতে ইন্টারএ্যাকটিভ বোর্ড আছে। ল্যাপটপ আছে, অনলাইন শিক্ষণকলা আছে এবং সেগুলোর প্রসার ঘটেই চলেছে। তবে পাঠ্যক্রম সত্যিকার অর্থে বদলেছে কিনা কিংবা শিশুরা ভিন্ন ভিন্ন ডিভাইসে স্রেফ একই জিনিস শিখছে কিনা সেটাই হলো প্রশ্ন। কারও কারও বক্তব্য হলো, এই প্রজন্মের শিশুরা যে শিক্ষা লাভ করছে তা তাদের বাবা-মা বা দাদা- দাদিদের প্রাপ্ত শিক্ষা থেকে কিছুটা ভিন্ন তবে কৃত্রিম বুদ্ধি ও রোবট যেখানে চাকরির প্রতি হুমকি সৃষ্টি করছে সেখানে এই প্রজন্মের শিশুদের যেসব দক্ষতা শেখা প্রয়োজন সেটা এতদিনের প্রচলিত শিক্ষার মূল ধারা থেকে একেবারে ভিন্ন হওয়ারই কথা।
স্কুল রোবট: সম্প্রতি বিবিসির তরফ থেকে লন্ডনে শিক্ষণ ও শিক্ষার বিভিন্ন উপায় সন্ধান করা হয়। এক্সেল থেকে সামান্য একটু দূরে রয়েছে লন্ডল ডিজাইন ও এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভাসিটি টেকনিকাল কলেজ এটা ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার প্রয়োজন মেটায়। এটি চালু হয় গত সেপ্টেম্বরে এবং গোড়া থেকেই এর ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়ে যায়। যে ১৮০ জন ছাত্রছাত্রী ওই কলেজে স্থান পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে তাদের কলেজে যোগ দেয়ার পর থেকে ১২ সপ্তাহে পাঠক্রমের এক অতি ভিন্ন রকমের অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাদের একটি গ্রুপ প্রায় শূন্য থেকে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির এমন এক পরিবেশ রচনা করছে যেখানে দর্শকদের ওয়াটার এইড নামক একটি এনজিওর চ্যারিটি কাজ দেখানোর একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে ইথিওপিয়ার একটি গ্রাম ঘুরিয়ে আনা হয়। আরেকটি গ্রুপ ‘পেপার’ নামে মানুষের মতো দেখতে একটি রোবটকে কিভাবে বিভিন্ন ধরনের অঙ্গভঙ্গি করতে হয় তা শেখানোর পেছনে একটা টার্ম কাটিয়ে দিয়েছে। এই অঙ্গভঙ্গির মধ্যে রয়েছে ‘ড্যাব’ নামে নৃত্যের একটি মুদ্রা যা গোটা ব্রিটেনের শিশুদের এখন বেশ পছন্দের। এই প্রতিষ্ঠানে সফট্যাংক কোম্পানির তৈরি দু’টি রোবট আছে। তৃতীয় গ্রুপটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী স্কী সফরে গেছে। সঙ্গে নেয়া ১১টি নাও রোবটকে স্কী শেখানোই তাদের উদ্দেশ্য।
স্কুলে হোমওয়ার্ক দেয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। স্কুলের প্রধান শিক্ষক জিওফ্রে ফাওলার বলেন, হোমওয়ার্কের বদলে ছাত্রছাত্রীদের তাদের নিজস্ব সময় নিজেদের প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যেতে চাওয়ার উপর নির্ভর করা হয় আর এভাবেই তাদের নতুন ধরনের শিক্ষার অংশ হতে অনুপ্রাণিত করা হয়। অন্য স্কুলগুলো উপরে উল্লিখিত প্রকল্পগুলোকে হয়ত মূল পাঠক্রমের সঙ্গে যুক্ত মজা বা কৌতুকের বিষয় হিসেবে দেখবে। তবে ফাওলার মনে করেন এগুলোকে পাঠক্রমের মধ্যে সংযোজন করতে হবে। এমন স্কুল বেশকিছু শিল্পের পৃষ্ঠপোষকের সঙ্গে কাজ করে যাদের মধ্যে আছে ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডন, স্টেমস ওয়াটার এবং ফুজিৎসু। এরা সবাই কর্মস্থলের জন্য নিজেদের উপযুক্ত করে তুলতে ছেলেমেয়েরা যে ধরনের দক্ষতা করায়ত্ত করতে চাইছে বলে আশা করেন সেই ধরনের দক্ষতা অর্জনের জন্য উপকরণ এবং সেই সঙ্গে শিক্ষানবিশি কাজ যুগিয়ে থাকেন।
বর্তমানে ইংল্যান্ডে ৪৮টি বিশ্ববিদ্যালয় টেকনিকাল কলেজ (ইউটিসি) আছে। তবে স্কিমটি বিতর্কিত প্রমাণিত হয়েছে। এমনি একটি স্কিম ২০১২ সালে পূর্ব লন্ডনে চালু হবার দু’বছর পরই বন্ধ হয়ে যায়। পর্যাপ্তসংখ্যক ছাত্রছাত্রী না টানতে পারার জন্য। বেডফোর্ডশায়ারেও এমনি একটি স্কিম অপ্রতুল বলে চিহ্নিত হয়। কিছু কিছু স্কুলের প্রধান শিক্ষক বৃত্তিমূলক স্টাইলের এই শিক্ষার ধারণাটির বিরোধিতা করেন এবং তাদের স্কুলগুলো থেকে ইউটিসির ছাত্র রিক্রুট করার ব্যাপারে বাধা দেন। তবে পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে ইউটিসিতে যোগদানকারী ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার ফল চলিত স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের চেয়ে বেশি ভাল হতে না পারলেও ভালই হয়েছে। ইউটিসির কম্পিউটার বিজ্ঞানের প্রধান জেমস কালি প্রতিদিন নিজে ব্যাপারটিকে এভাবেই দেখেন। তিনি বলেন, আমি কখনও ছাত্রদের এত তাড়াতাড়ি শিখতে দেখিনি।
ড্রোন পাঠ: টিংকার নামে একটি কোম্পানি তার ‘কোডিং-থ্রু-গেমস্’ দর্শনটিকে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ হাজার স্কুলে পৌঁছে দিয়েছে। সম্প্রতি কোম্পানিটি একটি নতুন প্রকল্প চালু করেছে সেটা হলো ড্রোন পাঠের মাধ্যমে কোডিং শেখানো। যুক্তরাষ্ট্রের শত শত স্কুল এই ধারণাটি গ্রহণ করেছে। কোম্পানি এখন এই কার্যক্রম যুক্তরাজ্যে চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য স্কুলগুলো ড্রোন প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘প্যারটের সঙ্গে টিংকারের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ৬ থেকে ১২টি ড্রোন কেনে এবং তারপর টিংকারের ড্রোন পাঠের ফ্রি সেটটি ডাউনলোড করতে পারে। এর মাধ্যমে ছেলেমেয়েরা শিখে কিভাবে ড্রোনকে ব্যাক-ফ্লিপ করাতে হয়। এছাড়া আরও জটিল ধ্যানধারণাও তারা শিখে অল্পদিনের মধ্যে তাদের আত্মবিশ্বাস এত বেড়ে যায় যে তারা এক মাসের ড্রোন ক্লাসরুমের ভেতর উড়াতে শেখে। সেই ড্রোন ছাদ অবধি উঠে যেতে এবং চারদিকে দু’টি চলতে পারে অথচ সেগুলোর মধ্যে কোন সংঘর্ষ হয় না, অন্য কোন প্রতিবন্ধকের সঙ্গেও ধাক্কা খায় না। প্রতি সপ্তাহে এরা নিজেদের জন্য আরও নতুন ও চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য নির্ধারণ করে। একত্রে কাজ করে এবং সে অনুযায়ী তাদের ড্রোন কোডিং করে। লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে বিশেষ করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে কাজটা সম্পন্ন হলে তাদের চোখে-মুখে যে উত্তেজনার শিহরণ ফুটে উঠে তা সবার মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে। ড্রোনগুলো নিরাপত্তার নানান বৈশিষ্ট্য নিয়ে তৈরি করা হয়। তার মধ্যে একটা হলো ক্লাসরুমে চলার উপযোগিতা। অর্থাৎ এগুলো বাড়তি ধীর গতিতে চলে।
ছাত্রছাত্রীরা একজনের ড্রোনের কমান্ড আরেকজন গ্রহণ করতে পারে না। এ অবস্থায় কোন কৌতূহলী হতে ড্রোনের ব্লেডের কাছাকাছি এলে সেক্ষেত্রে আপনা থেকে থেমে যাওয়ার একটা বাটন আছে। টিংকারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কৃষ্ণ বেদাতী বলেন, আমাদের লক্ষ্য প্রোগ্রামার তৈরি করা নয় বরং জীবনের একটা দক্ষতা হিসাবে কোডিং প্রদান করা।
অলটারনেটিভ রিয়েলিটি: এমন এক ক্লাসরুমের কথা ভাবুন তো যেখানে খাতা নেই, পাঠ্যবই নেই। সব ছাত্রছাত্রী তাদের হেডসেট থেকে শিখে। ওই হেডসেট দিয়ে তারা ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে প্রবেশ করে ফরাসী বিপ্লবের গোটা কাহিনী জেনে নেয়। কিংবা সৌরজগতের কোন হলোগ্রামের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে মহাকাশ সম্পর্কে জানে। এ ধরনের শেখার বিশাল সুবিধা আছে বলে মনে করেন বিশেজ্ঞরা। তারা মনে করেন এ আর ও ডিআর-ই হলো আমাদের পরবর্তী দিগন্ত।
এই সংক্রান্ত ডিভাইসগুলো ছাত্রছাত্রীদের গভীরভাবে শিখার কাজে নিয়োজিত করে, এবং শিক্ষার বহুবিধ শাখার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। মাইক্রোসফট্ সম্প্রতি একটি ‘মিক্সড রিয়েলিটি’ হেডসেট ছেড়েছে। মানবদেহের এমন এক হলোগ্রাম বের করেছে যা কাটাছেঁড়া করা যায় এবং হাড়গোড় দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং ধমনী পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখা যায়। ভি আর ও এআর। ডিভাইসগুলোর মূল্যহ্রাসের ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে এগুলোর অবলম্বন সহজতর হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ