ঢাকা, বুধবার 15 March 2017, ০১ চৈত্র ১৪২৩, ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চাপা পড়ে যাচ্ছে রিজার্ভ চুরির ঘটনা

# রহস্যজনক নিরবতা অর্থমন্ত্রণালয়ের
# অর্থ ফেরৎ না পাওয়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
এইচ এম আকতার : ৮১০ কোটি টাকার রিজার্ভ চুরি। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছুই ঘটেনি। সব কিছু আটকে রয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়াতেই। এখনও ধরা ছোয়ার বাইরে রয়েছে মূল হোতারা। অর্থমন্ত্রী বলছেন, টাকা উদ্ধারের স্বার্থে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হচ্ছে না। কিন্তু টাকাও উদ্ধার হয়নি। তাহলে কার স্বার্থে আটকে রয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ। এ নিয়ে কেউ কথাও বলছে না। এ ঘটনার রহস্য অপ্রকাশিতই থেকে যেতে পারে।
নীতি-নির্ধারকদের কারো মুখে আর রিজার্ভ চুরির প্রসঙ্গ আসছে না। রহস্যজনকভাবে নিরব বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়। বারবার নানা টালবাহানা করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না অর্থমন্ত্রী। এতে ক্ষুদ্ধ সাধারণ মানুষ। তাদের আশঙ্কা অন্য পাঁচটা ঘটনার মতই ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে রিজার্ভ চুরির বিষয়। অর্থ উদ্ধারে মরিয়া হতে বাঁধা কোথায় তা বুঝতে পারছে না কেউই।
শুধু বাংলাদেশ নয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা বিশ্বে প্রথম। দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ব জুড়ে। এক বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এ ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন এখনও প্রকাশ পায়নি। অথচ তিন মাসের মধ্যে এর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে গঠিত তদন্ত কমিটি। তা প্রকাশ্যে একাধিকবার দিন তারিখ নির্ধারণ হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
ঘটনা ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারির। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে বেহাত হয়ে যায় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার বা ৮১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাড়ে তিন কোটি ডলার ফেরত আসে শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের উদ্যোগে। বাকি সাড়ে ছয় কোটি ডলার আদৌ ফেরত পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ টাকা ফেরত পেতে হলে বহুদূর পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রমাণ করতে হবে এ টাকা পেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের দুর্বলতার কারণেই চুরি হয়েছে। এর জন্য বাংলাদেশ কোনভাবেই দায়ী নয়।
অথচ ঘটনার পর পর একাধিকবার ফেডারেল ব্যাংক দাবি করেছে, আর্ন্তজাতিক সব ব্যাংকিং নিয়মনীতি মেনেই তারা টাকা ছাড় করেছে। তাদের ব্যাংক থেকে কোন টাকা চুরি হয়নি। আর এ কারণেই কোন মামলা করেনি ফেডারেল ব্যাংক। যদি তাদের ব্যাংক থেকে কোন টাকা চুরি বা হ্যাকিং হতো তাহলে অবশ্য তারা মামলা করতো।
তাই টাকা ফেরত পেতে হলে বাংলাদেশকেই প্রমাণ করতে হবে তাদের একাউন্ট থেকে যে টাকা খোয়া গেছে তা চুরি হয়েছে। এ টাকা চুরির জন্য তারা কোনভাবেই দায়ী নয়। শুধু তাই নয় তাদের আরও প্রমাণ করতে হবে তাদের একাউন্ট থেকে চুরি যাওয়া টাকাই ফিলিপাইনে রয়েছে। আরও প্রমাণ করতে হবে কারা এই টাকা চুরি করেছে। এর সাথে বাংলাদেশের কারা জড়িত রয়েছে। যারা চুরি করেছে তারা যদি স্বীকারোক্তি দিয়ে থাকে তাহলেই বাংলাদেশ টাকা ফেরত পেতে পারে।
ঘটনা শুরুর দিকে সরকারের দিক থেকে বেশ তৎপরতা দেখা গেলেও এখন আর এ নিয়ে কেউ কথা বলছে না। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশে অর্থমন্ত্রী তিন দফায় তারিখ নির্ধারণ করলেও তা এখনও প্রকাশিত হয়নি। পরে অর্থমন্ত্রী বলেন রিপোর্ট প্রকাশ পেলে টাকা উদ্ধারে সমস্যা হবে। তাই টাকা উদ্ধারের স্বার্থে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা যাবে না। অথচ টাকা ফেরত পেলে যে আইনি প্রক্রিয়া লাগবে তা নিয়ে সরকারের পক্ষে কোন তৎপরতা নেই। সরকারের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে না তারা টাকা ফেরৎ চায়। টাকা উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের তৎপরতা চোখে না পরায় প্রবল হচ্ছে টাকা ফেরত না পাওয়ার আশঙ্কা।
সাধারণ জনগণ মনে করে, ইদানিং যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে মানে রিজার্ভ চুরির বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। এমনকিছু বের হয়ে আসতে পারে যাতে অনেকের সমস্যা হয়ে যাবে সেজন্য এই ইস্যু চাপা পড়ে যাচ্ছে। এই ঘটনার সাথে কারা জড়িত সেটা জনগণের কাছে প্রকাশ হওয়া জরুরি।
শুধু টাকা উদ্ধারে ধীরগতি নয়, রিজার্ভ চুরির প্রতিবেদন প্রকাশে অর্থমন্ত্রীর লুকোচুরিতে বেড়েছে সন্দেহ। প্রতিবেদন পেয়েও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে হোতারা আরও উৎসাহী হবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন,  তদন্ত প্রতিবেদন যদি প্রকাশ হত তাহলে দায় থেকে কিছুটা রেহাই পাওয়া যেত। এই বিষয়ে সোচ্চার হওয়া উচিত। আমরা যদি অর্ধেক টাকা উদ্ধার করতে পারতাম তাহলে বাকিটা পরে চিন্তা করা যেত। এটা হিমাগারে যাওয়ার মত ইস্যু ছিল না। যদি এখন সরকার নির্লিপ্ত থাকে তাহলে কিছু করার নেই।
রিজার্ভের চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের তৎপরতা বাড়ানোর তাগিদ অর্থনীতিবিদদের। তারা মনে করেন, সরকার শুরুর দিকে এ ঘটনার রহস্য প্রকাশে যতটা তৎপর ছিল এখনও ঠিক ততটাই উদাসীন। সরকারের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে না তারা আর এ টাকা ফেরৎ চান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ