ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 March 2017, ০২ চৈত্র ১৪২৩, ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

উপসর্গহীন গ্লুকোমা প্রতিরোধ করুন

আমার মামাত ভাই  রহমান কোন এক এনজিওর বড় কর্মকর্তা। প্রায়ই দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ান। পয়সার কোন অভাব নাই। আমাকে দেখলেই বলে তোর কাছে চোখ দেখাতে আসব একদিন। কিন্তু বেচারা ব্যস্ততার কারণে আসতে পারে না। এমন কি বিদেশে গিয়েও চোখ দেখানোর সুযোগ হয়না তার। বয়স ৫৬ বছর। সুন্দর চেহারার অধিকারী কিন্তু ডায়াবেটিস । শুধু তাই নয় তাদেও পরিবারের তার মা খালাদের চোখ গ্লুকোমার কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ইতিহাসও আছে। এ সমস্ত কারণে আমি নিজে ও তাকে কয়েকবার চোখ দেখানোর জন্য বলেছি। চল্লিশের  ঊর্ধ্বে বয়স, ডায়াবেটিস, পারিবারিক গ্লুকোমার ইতিহাস ইত্যাদি গ্লুকোমার সম্ভাবনা একজন ব্যক্তির মাঝে বহুগুণে বড়িয়ে দেয়। যাই হোক বহুদিন পর শেষ পর্যন্ত একদিন কোন এক সন্ধ্যায় আমার চেম্বারে রহমান ভাই এসে হাজির। বলল দেখ গত কিছুদিন ধরে আমি বার বার চশমা বদলাচ্ছি ডাক্তারের কাছে গিয়ে কিন্তু স্বস্তি পাচ্ছি না, দৃষ্টির ব্যাপ্তি ও আগের চাইতে কেমন যেন কমে গেছে। আমার চোখটা একটু দেখে দে। আমি যথারীতি পরীক্ষা করা শুরু করলাম। দেখলাম তার দূরের দৃষ্টি কিছুটা কমে এসেছে, চশমা দিয়েও তা ঠিক করা যাচ্ছে না। চোখের প্রেসার মাপতে গিয়ে দেখি প্রেসার অনেক বেশি। আমি একটু শংকিত হয়ে গেলাম, শত হলেও নিজের ভাই। চোখের রেটিনা দেখার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী কওে যখন চোখের সব চাইতে সংবেদনশীল নার্ভ পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখলাম নার্ভেও প্রায় ৮০ ভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু এক চোখে নয় অন্য চোখেও একই অবস্থা, কিন্তু খালি চোখে দেখে আনুমানিক বললেই হবে না এটার সত্যতা আরও যাচাই করার জন্য তাকে কিছু উন্নত মানের পরীক্ষার জন্য পাঠালাম। পরীক্ষার রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলাম কিন্তু দুঃভাগ্য পরীক্ষার রিপোর্ট বলে দিল ওনার চোখের নার্ভেও ক্ষতির পরিমাণ আমার ধারণার মতোই। বিষয়টা যখন রহমান ভাইকে জানালাম তখন প্রচ-ভাবে ভেঙে পড়ল। সেই সাথে ওনার স্ত্রীও। বার বার আমাকে জিজ্ঞেস করতে লাগল আমি কি আগের মতো দেখতে পাব না? অমি যদি নিয়মিত ওষুধ দেই তাহলে কি চোখ আগের মত ভালো হবেনা? আমি বললাম ভাই আপনার চোখের গ্লকোমা রোগটা মানুষের চোখকে চিরতরে ক্ষতি করে দেয়। যে পরিমাণ ক্ষতি হয়ে গেছে সে পরিমাণ দৃষ্টি আবার ফিরে পাবার কোন সম্ভাবনা নাই, তবে যে টুকু দৃষ্টি আছে ততটুকু দৃষ্টি টিকিয়ে রাখার উপায় আপনার আছে। দৃষ্টি টিকিয়ে রাখতে হলে আপনাকে অবশ্যই নিয়মিত ডাক্তারের  পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যকহার করতে হবে। ওষুধ ছাড়াও লেজার বা অপারেশনের মাধ্যমে আপনার চোখের প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। গত জুন মাসে  অত্যন্ত সুন্দরভাবে  তার চোখের অপারেশন সম্পন্ন করি। এখন তিনি নিয়মিত চোখ দেখিয়ে যান এবং বর্তমানে তার চোখের চাপ অত্যন্ত সুন্দর নিয়ন্ত্রণে আছে। এখন আসুন  গ্লুকোমা সম্পর্কে আমরা একটু বিস্তারিত জেনে নেই।
গ্লুকোমা কি?
গ্লুকোমা চোখের একটি জটিল রোগ যাতে চোখের স্নায়ু ধীরে ধীরে  ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ধীরে ধীরে চোখের দৃষ্টি কমে যায়। এমন কি এতে এক সময় রোগী অন্ধত্ব বরণ করতে বাধ্য হয়। তবে সময় মত ধৈর্য ধরে চিকিৎসা করলে এই অন্ধত্বের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চোখের অভ্যন্তরীণ উচ্চচাপ এর জন্য দায়ী। 
গুøকোমা রোগ কেন হয়? এই রোগের সুনির্দিষ্ট কোন কারণ খুঁজে পাওয়া না গেলেও অদ্যবধি চোখের উচ্চ চাপই এই রোগের প্রধান কারণ বলে ধরে নেয়া হয়। তবে স্বাভাবিক চাপেও এই রোগ হতে পারে। সাধারণত: চোখের উচ্চ চাপই ধীরে ধীরে চোখের ¯œায়ুকে  ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দৃষ্টিকে ব্যহত করে। তবে কিছু কিছু রোগের সাথে এই রোগের গভীর সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায় এবং অন্যান্য কারণেও এই রোগ হতে পারে। যেমন: পরিবারের অন্য কোন নিকট আত্মীয়ের (মা, বাবা, দাদা, দাদী, নানা, নানী, চাচা, মামা,
খালা, ফুপু) এই রোগ থাকা। ঊর্ধ্ব বয়স (চল্লিশ বা তদূর্র্ধ্ব) ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্ত চাপ। মাইগ্রেন নামক মাথা ব্যথা রাত্রিকালীন উচ্চ রক্ত চাপের ওষুধ সেবন করা। স্টেরইড নামক ওষুধ দীর্ঘদিন সেবন করা। চোখের ছানি অপারেশন না করলে বা দেরী করলে। সময় মত চোখের ছানী অপারেশন না করা। চোখের অন্যান্য রোগের কারণে। জন্মগত ত্রুটি ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র চোখের উচ্চ চাপই ওষুধ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যা গ্লুকোমা রোগের প্রধান কারণ।
গুøকোমা রোগের লক্ষণ কি? অনেক ক্ষেত্রেই রোগী এই রোগের কোনো লক্ষণ অনুধাবন করতে পারে না। চশমা পরিবর্তনের সময় কিংবা নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষার সময় হঠাৎ করেই চিকিৎসক এই রোগ নির্ণয় করে থাকেন। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিন্মের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে। যেমন: ১ ঘন ঘন চশমার গ্লাস পরির্বতন হওয়া ২ চোখে ঝাপসা দেখা বা আলোর চারপাশে রংধনুর মতো দেখা ৩ ঘন ঘন মাথা ব্যথা বা চোখে ব্যথা হওয়া ৪ দৃষ্টি শক্তি ধীরে ধীরে কমে আসা বা দৃষ্টির পারিপার্শ্বিক ব্যপ্তি কমে আসা। অনেক সময় চলতে গিয়ে দরজার পাশে বা অন্য কোন পথচারীরগায়ে ধাক্কা লাগা ৫ মৃদু আলোতে কাজ করলে চোখে ব্যথা অনুভূত হওয়া ৬ ছোট ছোট বাচ্চাদের অথবা জন্মেও পর চোখের কর্নিয়া ক্রমাগত বড় হয়ে যাওয়া বা চোখের কর্নিয়া সাদা হয়ে যাওয়া, চোখ লাল হওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া ইত্যাদি।
গ্লুকোমা সম্পর্কে জানা জরুরী কেন?
*  আমাদের দেশে এবং পৃথিবী ব্যপী অন্ধত্বের দ্বিতীয় কারণ হল চোখের   গ্লকোমা *  অনেক ক্ষেত্রে এই রোগের লক্ষণ রোগী বুঝতে পারার আগেই চোখের ¯œায়ু অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে *  এই রোগে দৃষ্টির পরিসীমা বা ব্যপ্তি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসে এবং কেন্দ্রীয় দৃষ্টি শক্তি অনেক দিন ঠিক থাকে বিধায়, রোগী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে অনেক দেরী করে ফেলেন* গ্লুকোমা চোখের অনিরাময় যোগ্য অন্ধত্ব তৈরী করে। তাই একবার দৃষ্টি যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, চোখে গ্লুকোমা রোগ হলে রোগীকে সারা জীবন চিকিৎসকের সংস্পর্শে থাকেন না বা ঠিকমত ওষুধ ব্যবহার  করেন না। ফলে এই রোগ নীরবে ক্ষতি করে অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যায়।
 গ্লুকোমা রোগের চিকিৎসা কি? গ্লুকোমা রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব কিন্তু নিরাময় সম্ভব নয়। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্ত চাপের মত এই রোগের চিকিৎসা সারাজীবন করে যেতে হবে। এই রোগে দৃষ্টি যতটুকু হ্রাস পেয়েছে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে দৃষ্টি যাতে আর কমে না যায় তার জন্য আমাদের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।
এ রোগের প্রচলিত তিন ধরনের চিকিৎসা রয়েছে: ক) ওষুধ এর দ্বারা চিকিৎসা খ) লেজার চিকিৎসা গ) শৈল চিকিৎসা বা সার্জারি। যেহেতু চোখের উচ্চ চাপ এই রোগের প্রধান কারণ তাই ওষুধের দ্বারা চোখের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা না গেলে এশাধিক ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। তদুপরি তিন মাস অন্তর অন্তর  চিকিৎসকের শরনাপন্ন হয়ে এ রোগের নিয়মিত কতগুলো পরীক্ষা করিয়ে দেখতে হবে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে আছে কি না। যেমন:-
*  দৃষ্টি শক্তি পরীক্ষা *  চোখের চাপ পরীক্ষা*  দৃষ্টির ব্যাপ্তি বা ভিজ্যুয়াল ফিল্ড পরীক্ষা*  চোখের নার্ভ পরীক্ষা।
গ্লুকোমা রোগে রোগীর করণীয় কি? চিকিৎসক  রোগীর চক্ষু পরীক্ষা করে তার চোখের চাপের মাএা নির্ণয় করে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করে দেবেন তা নিয়মিত ব্যবহার করা। দীর্ঘ দিন একটি ওষুধ ব্যবহারে  এর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে বা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পাওে তাই নিয়মিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।
সময়মত চোখের বিভিন্ন পরীক্ষা (যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে) করিয়ে দেখা যে তার গ্লুকোমা নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা। পরিবারের সবার চোখ পরীক্ষা করিয়ে গ্লুকোমা আছে  কিনা তা নিশ্চিত হওয়া। মনে রাখবেন গ্লুকোমা অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারন যার কোন প্রতিকার নেই। প্রতিরোধই একমাত্র উপায়।
তাই ২০১৭ সালে বিশ্ব গ্লকোমার স্লোগান হল “উপসর্গহীন গ্লুকোমা প্রতিহত করুন”
-ডা. জাকিয়া সুলতানা শহীদ
গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞ, সেক্রেটারি জেনারেল- বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটি, সহযোগী অধ্যাপক, চক্ষু বিভাগ, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, কলাবাগান, ঢাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ