ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 March 2017, ০২ চৈত্র ১৪২৩, ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

স্থূলতায় কিডনি রোগ বাড়ে

এবারের বিশ্ব কিডনী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে “স্থ’ূলতা কিডনী রোগ বাড়ায়, সুস্থ্য জীবন যাপনে সুস্থ্য কিডনী”। অতিরিক্ত খাদ্য বস্তু গ্রহণ করলে খাদ্য বস্তু হজমের পর চর্বিতে রূপান্তর হয়ে দেহে জমা হয়। মানব দেহে মস্তিষ্ক ছাড়া অন্য যে কোন অঙ্গে চর্বি জমা হওয়ার সুযোগ থাকে। চর্বি জমা হওয়ার একমাত্র কারন শুধু অধিক খাদ্য গ্রহণ নয়, বংশগত প্রবণতা, কর্ম সম্পাদনে ধীরগতি ও বিভিন্ন রকমের হরমোনের ও ওষুধের প্রভাবের জন্য হতে পারে। সারা পৃথিবীতে প্রায় ষাট কোটি লোক স্থ’ূলতা রোগে ভুগছেন। আমাদের শরীরের দৈনন্দিন কর্ম কা-ের জন্য এনার্জি (শক্তি) প্রয়োজন। আমরা খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের মাধ্যমে এই এনার্জি পেয়ে থাকি। যদি খাদ্য দ্রব্যের এই কেলোরি আমাদের কর্মকা-ের জন্য ব্যয় ক্যালোরি থেকে বেশী হয়, তখন খাদ্যের অতিরিক্ত ক্যালোরি চর্বি আকারে শরীরে জমা হয়ে থাকে। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার কারণে স্থ’ূলতা হয়ে থাকে এবং ওজন বৃদ্ধি পায়। স্থূলতা শুধু কিডনী মূল কারণ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়, স্থূলতা ধীর গতিতে কিডনী রোগের ঝুঁকির জন্য অন্যতম কারণ। স্থূলতার জন্য কিডনীর ছাঁকনির অতিরিক্ত কাজ করতে হয়, যার ফলে ধীরে ধীরে কিডনীর কার্যক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘ মেয়াদে দু’টি কিডনী তখন অকেজো হয়ে পড়ে। তবে একটি ভালো খবর হচ্ছে, এই স্থূটলতা সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং কিডনীর কার্যক্ষমতা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা যায়। শুধু স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা ও জ্ঞান, সেই সাথে মনের দৃঢ়তা থাকলে স্থূলতা তথা কিডনী রোগ থেকে পরিত্রান পাওয়া যায়। এই বিষয়ের উপর গুরুত্ব রেখেই এই বৎসর বিশ্ব কিডনী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে “স্থূলতা কিডনী রোগ বাড়ায় এবং সুস্থ্য জীবন যাপনে কিডনী সুস্থ্য রাখা যায়”। স্থূলতা ও কিডনী রোগ বর্তমানে পৃথিবীতে সুপ্ত মহামারী রোগের তুল্য। সেই জন্য ২০১৭ সালের বিশ্ব কিডনী দিবসে এই প্রতিপাদ্য বিষয়টি যথা উপযোগী। এটা প্রতিয়মান ক্রমবর্ধমান ভাবে স্থূলতা বাড়তে থাকলে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বের  শতকরা  আঠার ভাগ পুরুষ ও একুশ ভাগ মহিলা স্থূলতা রোগে  ভুগবেন বলে আশংকা করা হচ্ছে। “মেটাবলিক সিনডম” (স্থূলতা, ইনসুলিনের অকার্যকরিতা, রক্তে ইনসুলিনের পরিমান বেড়ে যাওয়া, রক্তে চর্বির মাত্রা বেড়ে যাওয়া) কিডনীর কার্যক্ষমতা ক্ষতি করতে সহায়ক। ¯ূ’লতা শুধু কিডনী রোগ নয় ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের চর্বি বৃদ্ধি, ঘুমানোর সময় শ্বাসকষ্ট, লিভারের চর্বি, পিত্ত থলির রোগ, হাড়ের রোগ, মানসিক সমস্যা বা রোগ, শরীরে বিভিন্ন স্থানের ক্যান্সার, বন্ধ্যত্ব এবং সর্বোপরি জীবন যাত্রার মান বেঘাত ঘটায়। স্থলতা কিডনীর পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে আক্রান্ত করতে পারে। পরোক্ষভাবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হার্টের রোগের জন্য দায়ী। আকস্মিক বা হঠাৎ কিডনী অকেজো  স্থূলতা রোগীর ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়।  অতএব কিডনী রোগ প্রতিরোধে সুস্থ্য জীবন যাপনের মাধ্যমে সুস্থ্য কিডনী রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিডনী ভালো বা সুস্থ্য রাখার জন্য শাশ্বত নিয়মগুলির প্রতি সজাগ হওয়া ও পালন করা উচিত। এই নিয়মগুলির মধ্যে ১। নিজকে সুস্থ্য, সবল ও কর্মঠ রাখুন (২) নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখুন (৩) রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণ রাখুন (৪) সুসম খাবার খাবেন, টাটকা শাক-শব্জি ও ফল মূল খাবেন। সেই সাথে ফাস্ট ফুড ও ড্রিংকস পানীয় পরিহার করুন। দৈনিক কায়িক পরিশ্রম করুন ও শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ রাখুন। শরীরের স্থূলতা থেকে মুক্ত থাকুন (৫) প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লিটার বিশুদ্ধ পানি পান করুন। (৬) তামাক, সিগারেট ও মদ জাতীয় তরল পানীয় বর্জন করুন। (৭) বেদনা নাসক ঔষধ, হারবাল ও গতানুগতিক স্থানীয় ওষুধ থেকে বিরত থাকুন। ব্যবস্থা পত্র ছাড়া ঔষধ ক্রয় ও খাবন না। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও স্থলতা অথবা বংশগত কিডনী রোগ থাকলে কিডনী রোগ শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় কিডনী রোগের পরীক্ষা নিরীক্ষা করুন। পরিশেষে সুন্দর শারীরিক কাঠামো আমাদের সকলের কাম্য। মেদযুক্ত (স্থ’ূলতা) শরীর কারোরই পছন্দ নয়। কারন স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ (হার্টের রক্তনালী প্রতিবন্ধকতা বা ব্লক) ও কিডনী রোগের ঝুঁকি বহন করে। উল্লেখ থাকে আমরা সহজেই খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে, কায়িক পরিশ্রম ও জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন করে স্থূলতা তথা স্থূলতায় জটিলতা থেকে রক্ষা পেতে পারি।
-অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ
প্রাক্তন পরিচালক ও অধ্যাপক কিডনী রোগ বিশেষজ্ঞ
জাতীয় কিডনী ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ