ঢাকা, শুক্রবার 17 March 2017, ০৩ চৈত্র ১৪২৩, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সীতাকুন্ডে সাঁড়াশি অভিযান এক নারীসহ ৫ জঙ্গি নিহত 

 

চট্টগ্রাম অফিস ও সীতাকুন্ড সংবাদদাতা : চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড পৌরসভার প্রেমতলা চৌধুরীপাড়ার ‘ছায়ানীড়’ বাড়ি ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানকালে চার জঙ্গি নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে একজন নারী ও চারজন পুরুষ। এই অভিযানের পর ১৮ ঘণ্টার শ্বাাসরুদ্ধকর প্রতীক্ষার অবসান হলো। 

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা ২০ মিনিটে অপারেশন অ্যাসল্ট-১৬ নামে এই অভিযানে অংশ নেয় বিশেষ প্রশিক্ষিত সোয়াত,  কাউন্টার টেররিজম ইউনিট,  র‌্যাব ও পুলিশের সম্বন্বয়ে গঠিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সকাল ১০টার পর অভিযান শেষ হয়। নিহত চারজনের পরিচয় জানা যায়নি। তারা নব্য জেএমবির সদস্য বলে দাবি করেছে পুলিশ। 

অভিযানের পর পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম বলেছেন,  চারজন জঙ্গি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দু’জন আত্মঘাতী। তারা গ্রেনেড বিস্ফোরণে আত্মঘাতী হন। তাদের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। নিহত জঙ্গিদের মধ্যে একজন নারী,  চারজন পুরুষ। এছাড়াও অভিযানে জঙ্গিদের হাতে আটকে পড়া ২০ জনকে উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযানে পুলিশের সোয়াত টিমের দুই সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের চট্টগ্রামে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,  দুই তলাবিশিষ্ট ছায়ানীড় নামে বাড়িটিতে আটটি ফ্ল্যাট রয়েছে। জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে গত বুধবার দুপুর থেকে বাড়িটি ঘিরে রাখেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট,  সোয়াত ও র‌্যাব সদস্যরা। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  ৮টির মধ্যে একটি ফ্ল্যাট জঙ্গিরা ভাড়া নিয়েছিল। বাকি ফ্ল্যাটগুলোতে ৭টি পরিবার বাস করতো। গত বুধবার দুপুরে পুলিশ জঙ্গি আস্তানায় অভিযান শুরু করার পর ভবনে থাকা পরিবারগুলোর সদস্যরা এতে আটকা পড়ে। রাতে বাড়ি থেকে কিছুক্ষণ পরপর গুলীবর্ষণের শব্দ শোনা গেছে। তবে মধ্যরাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোররাত পর্যন্ত তেমন গুলীর শব্দ শোনা যায়নি। 

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান,  বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা থেকে আবার অভিযান শুরু হয়। এরপর থেকেই পুলিশ সদস্যরা বাইরে থেকে গুলীবর্ষণ করেন। এর একপর্যায়ে ভেতর থেকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। এ সময় পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে যায়। এই বিস্ফোরণে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। সোয়াটের দুই সদস্যসহ তিনজন আহত হন। পরে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের চট্টগ্রাম শহরের একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। 

এদিকে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাবার পর এবং রাতভর অভিযানকে কেন্দ্র করে সীতাকু-ের প্রেমতলাসহ আশপাশের এলাকায় আতংক বিরাজ করছে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্কুল-কলেজসহ অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। তবে আতংক থাকলেও কৌতুহলী মানুষের ভিড় সামলাতে বেগ পেতে দেখা গেছে পুলিশকে। 

পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানায়, সীতাকুন্ড পৌর এলাকার ৫ নম্বর প্রেমতলা ওয়ার্ডে ‘ছায়ানীড়’ নামের ওই দ্বিতল ভবন বুধবার দুপুর থেকে ঘিরে রেখেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শুরুতে জঙ্গিদের তরফ থেকে কয়েক দফা গ্রেনেড হামলা এবং রাতভর গোলাগুলীর পর বৃহস্পতিবার সকালে শুরু হয় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও সোয়াটের ‘অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সটিন’। সোয়াত সদস্যরা পাশের একটি বাড়ি থেকে ছাদ হয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে জঙ্গিরা সেখানে বড় ধরনের আত্মঘাতি বিস্ফোরণ ঘটায় বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান। 

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি সফিকুল ইসলাম সকাল সোয়া ১০টায় ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন,  “আমরা এখন পর্যন্ত চারটি ডেডবডি সেখানে দেখেছি। তাদের দুজনের শরীরে ছিল সুইসাইড ভেস্ট। বিস্ফোরণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। দেহগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। দুজন মারা গেছে পুলিশের গুলীতে। ভেতরে আর কেউ নেই।” ডিআইজি সফিকুল বলেন,  “জঙ্গিরা দোতলায় দুটি ঘরে ছিল। সেখানে প্রচুর বিস্ফোরক রয়েছে। ছাদেও প্রচুর বোমার মজুদ দেখা গেছে। আমাদের অপারেশন শেষ হয়েছে। তবে ভবনটি নিরাপদ করার জন্য বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল কাজ করছে।” সীতাকু-ের দুটি জঙ্গি আস্তানা ‘নব্য জেএমবি’র মন্তব্য করে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন,  তাদের লক্ষ্য ছিল বিদেশীদের ওপর হামলা করে মিরসরাই-সীতাকু- অঞ্চলে বিদেশী বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করা। 

চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা বলেন, এটি ছিল আমাদের জন্য একটা দুঃসাহসিক অভিযান। নিজেদের নিরাপদে রেখে ও জিম্মিদের নিরাপত্তা বজায় রেখে অভিযান চালানো ছিল একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। ভবনের ভেতরে নারী,  শিশু,  বৃদ্ধ ছিল,  রোগাক্রান্ত মানুষ ছিল। জিম্মিদের যেন কোনো ক্ষতি না হয় সেটিই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। সবদিক ঠিক রেখে সফলভাবে আমরা অভিযান সম্পন্ন করেছি। 

স্থানীয়রা জানায়, সীতাকু-ের চৌধুরী পাড়ার প্রেমতলায় জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিতে বুধবার দিনগত রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকা থেকে এসে পৌঁছে সোয়াতের বিশেষ টিমের সদস্যরা। অভিযানের আগে একটি সাঁজোয়া যান ও পাঁচটি অ্যাম্বুল্যান্স প্রস্তুত রাখা হয়। 

সকাল সাড়ে ছয়টা নাগাদ মুহুর্মুহু গুলীর শব্দ শোনা যায় ওই বাড়ির আশপাশে। একপর্যায়ে বিকট শব্দে আরেকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই সময় বাড়ির ছাদে আগুনের কু-লী ও চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হতে দেখা যায় বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। ছয়টা ২০ থেকে ছয়টা ৩০ মিনিটের মধ্যে ছোড়া হয় কয়েকশ রাউন্ড গুলী। এরপর ঘটনাস্থলে ঢুকে একটি অ্যাম্বুল্যান্স। যাতে করে দুজন আহত পুলিশ সদস্যকে বের করে আনা হয়। এর আগে বুধবার রাত ৮টা ১০ মিনিটে গুলী ছুড়তে ছুড়তে সড়ক থেকে কয়েকশ গজ দূরে আস্তানার দিকে প্রবেশ করতে দেখা গিয়েছিল পুলিশকে। এ সময় হ্যান্ডমাইকে জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাতেও শোনা গিয়েছিল পুলিশকে। 

 জানা গেছে, বুধবার দুপুরে চৌধুরীপাড়ার ছায়ানীড় ভবনের নিচতলায় ওই আস্তানায় পুলিশ অভিযান চালাতে গেলে তখনও তাদের ওপর তিনটি হাতবোমা ছুড়ে মারে জঙ্গিরা। এতে সীতাকু- থানার ওসি (তদন্ত) মোজাম্মেল সহ দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। এরপর পুলিশ পিছু হটে পুরো আস্তানা ঘিরে রাখে। এর আগে দুপুরে সীতাকু- পৌরসভার লামারবাজার আমিরাবাদের সাধন কুটির থেকে জঙ্গি দম্পতিকে তাদের এক শিশুসন্তানসহ আটক করা হয়। সাধন কুটিরের মালিকই মূলত তাদের ধরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। এরপর দুপুরেই তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে চৌধুরীপাড়ার আস্তানায় অভিযান চালাতে গিয়েছিল পুলিশ। এরপর চৌধুরীপাড়ায় দ্বিতীয় দফা অভিযান শুরুর আগে পাঁচটি সিএনজি অটোরিকশায় করে ছায়ানীড় ভবনের আশপাশের কিছু বাসিন্দাকে সরিয়ে নেয় পুলিশ। ওই ভবনের নিচতলার একটি বাসা আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছিল জঙ্গিরা। দুটি আস্তানাই নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্র সংগঠন জেএমবির বলে জানিয়েছে পুলিশ। 

এদিকে দুপুর একটার দিকে মামলার আলামত সংগ্রহের জন্য ঘটনাস্থলে যায় সিআইডির ফরেনসিক টিম। এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ছায়ানীড় ভবনের জঙ্গি আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে জানিয়ে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এডিসি কাজী সানোয়ার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছেন,  এখানে যেসব সরঞ্জাম পাওয়া গেছে সেগুলো দিয়ে ৪০ থেকে ৫০ কেজি বোমা বানানো যেত। তিনি বলেন,  জঙ্গি আস্তানা থেকে বোমা তৈরির এক্সক্লুসিভ সব সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি কার্টনে এসিড,  লিকুইড কেমিক্যাল ও ১২ সেট জেল এক্সক্লুসিভ পাওয়া গেছে। 

 এ দিকে ছায়ানীড় ভবনের সিঁড়িতে যে নারী জঙ্গির লাশ পাওয়া গেছে,  তার শরীরে অবিস্ফোরিত একটি গ্রেনেড বাধা আছে। তার শরীরে সুইসাইডাল বেল্টও বাধা আছে বলে জানা গেছে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ