ঢাকা, শুক্রবার 17 March 2017, ০৩ চৈত্র ১৪২৩, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ব্যবসায়ীদের ৬শ’ ১৫ কোটি  টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে

 

স্টাফ রিপোর্টার: এক এগারোর জরুরি অবস্থার সরকারের দুই বছরে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেয়া ৬১৫ কোটি ফেরতের হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের করা আপিল খারিজ করার মধ্য দিয়ে টাকা ফেরত প্রদানের এই রায় বহাল থাকলো। এখন বাংলাদেশ ব্যাংককে ওই অর্থ ব্যবসায়ীদের ফেরত দিতে হবে। তবে কত দিনের মধ্যে বা কিভাবে টাকা ফেরত দেয়া হবে সেটা পুর্নাঙ্গ রায়ে জানা যাবে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন (পুনর্বিবেচনা) করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। 

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চ শুনানি শেষে রায়ের জন্য এই দিন ধার্য করেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন- বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। 

আইনজীবীরা বলেছেন, এই রায় ঐতিহাসিক। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বেআইনিভাবে ও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে যেভাবে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়েছিল তা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেয়ায় ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।

আদালতে ব্যবসায়ীদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, আইনজীবী আবদুল মতিন খসরু, আইনজীবী আহসানুল করীম, ব্যারিস্টার খায়রুল আলম চৌধুরী। সরকার পক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম। 

ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম জানান, বাংলাদেশের জনগণ, আইন ও সংবিধান কখনও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়নি। এ রায় নিশ্চয় পুনর্বিবেচিত হবে। এতোগুলো টাকা সরকার কোথা থেকে ফেরত দেবে তা চিন্তার বিষয়। এখন সরকার যদি রিভিউয়ের সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে রিভিউ হবে। রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করবেন কি না জানতে চাইলে এ আইনজীবী বলেন, রিভিউয়ের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।

আইনজীবী আহসানুল করীম সাংবাদিকদের বলেন, এই রায় জনগণের জন্য রক্ষা কবচ হয়ে থাকবে। এতে প্রমাণ হলো বাংলাদেশের যে কোন সংস্থাই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তারা বিশেষ পরিস্থিতিতে বেআইনিভাবে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে না। তিনি বলেন যারা টাকা ফেরত চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন প্রথমে তারাই এই সুবিধা পাবেন। অন্যদের টাকা ফেরত পেতে আদালতে আবেদন করতে হবে। তারা কবে টাকা পাবেন, কিভাবে তাদের টাকা দেয়া হবে-তা পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে জানা যাবে।

হাইকোর্ট ১১টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেয়া ৬১৫ কোটি টাকা তিন মাসের মধ্যে ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্দেশ দিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে আপিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

হাইকোর্টের রায়ে এস আলম গ্রুপের সাতটি প্রতিষ্ঠানকে ৬০ কোটি টাকা, দি কনসোলিডেটেড টি এন্ড ল্যান্ডস কোম্পানি লিমিটেড এবং বারাউরা টি কোম্পানি লিমিটেডকে ২৩৭ কোটি ৬৫ লাখ, মেঘনা সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজকে ৫২ কোটি, বসুন্ধরা পেপার মিলস লিমিটেডকে ১৫ কোটি, ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেডকে ৯০ লাখ, ইউনিক সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজকে ৭০ লাখ, ইউনিক হোটেল এন্ড রিসোর্টকে ১৭ কোটি ৫৫ লাখ, বোরাক রিয়েল এস্টেট প্রাইভেট লিমিটেডকে ৭ কোটি ১০ লাখ, ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডকে ৩৫ কোটি এবং ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভলপমেন্টের এক পরিচালককে ১৮৯ কোটি ও ইউনিক ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের স্বত্বাধিকারীকে ৬৫ লাখ টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেন।

জানা যায়, ২০০৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০০৮ সালের নবেম্বর পর্যন্ত একটি গোয়েন্দা সংস্থা এবং তৎকালীন টাস্কফোর্স ইন্টেলিজেন্টস (টিএফআই) কর্মকর্তারা প্রায় ৪০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এক হাজার ২৩২ কোটি টাকা আদায় করেন। এ টাকা দুই শতাধিক পে-অর্ডারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের ‘০৯০০ নম্বর’ হিসাবে জমা হয়। 

তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ১৯ এপ্রিল জেমস ফিনলে কোম্পানির কাছ থেকে ১১৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা আদায় করে। ওই টাকা ১৬টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের ‘কনসোলিটেড ফান্ডে’ জমা দেয়া হয়। এর পর ২২ এপ্রিল একই প্রতিষ্ঠানের নামে আরো ১৫টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে ১২০ কোটি ২৪ লাখ টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হয়। একই প্রক্রিয়ায় পর্যায়ক্রমে দেড় বছর ধরে বিভিন্ন তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের সংশ্লিষ্ট হিসাবে টাকা জমা হয়েছে।

ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ছাড়াও ‘অজানা’ উল্লেখ করেও জরুরি অবস্থার সরকারের প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা ওই ব্যাংক হিসাবে চার দফায় প্রায় ৪৭ কোটি টাকা জমা দিয়েছেন।

দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের কাছ থেকে কয়েক দফায় বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় করা হয়েছে ওই সময়। ২০০৭ সালের ২৮ মে থেকে ২০০৮ সালের ১১ জুন পর্যন্ত বসুন্ধরা গ্রুপের কাছ থেকে ২৫৬ কোটি টাকা নেয়া হয়। 

২০০৭ সালের ১৯ জুন থেকে একই বছরের ২৭ নবেম্বর পর্যন্ত সিকদার গ্রুপের পরিচালক ও সদস্যদের পক্ষ থেকে পারভীন হক সিকদার বাধ্য হয়ে নয়টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে মোট ৪২ কোটি টাকা পরিশোধ করেন বলে অভিযোগ আছে।

ওই আমলে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুলের ৩০ কোটি, এমজিএইচ গ্রুপের ২৪ কোটি, বিএনপির সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামালের কাছ থেকে ২০ কোটি, কবির স্টিল মিলস লিমিটেডের সাত কোটি, ব্যবসায়ী নুর আলীর ৪০ কোটি ৫০ লাখ, আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের ৩২ কোটি ৫০ লাখ, সাগুফতা হাউজিংয়ের দুই কোটি ৫০ লাখ, হোসাফ গ্রুপ ১৫ কোটি, পারটেক্স গ্রুপের ১৫ কোটি, স্বদেশ প্রোপার্টিজের নয় কোটি, ইসলাম গ্রুপের ৩৫ কোটি, কনকর্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আট কোটি, ব্যবসায়ী রেজাউল করিমের ১৭ কোটি, আবু সুফিয়ানের ১৪ কোটি, শওকত আলী চৌধুরীর ছয় কোটি, আশিয়ান সিটির এক কোটি, পিংক সিটির ছয় কোটি ৪১ লাখ, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের ১৯ কোটি ৪৫ লাখ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের ১৫ কোটি, ওয়াকিল আহমেদের ১৬ কোটি, এবি ব্যাংক ফাউন্ডেশনের ৩২ কোটি, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের ২০ কোটি ৪১ লাখ, এলিট পেইন্টের ২৫ কোটি ৪৪ লাখ, এবি ব্যাংকের ১৯০ কোটি, কনকর্ড রিয়েল এস্টেটের সাত কোটি, জনৈক মালিকের কাছ থেকে চার কোটি ও ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টুর দুই কোটি ২০ লাখ টাকা নেয়া হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ