ঢাকা, শনিবার 18 March 2017, ০৪ চৈত্র ১৪২৩, ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মাদকের ভয়াবহ থাবা

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণির শিক্ষার্থী এখন মাদকাসক্ত। ইয়াবা, ফেন্সিডিল, গাঁজা এরা নিয়মিত সেবন করে। নারী শিক্ষার্থীদের একটি বিরাট অংশও মাদকসেবনে জড়িয়ে পড়ছে উদ্বেগজনকভাবে। সন্তানদের মাদকনির্ভরতার কারণে অভিভাবকদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার শেষ নেই। শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্তির বিষয়টি যখন ধরা পড়ে তখন প্রতিকারের জন্য কিছুই করবার থাকে না। মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনবার কোনও পথ খোলা থাকে না। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ড্রাগ টেস্টের ব্যবস্থা করলে মাদকে জড়ানো থেকে তাদের রক্ষা করা যেতে পারে বলে অভিভাবক, সমাজবিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মনে করেন। তারা জানান, বিশেষত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হয়ে পড়েছে। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। এ সময় ড্রাগ টেস্টের ব্যবস্থা না করলে এর ভয়াবহ আগ্রাসন থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এছাড়া মাদকাসক্তি সুস্থ সমাজ ও জাতি গঠনে একটি বড় অন্তরায়ও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ গত বৃহস্পতিবার এক রিপোর্টে উল্লেখ করে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মাদকের প্রচলন থাকলেও ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও গাঁজার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। বর্তমান সময়ের বিপজ্জনক মাদক ইয়াবা ব্যবহার করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি প্রাথমিক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে প্রায় ৯০ হাজারের মত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইয়াবা সেবন করে। এর দাম বেশি হওয়াতে অপেক্ষাকৃত ধনাঢ্য পরিবারের শিক্ষার্থীরা এর ব্যবহার বেশি করে থাকে। গবেষণার তথ্যানুসারে সারাদেশে শুধু ইয়াবাসেবী রয়েছে ২ লাখ। তার মধ্যে ৯০ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী, এর মধ্যে দশ হাজারই নারী শিক্ষার্থী। এদের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এদের মধ্যে ৭০ শতাংশ উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। সূত্র মতে, ২০১৪ সালে সারাদেশে ইয়াবাসেবী শিক্ষার্থী ছিল ৪০ হাজার। ২০১৫ সালে উচ্চহারে এ সংখ্যা বেড়ে হয় ৭৫ হাজার ৫০০। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৯০ হাজারে। আগের বছরের চেয়ে প্রায় বাড়তি ১৪ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী মরণনেশা ইয়াবায় আসক্ত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. জিনাত হুদা জানান, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্তের শহুরে ছেলেমেয়েরা পড়ে। এগুলোতে ভালো ক্যাম্পাস নেই, লাইব্রেরি নেই, কবুতরের খোপের মতো জায়গায় মুক্তমত চর্চার সুযোগ নেই। পারিবারিক পরিচয়ের কারণে সবকিছু অনায়াসে পেয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিচ্যুত হয়। জীবনবোধ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকবার ফলে তারা সবসময় বিচ্ছিন্নতায় ভোগে। জড়িয়ে পড়ে জঙ্গিবাদ কিংবা মরণনেশায়। মাদকদ্রব্য থেকে ফেরাতে হলে পারিবারিকভাবে সন্তানদের সময় দিতে হবে।
তদারকি বাড়াতে হবে। মনোযোগ ও সহমর্মিতা বাড়িয়ে সন্তানদের কাছে টানতে হবে। ওরা কোথায় যায়, কী করে, কী রকম আচরণ করছে- সব মনিটর করতে হবে। এক শ্রেণির নারী শিক্ষার্থীর মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা জন্মেছে যে, মাদক গ্রহণ করলে নাকি ‘স্লিম’ থাকা যায়। এ মিথ্যে ও আজগুবি ধারণা থেকেও তাদের ফেরাতে হবে। মাদকসেবীরা যাতে সরকারি চাকরিতে ঢুকতে না পারে সেদিকেও কড়া নজরদারি করতে হবে। ইয়াবা, ফেন্সিডিলের কারখানা এখন দেশেই স্থাপিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অভিযানে সম্প্রতি এসব কারখানা পাওয়া গেছে। এগুলো নির্মূল করতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে মাদক হচ্ছে সর্বনাশের মূল। এর ফলে সমাজ উচ্ছন্নে যায়। মানবশক্তি বিনষ্ট হয়। যুবসমাজ ধ্বংস হয়। সমগ্র জাতি হয় ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। এর আগ্রাসন থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে চাইলে যেকোনও মূল্যে মাদকের ঘাঁটি ধ্বংস করতে হবে। যারা মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কার্যকর পদক্ষেপ নিতেই হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ