ঢাকা, শনিবার 18 March 2017, ০৪ চৈত্র ১৪২৩, ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রাক্কালে

আশিকুল হামিদ : সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী মাস এপ্রিলের ৭ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন দিনের সফরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লী যাবেন। কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য এ ধরনের সফর স্বাভাবিক হলেও আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে কিছু বিশেষ কারণে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রথম কারণ তার পূর্ববর্তী সফর স্থগিত হয়ে যাওয়া। উল্লেখ্য, সফরের প্রথম তারিখ ছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু ‘অনিবার্য’ কারণে প্রধানমন্ত্রীর সে সফর স্থগিত করা হয়েছিল। পরে জানা গেছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদি নাকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য সময় দিতে পারেননি। দ্বিতীয় দিনেই তার নাকি কোনো এক রাজ্যে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল! এমন তথ্য কিন্তু বাংলাদেশের সচেতন মানুষ মাত্রকেই স্তম্ভিত করেছিল। কারণ, কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের সূচি নির্ধারিত হয় কয়েক মাস আগে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বেছে বেছে ঠিক ওই সময়ের দ্বিতীয় দিনটিতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী এমনভাবে কোনো এক রাজ্যে সফরে যাওয়ার সূচি তৈরি করেছিলেন, যেন বাংলাদেশও দেশটির একটি অঙ্গরাজ্য! অন্তরালের প্রকৃত কারণ যা কিছুই হয়ে থাকুক না কেন, সেই থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লী সফর কেবল পিছিয়েছে। এমনকি একথা পর্যন্ত বলা হয়েছে যে, অসম্মানিত শেখ হাসিনা নাকি ‘গোস্বা’ করেছেন! অতি সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য অবস্থায় পরিবর্তন ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। এর মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর এবং পররাষ্ট্র সচিবসহ বেশ কয়েকজন কর্তা ব্যক্তি ঢাকা সফর করে গেছেন। সফরসূচিও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
আলোচনার দ্বিতীয় বিশেষ কারণ হিসেবে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য। গত ১১ মার্চ যুব মহিলা লীগের সম্মেলনে দৃশ্যত কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই শেখ হাসিনা হঠাৎ বলে বসেছেন, ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নাকি আওয়ামী লীগকে হারিয়ে দেয়ার জন্য ‘একজোট’ হয়েছিল! প্রধানমন্ত্রী অবশ্য ভারত সরকারকে সরাসরি টেনে আনেননি। বলেছেন দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কথা। বাংলাদেশে ‘র’-এর প্রতিনিধি সে সময় নাকি ‘হাওয়া ভবনে’ পড়ে থাকতো! সেখানে যাতায়াত করতেন মার্কিন কূটনীতিকরাও। এই দুটি পক্ষের প্রভাব ও হস্তক্ষেপের কারণেই নাকি মোট ভোটের ৪১ দশমিক ৪০ শতাংশ পেয়ে ১৯৩টি আসনে জিতে ক্ষমতায় গিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। অন্যদিকে ৪০ দশমিক ০২ শতাংশ ভোট পেলেও মাত্র ৬৩টি আসন পাওয়ার কারণে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান যে মাত্র মাত্র এক দশমিক ৩৮ শতাংশ ছিল সে কথাটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি শুধু বিএনপি ও বেগম খালেদা জিয়ার কথা বলেছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রশ্ন ওঠে না, প্রধানমন্ত্রী এমনকি চার দলীয় জোটের কথাও বলেননি। অথচ ২০০১ সালের ওই নির্বাচনে জামায়াতসহ চার দলীয় জোটের কাছেই শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল আওয়ামী লীগের। প্রধান ফ্যাক্টর হলেও বিএনপিই একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী দল ছিল না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সে প্রসঙ্গের ধারে-কাছে যাননি।
কেন আওয়ামী লীগকে হারিয়ে দেয়ার এবং বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য ভারতের ‘র’ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘জোট’ বেঁধেছিলÑ সে প্রশ্নের উত্তর জানাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া নাকি মার্কিন কোম্পানির মাধ্যমে ভারতকে বাংলাদেশের তেল ও গ্যাস দেবেন বলে ‘মুচলেকা’ বা দাসখত দিয়েছিলেন! কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ক্ষমতায় থাকার পাঁচ বছরে কথিত ‘মুচলেকা’ অনুযায়ী খালেদা জিয়া ভারতকে সত্যিই তেল ও গ্যাস দিয়েছিলেন কি না- সে প্রসঙ্গে কিন্তু একটি শব্দও বলেননি প্রধানমন্ত্রী! তিনি জানাননি, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ বছরে মাত্র একবারই ভারতে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। ২০০৬ সালের মার্চের সে সফরটিও ছিল সার্কের চেয়ারপার্সন হিসেবে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রসঙ্গে বলা দরকার, বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হঠাৎ ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’কে ধরেও টানাটানি করেছেন তিনি। দেশের রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা হচ্ছে এজন্য যে, আগামী মাস এপ্রিলেই প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাাচ্ছেন। ঠিক এ সময়ই প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’কে ধরে টানাটানি করায় প্রশ্ন উঠেছে এজন্য যে, ‘র’ কোনো ব্যক্তি নয়, একটি সংস্থা। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, ‘র’-এর মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিজ নিজ দেশের স্বার্থে দায়িত্ব ও ভূমিকা পালন করে থাকে। সুতরাং ধরে নেয়া যায়, প্রধানমন্ত্রী ২০০১ সালের নির্বাচনের ব্যাপারে যে ‘র’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, এখনো সে ‘র’-এরই বাংলাদেশে তৎপর থাকার কথা। বাস্তবে রয়েছেও। কথাটা জানা থাকা সত্ত্বেও অমন একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে ধরেই টানাটানি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই আক্রমণাত্মক অবস্থানের মধ্যে নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত লক্ষ্য করেছেন। হতে পারে, ‘র’-এর দিক থেকে হয়তো পাল্টা হাওয়া বইয়ে দেয়ার তৎপরতা শুরু হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী যা পছন্দ করছেন না। দ্বিতীয় একটি সম্ভাবনার কথাও বলা হচ্ছে। ২৫ বছর কিংবা তার কম-বেশি মেয়াদের একটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠা ভারত সরকারকে প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত কঠিন কোনো ‘মেসেজ’ দিয়েছেন। কারণ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলই ভারতের সঙ্গে কোনো সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টাকে সমর্থন জানাচ্ছে না। এ বিষয়টিকেই প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত প্রাধান্যে আনতে চেয়েছেন। তিনি যদি সত্যি ‘মিন’ করে থাকেন এবং শেষ পর্যন্তও দেশপ্রেমিকের অবস্থান বজায় রাখেন তাহলে তার নামে ‘ধন্য. ধন্য’ রব পড়ে যাবে। অন্যদিকে সামরিক চুক্তির বিরোধিতার বিষয়টিকে তিনি যদি ভারতের সঙ্গে দরকষাকষির বিষয় বানাতে চান এবং তার মধ্যে যদি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার শর্ত যুক্ত করেন তাহলে শুধু দেশেরই সর্বনাশ ঘটবে না, এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিজের জন্যও অশুভ পরিণতির আশংকা তৈরি হবে। এখন দেখার বিষয়, ঠিক কোন উদ্দেশ্য থেকে তিনি ভারত সফরের প্রাক্কালে হঠাৎ ‘র’কে ধরে টানাটানি করেছেন। এটা তার কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল কি না।
কিন্তু সেদিকে যাওয়ার পরিবর্তে অন্য কিছু তথ্যের উল্লেখ করা দরকার। ২০১৪ সালের ৬ জুন মাত্র ৩৬ ঘণ্টার সফরে এসে পুরো বাংলাদেশকেই নৃত্যে মাতিয়ে গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদি। এর পেছনে অবদান বেশি ছিল অবশ্য আওয়ামী লীগ সরকারের, সেই সাথে অবশ্যই ভারতপন্থী মিডিয়ারও। মনে হচ্ছিল যেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ভারতপন্থী রাজনীতিক এবং সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিক থেকে শুরু করে সাংবাদিক নামধারী পর্যন্ত সকলেরই একমাত্র কাজ হয়ে উঠেছিল মোদি বন্দনা! শুধু তা-ই নয়, বেশ কয়েকদিন আগে থেকে এমন এক প্রচারণাকে সর্বাত্মক করা হয়েছিল যেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ‘চাহ্বিা মাত্র’ সবকিছু দিয়ে একেবারে ধন্য করে দেবেন বাংলাদেশকে! তিস্তা চুক্তি তো হবেই, আরো অনেক ‘চমক’ও দেখাবেন ভারতের এই নাটকীয় চরিত্রের প্রধানমন্ত্রী! অন্যদিকে মিস্টার মোদিও তার পূর্বসুরীদের দেখানো পথেই হেঁটেছেন। কেবলই নিয়ে গেছেন তিনি, প্রকৃতপক্ষে কিছুই দেননি বাংলাদেশকে। ফলে বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি ‘হনুজ দূর ওয়াস্ত’ই রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে যথারীতি আবারও খেল দেখিয়েছিলেন পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ঢাকায় এসেছেন এবং ছোট্ট খুকুমনির মতো আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বুকে মাথা ঠেকিয়ে আদর নিয়েছেন। কিন্তু তিস্তার প্রশ্নে ‘এক চুল’ পরিমাণও সরে যাননি। তিনি বরং বুঝিয়ে গেছেন, জাতীয় স্বার্থে ভারতীয়রা সবাই সমান!
মমতার এই খেল বা ‘পলিট্রিক্স’ নিয়ে আগেও লিখেছি বলে আজকের নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্যের দিকে পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করা দরকার। বাংলাদেশে আসার প্রাক্কালে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা পাওয়া এই মন্তব্যে মিস্টার মোদি বলেছিলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকা স্থলসীমান্ত চুক্তির নিষ্পত্তি যে আসলে কত বড় অর্জন তা নাকি ভারতের গণমাধ্যমগুলো অনুধাবন করতে পারেনি। এটা বিশ্বের অন্য কোথাও হলে একে ‘বার্লিন প্রাচীর’-এর পতনের সঙ্গে তুলনা করা হতো, ‘বার্লিন প্রাচীর’-এর মতো বড় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। প্রধানমন্ত্রী মোদির এই মন্তব্য কিন্তু নিতান্ত কথার কথা নয়, এর অন্তরালে রয়েছে গুরুতর উদ্দেশ্য। দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকা স্থলসীমান্ত চুক্তি বলতে তিনি ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর স্বাক্ষরিত ‘মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি’র কথা উল্লেখ করেছেন, যে চুক্তিটি দীর্ঘ ৪১ বছর পর মিস্টার মোদি ঢাকা সফরে আসার কয়েকদিন আগে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় অনুমোদন পেয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বেরুবাড়ি ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল মুজিব সরকার। এজন্য সংবিধানের তৃতীয় সংশোধনী পাস করতে হয়েছিল। কিন্তু ভারতকে বেরুবাড়ি তুলে দিলেও বিনিময়ে তিনবিঘা করিডোরসহ বাংলাদেশের ছিটমহলগুলো আদায় এবং সীমান্ত চিহ্নিত করতে পারেনি সেকালের আওয়ামী লীগ সরকার। শুধু তা-ই নয়, ওই চুক্তি অনুযায়ী ভারত একই সঙ্গে পেয়েছিল ফারাক্কা বাঁধ চালু করার সম্মতি।
প্রশ্ন উঠেছে, ৪১ বছর আগে তারই পূর্বসুরী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যে চুক্তিটি স্বাক্ষর করে গেছেন এবং যে চুক্তির বাস্তবায়ন করা ভারতের সকল সরকারের কর্তব্য ছিল, এতদিন পর সে চুক্তির অনুমোদনকে মিস্টার মোদি কেন ‘বার্লিন প্রাচীর’-এর পতনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন? এর তাৎপর্য সম্পর্কে বলার পরিবর্তে জানানো দরকার, ১৯৪৭ সালে আজকের বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ হিসেবে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। মিস্টার মোদি সম্ভবত ইতিহাসের এই অংশটুকুই স্মরণ করেছেন এবং বাংলাদেশকে পূর্ব জার্মানীর পথ অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে ইতিহাস কিন্তু মিস্টার মোদির ব্যাখ্যাকে অসম্পূর্ণ এবং ভুল হিসেবেই চিহ্নিত করবে। কারণ, একথা সত্য, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ভারতের বঙ্গ নামক কোলকাতাকেন্দ্রিক প্রদেশের অংশ ছিল। পরিচিতি ছিল পূর্ব বঙ্গ নামে। কিন্তু ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে মুসলিম প্রধান এ অঞ্চলের সঙ্গে মূল ভারতের দ্বন্দ্ব ক্রমাগত বাড়তে থাকে। দু’চারজন ছাড়া জমিদারদের প্রায় সবাই ছিল হিন্দু। মুসলমান কৃষকদের ওপর হিন্দু জমিদাররা যথেচ্ছ শোষণ-নির্যাতন চালাতো। মুসলমানরা এমনকি জমিদার বাড়ির আশপাশ দিয়ে জুতো পরে বা ছাতা মাথায় দিয়েও যাতায়াত করতে পারতেন না। ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরি ছিল হিন্দুদের দখলে। শিক্ষাতেও হিন্দুরাই একচেটিয়াভাবে এগিয়ে ছিল। সব মিলিয়েই মুসলমানরা ছিলেন নির্যাতিত, উপেক্ষিত ও পশ্চাদপদ অবস্থায়।
হিন্দুদের প্রাধান্য বহাল রেখে মুসলমানদের পক্ষে যেহেতু উন্নতি-অগ্রগতি অর্জন করা একেবারেই সম্ভব ছিল না, সেহেতু মুসলিম প্রধান পূর্ব বঙ্গ ও প্রতিবেশী রাজ্য আসামকে নিয়ে পৃথক একটি প্রদেশ গঠনের দাবিতে মুসলমানরা আন্দোলন গড়ে তোলেন। আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার ১৯০৫ সালে পূর্ব বঙ্গ ও আসামকে নিয়ে নতুন একটি প্রদেশ গঠন করে। ঢাকাকে এর রাজধানী করা হয়। এটাই ইতিহাসে ‘বঙ্গভঙ্গ’ নামে পরিচিতি। এর ফলে ঢাকাসহ বর্তমান বাংলাদেশের দ্রুত উন্নতি হতে থাকে। কিন্তু মুসলমানদের এই উন্নতি ও সম্ভাবনার বিরুদ্ধে হিন্দুরা পাল্টা তৎপরতা শুরু করে। কারণ, হিন্দুদের দৃষ্টিতে এটা ছিল তাদের ‘বঙ্গমাতা’কে দ্বিখ-িত করার পদক্ষেপ। কোলকাতায় বসবাস করে পূর্ব বঙ্গের ওপর যারা শোষণ-নির্যাতন চালাতো এবং এখানকার অর্থবিত্ত লুণ্ঠন করে নিয়ে গিয়ে সেখানে বসে যারা নাচ-গান ও আনন্দ-ফূর্তি করতো, সেই হিন্দু জমিদারদের প্রত্যক্ষ সাহায্যে ও উস্কানিতে সন্ত্রাসবাদী কর্মকা- দুর্বার হয়ে ওঠে। হিন্দুরা একে সন্ত্রাসবাদী ‘আন্দোলন’ নাম দেয়। এই সন্ত্রাসবাদী কর্মকা-ে ভীত হওয়ার অভিনয় করে মুসলিম বিরোধী ব্রিটিশ সরকারও হিন্দুদের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়, ঢাকাসহ পূর্ব বঙ্গ আবারো কোলকাতার এবং হিন্দুদের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। হিন্দুদের মধ্যে যে ‘বঙ্গমাতা’র জন্য প্রীতির লেশমাত্র ছিল না এবং মুসলিম বিদ্বেষই যে বিরোধিতার প্রধান কারণ ছিল তার প্রমাণ পাওয়া গেছে একটি বিশেষ ঘটনায়। সন্ত্রাসের অভিযোগে শত বছরের রাজধানী কোলকাতাকে পরিত্যাগ করে ব্রিটিশ সরকার এ সময় দিল্লীকে ভারতের রাজধানী বানিয়েছিল। কিন্তু হিন্দুরা কোনো প্রতিবাদই করেনি। অন্যদিকে মুসলমানদের হিন্দু ও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চলতে থাকে। পর্যায়ক্রমে সেটাই মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমির আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ছিল সে আন্দোলনেরই সফল পরিণতি।
এভাবে ইতিহাসের পর্যালোচনায় দেখা যাবে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যাখ্যা ও হিসাবে মারাত্মক ভুল রয়েছে। বাংলাদেশকে কোনোদিক থেকেই পূর্ব জার্মানীর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। কারণ, পূর্ব জার্মানীর ব্যাপারটা ছিল সম্পূর্ণ চাপিয়ে দেয়া। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশ সব দিক থেকে নিজের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষা অনুযায়ী এগিয়েছিল। অন্যের পদানত থাকতে রাজি নয় বলেই ১৯৭১ সালেও বাংলাদেশীরা সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র বানিয়েছে। সুতরাং কেউ যদি মনে করে থাকেন, বাংলাদেশ পূর্ব জার্মানীর পথ ধরবে এবং পশ্চিম বঙ্গ তথা ভারতের সঙ্গে আবারও মিলিত হবে তাহলে সেটা হবে গর্দভের স্বর্গযাত্রার মতো ফালতু কল্পনাবিলাস। সে বিলাস যে কেউ করতেই পারেন। কিন্তু যুগে যুগে প্রমাণিত সত্য হলো, বাংলাদেশ কারো অধীনস্থ থাকে না। তেমন যে কোনো প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়ার যোগ্যতা, সাহস ও ক্ষমতাও বাংলাদেশীদের রয়েছে। এখানে অন্য কিছু কথাও বলা দরকার। মিস্টার মোদি শুধু ‘বার্লিন প্রাচীর’-এর কথাই বলেছেন। অন্যদিকে প্রকৃত ইতিহাস হলো, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে এশিয়া ও ইউরোপে আরো অনেক পরিবর্তনও ঘটেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে রাশিয়া নিজেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নামের বিশাল এক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। আশপাশের বহু স্বাধীন দেশকে রাশিয়া দখল করে নিয়েছিল। জার্মানিতে যখন ‘বার্লিন প্রাচীর’ ভেঙে ফেলার আন্দোলন তুঙ্গে ঠিক একই সময় ওই দেশগুলোও স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সংগ্রামকে চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করেছিল। মিখাইল গরবাচভের নেতৃত্বাধীন রাশিয়ার সরকারকে একের পর এক শুধু পরাজয়ই স্বীকার করতে হয়েছিল। এর ফলে ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, অ্যাস্টোনিয়া, আজারবাইজান ও লাটভিয়াসহ ডজনের বেশি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছিল। রাষ্ট্রগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে এসেছিল। এসব তথ্য বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাবনায় থাকা দরকার ছিল। কারণ, আসাম, ত্রিপুরা, মনিপুর, মেঘালয় ও নাগাল্যান্ডসহ ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত ভারতের রাজ্যগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম চলছে। কে জানে, এসব রাজ্যও কখনো ইউক্রেন ও উজবেকিস্তানের মতো ভারতের ‘ইউনিয়ন’ থেকে বেরিয়ে আসবে কি না এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে কি না। অমন কোনো সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করার পরিবর্তে এখানে শুধু এটুকু বলে রাখাই যথেষ্ট যে, ‘বার্লিন প্রাচীর’-এর উদাহরণ দিতে গিয়ে মিস্টার মোদি সম্ভাবনার একটি দিককেই প্রাধান্যে এনেছেন। বাস্তবে সম্ভাবনা কিন্তু অন্যরকমও রয়েছে!
এবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সেই বাংলাদেশ সফরের দু’একটি প্রসঙ্গ। খুবই উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এত আলোড়নসৃষ্টিকারী সফরেও মিস্টার মোদি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে একাই এসেছিলেন। ৮১ জন সফরসঙ্গীর মধ্যে একজনও মন্ত্রী বা রাজনীতিক ছিলেন না। ছিলেন শুধু আমলা এবং ব্যবসায়ীরা। অনেক শিল্পী-সাংবাদিকও ছিলেন কিন্তু আগে থেকে ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও তার সঙ্গে আসেননি আসাম, ত্রিপুরা, মনিপুর, মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রীরা। এসেছিলেন শুধু পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাও মোদির সঙ্গে নয়। একদিন আগে এসেছিলেন তিনি। মমতা থেকেছেনও আলাদা হোটেলে। এর মধ্য দিয়ে একটি কথাই মমতা পরিষ্কার করেছিলেন। সে কথাটা ছিল, আর যা-ই হোক, তিস্তা চুক্তি অন্তত স্বাক্ষরিত হচ্ছে না। বাস্তবেও হয়নি। স্মরণ করা দরকার, একই মমতার কারণে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরেও একেবারে ‘হবেই’ পর্যায়ে এসে যাওয়ার পরও তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারেনি। সেবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর সঙ্গে ঢাকায় আসতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন মমতা। মাঝখানে একবার ঢাকা সফরে এসে তার ওপর ‘আস্থা’ রাখার আহ্বান জানিয়ে গেছেন মমতা। শুধু তা-ই নয়, ভারতীয় পত্রপত্রিকার খবরে বলা হয়েছিল, ঢাকা থেকে ‘হাসিনাদি’র ফোন পেয়ে শ্রীমতি মমতা নাকি এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন যে, তার মনে হচ্ছিল, ‘দুই বাংলা যেন এক হয়ে গেছে’! তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন, বাংলাদেশ ‘ওপার বাংলা’ পশ্চিম বঙ্গের মতো ভারতের একটি রাজ্য মাত্র নয় বরং সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র! বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময়ে আলোচনা করার ইচ্ছা রইল। এখানে সংক্ষেপে বলা দরকার, মোদির এই সফরকালেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভারতীয়দের বাংলাদেশ নীতিই প্রধান্যে এসেছিল। কারণ, তিস্তা বেশি আলোচিত হলেও ভারত পানি আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে বহু বছর ধরে। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে টেলিভিশন ও সিনেমাসহ সকল ব্যাপারেই বাংলাদেশ ভারতীয়দের চাণক্য কৌশলের অসহায় শিকারে পরিণত হয়েছে। এই কৌশলের কারণেই আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের স্বার্থে যা কিছু করছে ও করেছে সেগুলোর কোনোটিতেই বাংলাদেশের ক্ষতি ছাড়া লাভ হয়নি। হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। কথা আরো আছে। একদিকে মিস্টার মোদি শুনিয়ে রেখেছেন ‘বার্লিন প্রচীর’-এর কথা, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে হয়েছে দুই বাংলা যেন ‘এক’ হয়ে গেছে!
এমন এক অবস্থার মধ্যেই তিস্তার মতো গ্ররুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে কিছু চূড়ান্ত না করেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে যাচ্ছেন। মাঝখানে আবার সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের কথাও উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে তথাকথিত ‘ইন্ডিয়া ফোবিয়া’র বিরোধিতা করা হলেও প্রধানমন্ত্রী ঠিক কোন বিষয়ে কতটা অর্জন করতে পারবেন  সে সম্ভাবনার ব্যাপারে পাঠকরাও চিন্তা করে দেখতে পারেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ