ঢাকা, মঙ্গলবার 21 March 2017, ০৭ চৈত্র ১৪২৩, ২১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঝালকাঠির ৫ নদীর মোহনায় ধানসিঁড়ি ইকোপার্ক প্রকল্প ১৬ বছর ধরে ঝুলন্ত

মোঃ আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি : ঝালকাঠির গাবখান-ধানসিঁড়ি-সুগন্ধা-বিষখালী ও বাসন্ডা নদীর মোহনায় জেগে ওঠা বিশাল চরে প্রস্তাবিত ধানসিঁড়ি ন্যাশনাল ইকোপার্ক প্রকল্পটি দীর্ঘ ১৬ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। ভূমি এবং বন মন্ত্রণালয়ের রশি টানাটানি আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যাওয়া প্রকল্পটি আদৌ আলোর মুখ দেখবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ভূমিগ্রাসী চক্র প্রকল্পভূক্ত বিপুল পরিমাণ জমি আত্মসাতের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন অরক্ষিত পড়ে থাকায় স্থানটি পরিণত হয়েছে মাদকসেবী আর অসামাজিক কার্যকলাপের অভয়ারণ্যে। স্থানীয় ও জেলা প্রশাসন বিষয়টি জানলেও প্রতিরোধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঝালকাঠি শহরের অদূরে  বাংলাদেশ ৫ম চীন মৈত্রী সেতু সংলগ্ন ৫ নদীর মোহনা সংলগ্ন এলাকায় জেগে ওঠা চরের প্রায় ৫০ একর খাস জমিতে ২০০২ সালে ধানসিঁড়ি ইকোপার্ক স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়। জমির মালিকানা নিয়ে ভূমি এবং বন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। ভূমি মন্ত্রণালয় জমির মূল্য ১৮কোটি টাকা নির্ধারণ করে মালিকানা বিহীন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বন মন্ত্রণালয়কে অনুমতি দেয়। ইতোমধ্যে গাবখান নদীর ড্রেজিং এর বালু দিয়ে প্রকল্প এলাকা ভরাট করা হয়। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রকল্পের জন্য ৪কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও একটি ভূমিগ্রাসী চক্রের প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩৫ একর জমির মালিকানা দাবী করে দায়েরকৃত মামলায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহার না করায় ফেরত যায়।
জেলায় কোন বিনোদন স্পট না থাকায় অবসর বিনোদনের জন্য ঝালকাঠিবাসির দীর্ঘদিনের দাবী ছিল এই খাস জমিতে ইকোপার্ক নির্মাণের। তাই বাংলাদেশ -৫ম চীন মৈত্রী সেতুর (গাবখান সেতু) সংলগ্ন সুগন্ধা-বিষখালী-গাবখান-ধানসিঁিড়-বাসন্ডা নদীর মোহনায় ৫০ একর জমিতে ইকোপার্ক নির্মাণের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল জেলাবাসীকে। পৌনে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ইকোপার্ক নির্মাণের একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল।  নাম দেয়া হয়েছিল “ধানসিঁড়ি ন্যাশনাল ইকোপার্ক”। বিগত ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে একনেক সভায় প্রকল্পটি জাতীয় পার্ক হিসেবে অনুমোদন হয়েছিল। জেলা প্রশাসন ও বনবিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানাগেছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে ৫নদী ও বাংলার সুয়েজ খাল খ্যাত দেশের সর্বোচ্চ গাবখান সেতুর সঙ্গে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের মহামিলনের একটি ক্ষেত্র তৈরী ও আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠত। পার্কটি হলে পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে এটি হতো দক্ষিণাঞ্চলের আয় বর্ধক ও মনোরম পরিবেশে অবসর বিনোদনের অন্যতম স্পট। পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নেও এটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখত। এ লক্ষে “ধানসিঁড়ি ফাউন্ডেশন” নামে একটি ট্রাস্টও গঠন করা হয়েছিল। যা বেঙ্গল ট্রাস্ট আইন ১৮৯২ এর আওতায় রেজিস্ট্রেশন করা হয়।
সূত্র মতে প্রস্তাবিত এ পার্কে থাকবে লাক্সারী থ্রি-স্টার রেস্ট হাউজ, নদী ও লেক ঘুরে দেখার জন্য থাকবে একটি উন্নতমানের প্যাডেল বোর্ড, গাড়ী পার্কিংয়ের স্থান, তথ্য বোর্ড, পাথর ও সিরামিক দিয়ে তৈরী করা বিভিন্ন পশু পাখি, সৌন্দর্যবর্ধক বাগান, পাকা ছাতা, নদীর গাইডওয়াল, বাঁধানো ঘাটলা, দুর্লভ বৃক্ষ, দর্শনার্থীদের বসার বেঞ্চ ও অভ্যন্তরীণ ছোট ছোট সড়ক ইত্যাদি। 
এবিষয়ে ধানসিঁড়ি ইকোপার্ক প্রকল্পের উদ্যোক্তা, ঝালকাঠির তৎকালিন জেলা প্রশাসক, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব এবং পল্লি সঞ্চয় ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মিহির কান্তি মজুমদার জানান, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক ধানসিঁড়ি নদী সংলগ্ন ৫নদীর মোহনায় ধানসিঁড়ি ইকোপার্ক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশ বিদেশের পর্যটকরা এখানে ছুটে আসবেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে স্থানীয় কিছু অসৎ লোক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে বাঁধা। তারা একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে বিষয়টি আটকে দিচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, আমি বিষয়টি নিয়ে হিউম্যান রাইট্স এন্ড পিস ফর বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনজিল মোর্শেদ সাহেবের সংগে কথা বলেছি। তিনি কাগজপত্র পেলে এনিয়ে আইনি লড়াইয়ে নামতে রাজি আছেন।
মিহির কান্তি মজুমদার আরো বলেন, অ্যাডভোকেট মোর্শেদ সাহেব ঝালকাঠির লোক, সুতরাং এই বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই তার আগ্রহ রয়েছে।
প্রসংগত, মিহির কান্তি মজুমদার ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক থাকাকালে এ প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিলেন। তবে বন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে ঐ সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দকৃত ৪ কোটি টাকা অব্যবহৃত অবস্থায় ফেরত গেছে। অথচ বরগুনা এবং পিরোজপুরে বন বিভাগ একই ধরণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। সেখানে কোন সমস্যা হয়নি। অথচ ঝালকাঠিতে ভূমি মন্ত্রণালয় ঐ জমির জন্য ১৮ কোটি টাকা দাবি করেছে।
২০০৬-’০৭ থেকে ২০১০-’১১ অর্থবছরে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ঐ চরের বেশ কিছু জায়গায় বনায়ন বা কোন অবকাঠামো নির্মাণের উপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বাদী হয়ে ঝালকাঠির যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতে দেওয়ানী মামলা দায়ের করে। এতে সরকার পক্ষে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক গং এর বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের ৬ জুন অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আদালত। 
তবে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সুত্র জানায়, ৫ নদীর মোহনায় জেগে ওঠা এ চরে জনস্বার্থে ধানসিঁড়ি ইকোপার্ক বাস্তবায়নের অনুমতি প্রদানের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছিল। এতে মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়।
এর প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন ২০১০ সনের ১২ আগষ্ট ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয় আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা অবস্থায় এখানে কোন বনায়ন বা অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তবে যে জমিতে আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে সেটি ছাড়া বাকি জমিতে দখল বজায় রাখার জন্য স্বল্প মেয়াদি বন সৃজন করা যায় এবং সকল মামলা নিস্পত্তি হলে সেখানে প্রস্তাবিত ইকোপার্ক নির্মাণ করা সম্ভব হবে।
সর্বোপরি ঝালকাঠিসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, কবি কামিনী রায়, জারী সম্রাট আঃ গণি বয়াতির জন্মস্থান, কবি জীবনানন্দ দাসের স্মৃতি বিজড়িত ধানসিঁড়ি নদীসহ ৫ টি নদীর মোহনায় ৫ম চীন মৈত্রী সেতু সংলগ্ন ৫০ একর আয়তনের বিশাল এ চর ভূমিতে সকল বাধা উপেক্ষা করে জাতীয় এ পার্কটি স্থাপিত হোক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ