ঢাকা, বুধবার 22 March 2017, ০৮ চৈত্র ১৪২৩, ২২ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মানবাধিকার প্রসঙ্গ : একটি অন্তরঙ্গ দৃষ্টিপাত

জিয়া হাবীব আহ্সান : বর্তমান বিশ্বে ‘মানবাধিকার’ ধারণাটি সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। চীন থেকে পেরু, আইসল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়া তথা দেশ হতে দেশ পেরিয়ে সারা বিশ্বে মানবাধিকারের স্লোগান সরবে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে ভক্ষকরাই এর রক্ষক হওয়ার এবং পথভ্রষ্টরা পথ প্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার ভান করছে। মানবাধিকার আইনের ইতিহাস সুদীর্ঘ হলেও বিশ্বে মানবাধিকার এখনও তার সঠিক স্থান লাভ করতে পারেনি। কারণ মানবজাতি শতাব্দীকাল হতে ‘মানবাধিকার’ শব্দটির সুযোগ নিয়ে এর অপব্যবহার করেছে। প্রকৃতপক্ষে সারা বিশ্বে মানবাধিকারের ডংকা বাজানোর এক তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এই ডংকা বাজানোর ক্ষেত্রে জাতিসংঘ এবং এর সর্ব্বোচ্চ শক্তিশালী অঙ্গ ‘নিরাপত্তা পরিষদ’কেও নিজেদের সুবিধামত ব্যবহার করা হচ্ছে। মানবাধিকারের ছদ্মবেশ যেন শতাব্দীর উৎকৃষ্ট ছদ্মবেশে পরিণত হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানবাধিকারের ধারণা: ইসলামের দৃষ্টিতে মানবাধিকারের ধারণাটি আল্লাহ্ প্রদত্ত। পশ্চিমা ও সমসাময়িক মানবাধিকার ধারণার মত ইসলামে মানবাধিকার কোন মানব-চিন্তাপ্রসূত কনসেপ্ট নয়। মানুষের জন্মলগ্ন থেকে সঠিক ও বাধ্যবাধকতা সম্বলিত নির্দেশাবলী মানবজাতির নিকট প্রেরিত হয়েছে। এ কারণে পৃথিবীতে আল্লাহ্র প্রতিনিধি হিসেবে প্রথম মানব প্রেরণের ঘটনা ছিল একটি ঐশ্বরিক পরিকল্পনা। আর এই পরিকল্পনা, সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থ আল কুরআন প্রেরণের মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করে। ইসলামে মানবাধিকারের মূল উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ্। কুরআন মুসলিম উম্মাহর সংবিধান যা মানবাধিকারকে সুনিশ্চিত করে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং যোগ্যতা ও সুযোগের অসমতার কারণে মানুষের মধ্যে কেউ শাসিত, কেউ ধনী, কেউ গরীব হতে পারে কিন্তু মানুষ হিসেবে তার মৌলিক অধিকারগুলো পাওয়া এবং সকল ব্যাপারে সুবিচার লাভ করা তার অলংঘনীয় অধিকার। আর ইসলামী ব্যবস্থাতেই মানুষের এই অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। ইসলামী আইনে মানবাধিকার স¤পর্কিত আইনসমূহ রাষ্ট্র ও নাগরিক অধিকার আইন, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক আইন, দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইনসহ সকল আইনই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শাসন কার্যক্রমের একটা মূল বিষয় হলো অধিকার। যেমন- নাগরিকদের উপর রাষ্ট্রের অধিকার, রাষ্ট্রের উপর নাগরিকদের অধিকার। রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্মের লোক থাকে, বিদ্রোহীও থাকতে পারে। রাষ্ট্রের উপর তাদের কি অধিকার থাকবে এবং তাদের উপর রাষ্ট্রের কি অধিকার থাকবে, এসবও শাসন কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাছাড়া দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ ও শান্তিকালীন পারস্পরিক কি অধিকার থাকবে তাও রাষ্ট্রের শাসননীতির একটা অংশ। এসব অধিকারের ভিত্তিতেই একটি রাষ্ট্র তার আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন করে থাকে। কিন্তু ইসলামের এই অধিকারসমূহ ও আইনের উৎস শাসক বা সরকার নয়। আল্লাহ্র ওহী আল-কোরআন এবং মহানবী (সাঃ)-এর সুন্নাহ্ হলো এসব অধিকার নির্ধারণ ও আইনগত মূলনীতির উৎস।
ইসলামে মানবাধিকারের শ্রেণীবিন্যাস: ইসলামের বিধান মতে মানবজাতির উপর যে দায়িত্বগুলো অর্পিত হয়েছে সেগুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: স্রষ্টার অধিকার বা হাক্কুল্লাহ এবং মানুষের অধিকার বা হাক্কুল ইবাদ। আল্লাহ্র অধিকারকে জনগণের অধিকাররূপে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। কারণ কুরআন ও রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ মোতাবেক কর্তব্য পালন মানেই সমাজের কল্যাণ সাধন। উভয় প্রকার অধিকার তথা স্রষ্টার অধিকার ও তাঁর সৃষ্টির অধিকার আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত হয়েছে এবং এ দুই ধরনের অধিকারের জন্য মানুষকে আল্লাহ্র নিকট জবাবদিহি করতে হবে। আবার হাক্কুল ইবাদ-এর অন্তর্ভুক্ত মানবাধিকার দুই ধরনের হতে পারে। প্রথম শ্রেণীতে সেসব অধিকার অন্তর্ভুক্ত যেগুলো পালনে ইসলামী রাষ্ট্র সরাসরি বাধ্য করবে এবং দ্বিতীয় শ্রেণীতে সেসব অধিকার অন্তর্ভুক্ত যেগুলো পালনে রাষ্ট্র সরাসরি বাধ্য করবে না। প্রথম শ্রেণীর অধিকারসমূহকে আইনগত অধিকার এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর অধিকারকে নৈতিক অধিকার রূপে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। দুই-এর মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। কারণ তাদের উৎপত্তি, প্রকৃতি ও জবাবদিহিতা আল্লাহ্র সাথে সম্পৃক্ত। তাদের মধ্যে একটি মাত্র পার্থক্য হচ্ছে যে, একটির জন্যও ইসলামী রাষ্ট্রের নিকটে জবাবদিহি করতে হবে।
মানবাধিকার ধারণা স¤পর্কে পশ্চিমাদের দাবি: পশ্চিমারা এটা দাবী করে যে, মানবাধিকারের ধারণাটি বিশ্ববাসীর নিকট তারাই প্রথম উপস্থাপন করেছে। বস্তুত: পশ্চিমাদের এটা একটি সহজাত প্রবৃত্তি যে, পৃথিবীতে সকল প্রকার উন্নয়নের একমাত্র দাবী তারাই করবে। ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ১৭৮৯ সালের ফ্রান্স কর্তৃক মানব ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণাকে বর্তমান মানবাধিকারের মূলনীতি হিসেবে গণ্য করা হলেও আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে ইসলাম মানবাধিকারের পূর্ণাঙ্গ বৈশিষ্ট্যাবলী ঘোষণা করেছে। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপ ও সমগ্র পশ্চিমা বিশ্ব ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। তখন তাদের নিকট মৌলিক অধিকারের ধারণা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার তথা একটি মানস¤পন্ন জীবন বিধান ও সর্বোপরি আইনগত সমধিকারের ধারণা ছিল স¤পূর্ণ অজ্ঞাত। কিন্তু এর হাজার বছর আগে মানবতার নবী রাসূল মুহম্মদ (সাঃ) এর নেতৃত্বে আরবের মরুপ্রান্তরে প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থায়, ঐ সকল অধিকারসমূহ মানুষ স¤পূর্ণরূপে ভোগ করে আসছিল।
জাতিসংঘ বহু পরে ১৯৪৮ সালে সার্বজনীন মানবাধিকার নীতি ঘোষণা করে যা ৬১০ সালেই মহানবী (সাঃ) কর্তৃক জাতি, বর্ণ, ধর্ম, গোত্র, নির্বিশেষে সবার জন্য সমান প্রযোজ্য বলে ঘোষিত হয়েছিল। বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি জাতিসংঘ তার একটি সম্মেলনে যুদ্ধবন্দীদের অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করে যা প্রায় ১৪০০ বছর পূর্বে ৬২৪ সালে রাসূল (সাঃ) বদরের যুদ্ধের যুদ্ধবন্দীদের প্রদান করে গেছেন। সপ্তদশ শতাব্দীতে যখন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি লাখ লাখ মানবসন্তানকে আফ্রিকা মহাদেশে শৃঙ্খলিত দাসে পরিণত করছিল এবং খোলাবাজারে পশুর ন্যায় বেচাকেনা করছিল তখন থেকে সহস্র বছর পূর্বে ইসলাম দাসপ্রথার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটিয়ে সমাজে তাদের পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা ও অধিকার সুনিশ্চিত করেছে। অধিকন্তু ইসলামে মানবাধিকারের স্বীকৃতি কোন বানোয়াট বা পোশাকী বিষয় ছিল না। বস্তুত: এটা ইসলামী সংবিধানের এবং ইসলামী সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্বরূপ।
পশ্চিমারা যেখানে মানবাধিকার নীতি বাস্তবায়নে দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করে, সেখানে ইসলামে মানবাধিকার আল কুরআন দ্বারা স্বতঃসিদ্ধ বা সুনিশ্চিত। এর প্রয়োগ জাতি ও ব্যক্তি উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ পটভূমির আলোকে ইসলাম মানবজাতির জন্য যে মানবাধিকারসমূহ সুনিশ্চিত করেছে তা একটু পর্যালোচনা করা যাক। বিশ্ব মানবাধিকার আন্দোলনের সূচনা জাতিসংঘ সনদ (UN Charter) ইংল্যান্ডের ম্যাগনাকার্টা (Magna Carta) কিংবা বিল অব রাইটস (Bill of Rights) এর মাধ্যমে হয়েছে-এ ধারণা সঠিক নয়। দুনিয়ার কোন অঞ্চলে যখন মৌলিক অধিকার স¤পর্কে মানুষের সচেতনতা একেবারে অংকুরে, ঠিক তখন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতিষ্ঠিত মদীনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার পূর্ণভাবে ভোগ করে ধন্য হয়েছিলো মানুষজন। আধুনিক মানবাধিকার পূর্ণাঙ্গরূপ লাভ করা শুরু করে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ (United Nation) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। কিন্তু এর তেরশত বৎসর পূর্বে অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দীতে মহাবিশ্বের মহানবী হযরত মুহম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম মানবাধিকারের সুস্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করেন।
Louis Henkin তাঁর সম্পাদিত The International Bill of Rights বইয়ের ভূমিকাতে উল্লেখ করেছেন, “Human Rights is the idea of our time’’. মানবাধিকার সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বের সকল আইনবিদদের ধারণা একই রকম। কিন্তু তাঁদের এই ধারণা সঠিক নয়। পূর্বেই আলোচনা করেছি প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকার ধারণাটি বর্তমান যুগের নয়। প্রায় চৌদ্দশত বৎসরেরও আগে পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর মাধ্যমে ইসলামী আইনে মানবাধিকারকে বিধিবদ্ধ করা হয়। ইসলামী আইন সংযোজিত মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারের নীতিসমূহই বর্তমান কালের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন তাঁর এক ইসলামী গ্রন্থে মানবাধিকারের মৌলিক অধিকারের ইতিহাস টানতে গিয়ে লিখেছেন, পাশ্চাত্যের পন্ডিতগণ মৌলিক মানবাধিকারের ধারণার বিবর্তনশীল ইতিহাসের সূচনা করেন খৃস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের গ্রীস থেকে। অতঃপর খৃস্টীয় পঞ্চম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তার সূত্র যোগ করে এক লাফে খৃস্টীয় একাদশ শতকে প্রবেশ করেন। খৃস্টীয় ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শতক পর্যন্তকার পাঁচশ’ বছরের দীর্ঘকাল তাদের রচিত ইতিহাসের পাতা থেকে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য। তা শেষ পর্যন্ত কেন এমন হল? সম্ভবত এজন্য যে, তা ছিল ইসলামের যুগ।
উদাহরণ স্বরূপ বলতে হয়, ১৮৩৫ সালে মার্কিন মেয়েরা তাদের জন্য প্রথম স্কুলে যাবার সুযোগ পায়। অন্যদিকে ইসলাম ১৪শ’ বছর আগেই মেয়েদের জন্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে। ১৮৪৮ সালে মার্কিন মেয়েরা স¤পত্তি ভোগের অধিকার লাভ করে। আর ইসলাম তার শুরুতেই পিতা, স্বামী প্রমুখ আত্মীয়ের স¤পত্তিতে নারীর অধিকার সুনির্দিষ্ট করে দেয়। ভোটাধিকারও মার্কিন মেয়েরা পায় মাত্র ১৯২০ সালে। আর মুসলিম মেয়েরা এ রাজনৈতিক অধিকার পেয়েছে পুরুষদের সাথে সাথেই। ওদের আন্তর্জাতিক আইন রচনার ইতিহাস শুরু হয় গ্রীসের নগররাষ্ট্র দিয়ে। তারপর রোমান সভ্যতার বর্ণনা দিয়ে তারা লাফ দিয়ে চলে আসেন আধুনিক যুগে। মাঝখানে ইসলামী সভ্যতার অবদানের কথা তারা ভুলে যান অথবা সেদিক থেকে তারা চোখ বন্ধ রাখেন। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, গ্রীক এবং রোমান সভ্যতায় ইসলামের মত আন্তর্জাতিক আইনের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল না। পাশ্চাত্যের এই অন্ধত্বতাড়িত প্রপাগান্ডার কারণেই এবং মুসলিম দেশসমূহে ইসলামের পূর্ণ অনুশীলন না থাকার ফলেই ইসলামের মানবাধিকার ও অন্যান্য বিষয়ে বার বার আমাদের নতুন করে কথা বলার জন্য চেষ্টা করতে হয়।
গ্রীক দার্শনিকগণ আইনের রাজত্ব ও ন্যায়-ইনসাফের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন ঠিক। কিন্ত তাদের লেখায় মানবীয় সমতার ধারণা পাওয়া যায় না। তারা মানবজাতিকে হিন্দুস্থানের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, কায়স্থ ও শূদ্র ইত্যাদি শ্রেণির ন্যায় বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেছিলেন। প্লেটো তো সকল নাগরিকের সমান অধিকার প্রদানের জন্য গণতন্ত্রের সমালোচনা করেছেন। তিনি ক্রীতদাসদের স্বাধীন নাগরিকের ন্যায় তিরস্কার করে ছেড়ে না দিয়ে তাদের অপরাধের পৃথক কঠোর শাস্তি দাবী করেন এবং তিনি নারী-পুরুষের মাঝেও সমতার সমর্থক ছিলেন না। যাহোক, বর্তমান কালের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আন্দোলনের পদযাত্রা শুরু হয়েছে ১২১৫ সালের ইংল্যান্ডের ম্যাগনাকার্টা, ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইটস, ১৬৮৯ সালের বিল অব রাইটস, ১৭০০ সালের এ্যাক্ট অব সেটেলম্যান্ট, ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা, ১৭৮৯ সনের ফ্রান্সের ডিক্লারেশন অব রাইটস অব ম্যান এন্ড অব দি সিটিজেন, ১৭৯১ সালের আমেরিকান বিল অব রাইটস কিংবা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পরবর্তী জাতিসংঘ সনদ ও তার আলোকে ১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক প্রণীত সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights) প্রভৃতির মাধ্যমে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ মোস্তাফা (সাঃ) উপরে উল্লেখিত ইউরোপীয় বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত মানবাধিকারের ধারণাসমূহের বহু পূর্বে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও গোছালোভাবে বিশ্ববাসীর সামনে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা উপস্থাপন করেন এবং তা কাজে পরিণত করেন। মহানবী (সা.) মানবাধিকারকে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিস্থাপন করেছিলেন অত্যন্ত সফলতার সাথে যা পশ্চিমা বিশ্ব আজও পারেনি। কেননা আধুনিক বিশ্বেও মানবাধিকারের ধ্বজাধারীদের প্রতিটি কাজ স্ববিরোধিতা ও আন্তঃবঞ্চনায় ভরপুর। যার উদাহরণ এখানে তুলে ধরার অবকাশ নেই। এ জন্যে আন্তর্জাতিক ঐতিহাসিক ও মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব মাইকেল এইচ হার্ট বিশ্বের একশত জন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করে দি হান্ড্রেডস (The Hundreds) শিরোনামে যে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন, তাতে তিনি বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ)কে তাঁর মানবতাবাদের জন্য বিশেষ করে বিদায় হজ্বের ভাষণে যে মানবাধিকারের ঘোষণা করেছেন তার জন্য সবার শীর্ষে স্থান দিয়েছেন।
এছাড়া প্রথিতযশা পন্ডিত Bosworth Smith তাঁর অমর গ্রন্থ, Mohamad and Mohamadanism এ উল্লেখ করেন, “It recognized individual and public liberty, secured the person and property of the subjects, and fostered the growth of all civic virtues, It communicated all the privileges of the conquering class to those to the conquered who conformed to its religion, and all the protection of citizenship to those who did not. It put an end to old customs that were of immoral and criminal character. It abolished the inhuman custom of burying the infant daughters alive, and took effective measures for the suppression of the slave traffic; it prohibited adultery and incestuous relationship and on the other hand inculcated purity to heart, cleanliness of body, and sobriety of life”.
এতে এটা সহজেই অনুধাবনীয় যে, মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার উন্নয়নে ইসলাম তথা হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর অবদান অনস্বীকার্য। আজ থেকে চৌদ্দশত বছরেরও পূর্বে ইসলামে স্বীকৃত মানবাধিকারসমূহ আল্লাহ্র সর্বশেষ কিতাব কুরআন মজীদ ও সর্বশেষ নবী রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জবানীতে উদাত্ত কণ্ঠে বিঘোষিত হয়েছিল। ইসলাম দুনিয়ার মানব রচিত অন্যান্য মতাদর্শের মতো মানবাধিকারের শুধু মৌলিক বা কাগুজে ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি। সেই ঘোষণাকে বাস্তবায়িত করার জন্য কার্যকর ভূমিকাও গ্রহণ করেছে। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ