ঢাকা, বৃহস্পতিবার 23 March 2017, ০৯ চৈত্র ১৪২৩, ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মসজিদ জমিনে মসজিদ মননে

উন্নত জীবন যাপনের জন্য মানুষ সমাজবদ্ধ হয়েছে, রাষ্ট্র গঠন করেছে। পৃথিবীতে আছে বহু রাষ্ট্র। মানুষ সমাজে, রাষ্ট্রে, সঠিক ও শুদ্ধপথে চলার জন্য ধর্ম-দর্শনের চর্চা করে থাকে। মানুষ জানে, স্রষ্টার নির্দেশিত পথেই মুক্তি ও সমৃদ্ধি সম্ভব। এ কারণে মানুষ স্রষ্টার বাণীকে সম্মান করে এবং তাঁর সমীপেই জানায় যাবতীয় প্রার্থনা। মানুষ আসলে ধর্মের মূল বাণী চর্চা করলে সমাজ ও রাষ্ট্রে তার শুভ প্রভাব লক্ষ্য করা যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ ধর্ম-চর্চার নামে অধর্ম চর্চা করে থাকে। এর কারণ অজ্ঞতা, কুসংস্কার, বিদ্বেষ ও স্বার্থপরতা। যুগে যুগে স্বার্থান্ধ মহল ও ভ্রষ্ট ধর্মনেতারা মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রকে অন্ধকারে ছেয়ে ফেলেছে। তেমন অন্ধকার আলো ঝলমলে বর্তমান সভ্যতায়ও বিভিন্ন জনপদে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ভারতের উত্তর প্রদেশের বুলন্দ শহরের জাহাঙ্গীরাবাদ এলাকার একটি মসজিদে বিজেপির পতাকা উত্তোলনের চেষ্টায় সেখানে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত ১৪ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে মাথায় তিলক পরা যুবকরা ওই এলাকায় একটি বিজয় মিছিল বের করে। এ সময় কিছু যুবক মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে এবং কিছু যুবক ছাদে উঠে বিজেপির পতাকা লাগানোর চেষ্টা করে। ওই ঘটনার প্রতিবাদ করলে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এলাকাবাসী এখনও আতঙ্কের মধ্যে আছে। পুলিশ আসার পর উগ্রবাদী যুবকরা সরে গেলেও তারা আবার তলোয়ার নিয়ে ফিরে আসার হুমকি দিয়ে গেছে। এ ধরনের ঘটনা অবশ্য এই প্রথম নয়। এর আগে গত ১২ মার্চও বুলন্দ শহরের একটি মসজিদে বিজেপির পতাকা উত্তোলন করা হয়। এতে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ এসে ওই মসজিদ থেকে বিজেপির পতাকা নামিয়ে ফেলে।
প্রশ্ন জাগে, মসজিদে রাজনৈতিক দলের পতাকা উড়বে কেন? বিজেপি এখন ক্ষমতায়, ফলে ওই দলের নেতা-কর্মীদের এখন ভিন্ন ধর্মের লোকদের অধিকার রক্ষায় সচেতন ভূমিকা পালন করার কথা। কিন্তু আলোচ্য ঘটনায় লক্ষ্য করা গেল উল্টো চিত্র। আসলে কোন ধর্ম তো অন্য ধর্মের উপর আগ্রাসন চালাতে বলে না। কিন্তু বিভিন্ন সময় লক্ষ্য করা গেছে, ধর্মের ভক্ত সেজে অধর্মের কাজ করে যান এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ ও ধর্মনেতারা। এরা আসলে ধর্মের প্রকৃত পথে চলেন না, বরং ধর্মের নামে চালিয়ে যান অধর্ম। ভারতে এখন যে উগ্রতা ও অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তার স্পষ্ট কারণ রয়েছে। এবার উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখ-ের প্রাদেশিক নির্বাচনে বিজেপির বিশাল জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘটনাটিকে ‘নতুন ভারতের’ সূচনা বলে ঘোষণা করেছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই নির্বাচনে বিজেপির প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, ছিল শুধু হিন্দুদের জন্য ‘নতুন ভারত’ গড়ার হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা। কার্যত এটি গোলওয়াকারের ‘স্বপ্নের ভারত’ শ্লোগানের পথেই চলা, যেটি ছিল হিন্দু ও হিন্দু রাষ্ট্রের শ্লোগান। মাধব সদাশিব গোলওয়াকার ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সর্বোচ্চ নেতা। নরেন্দ্র মোদি তাঁর জয়তিপুঞ্জ বই-এ গোলওয়াকারের একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী উল্লেখ করেছেন। মোদি তাকে সব সময়ই অনুপ্রেরণা হিসেবে মানেন। গোলওয়াকার তার বই-এ লিখেছিলেন, “আমাদের জাতিসত্ত্বাকে সংজ্ঞায়িত করতে হিন্দুস্তানের অ-হিন্দু লোকদের অবশ্যই হিন্দু সংস্কৃতি ও ভাষা গ্রহণ করতে হবে, হিন্দু ধর্ম অধ্যায়ন এবং এর প্রতি ভয় ও শ্রদ্ধা রাখতে হবে। কেউ হিন্দু জাতি ও সংস্কৃতি ব্যতীত আর কিছুরই প্রশংসা করতে পারবে না। এক কথায় তাদের হিন্দু জাতির অধীনস্থ হয়ে থাকতে হবে। তারা অন্যথায় কোন সুযোগ বা অগ্রাধিকার দাবি করার অধিকার এমনকি নাগরিক অধিকারও পাবে না।” বর্তমানে আরএসএস’র মাধ্যমে গোলওয়াকারের ওই সূত্রকে নরেন্দ্র মোদি বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া আরএসএস নেতা ভাগওয়াত তো ঘোষণা করেছেন, ভারতে জন্ম নেয়া প্রত্যেকে হিন্দু এমনকি তারা যদি অন্য কোন ধর্মও পালন করে থাকে।
আসলে সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক দেশের স্বপ্ন বাস্তবতায়নের আড়ালে বিজেপি সরকার কি ভারতকে বৈদিক যুগে নিয়ে যেতে চাইছে? এই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে উঠেছে। উত্তর প্রদেশের বুলন্দ শহরের মসজিদে বিজেপির পতাকা উড়ানোর ঘটনাও কি সেই একই সূত্রে গাঁথা? এসব প্রশ্নের জবাব তো যারা সরকারে আছেন তাদেরই দেয়ার কথা। আর আচরণের মাধ্যমে তারা কেমন জবাব দেন সেটাই এখন প্রতিবেশী শান্তিপ্রিয় দেশগুলোর জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।  আমরা মনে করি, মসজিদ কিংবা অন্য যে কোনো উপাসনালয়কে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা প্রয়োজন। কোনো সুস্থ মানুষ মসজিদে আগ্রাসন চালাতে পারে না। কারণ মসজিদ মানুষকে পবিত্র করে, উন্নত করে।
বিশ্ববিখ্যাত বৃটিশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামব্রিজে নির্মিত হচ্ছে একটি অত্যাধুনিক মসজিদ। নানা বৈশিষ্ট্যে মন্ডিত এই মসজিদটি নির্মিত হচ্ছে তুর্কী সরকারের অর্থায়নে ও তত্ত্বাবধানে। দীর্ঘদিন ধরেই এমন একটি মসজিদের অভাব অনুভব করছিলেন ক্যামব্রিজ শহরের মুসলিম অধিবাসীরা। উল্লেখ্য যে, ক্যামব্রিজে প্রায় ৬ হাজার মুসলমান বসবাস করেন। তাঁদের অভিযোগ, শহরে যে মসজিদটি রয়েছে তা খুবই ছোট। ফলে মাঝে মাঝেই তাদের রাস্তায় নামায আদায় করতে হয়। এ কারণে অনেক মুসলিম মসজিদে আসার আগ্রহ হারাচ্ছেন।
২০১৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তারিখে নতুন মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। উদ্বোধনী কাজে সিমেন্টের সঙ্গে মেশানো হয় জম জম কূপের পবিত্র পানি। মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ করতে প্রায় ১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হবে। মসজিদের আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকবে কারপার্কিং-এর সুবিধা। আগামী জুনে মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মসজিদে মোট ১ হাজার মুসল্লি নামায আদায় করতে পারবেন। মহিলাদের নামায আদায়ের জন্য পৃথক ব্যবস্থা থাকবে, সেখানে ৩০০ মহিলা নামায আদায় করতে পারবেন।
ক্যামব্রিজে নতুন এই মসজিদ নির্মাণে নারীদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্যামব্রিজ মসজিদ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম মুরাদ। তিনি বলেন, মসজিদের নির্মাণ ও সৌন্দর্য বর্ধনে মুসলিম নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ক্যামব্রিজের ছাত্রী বারাকা খান ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পূর্বে ২ লাখ ডলার দান করেছেন মসজিদের নির্মাণ কাজে। তিনি ক্যামব্রিজের ইসলামিক স্টাডিজের প্রভাষকও হন। এই মসজিদে নারীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সেবা থাকবে। নারীদের জন্য পৃথক এবাদত স্থান, শব্দরোধী মাতৃকেন্দ্র, নারী চিকিৎসা কেন্দ্রের ব্যবস্থা থাকবে। চিকিৎসা কেন্দ্রে নারীদেরকে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেয়া হবে। এই মসজিদে ইসলামিক শরীয়ত মোতাবেক লাশ গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা থাকবে। মসজিদ কমপ্লেক্সে থাকবে একটি ক্যাফে ও ডিজিটাল কুরআনিক স্কুল। মনোরম বাগানও থাকবেÑ যা সাজানো হবে কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন প্রকার ফুল, ফল ও উপকারী গাছ-গাছালি দিয়ে। বাগানটি উন্মুক্ত থাকবে সর্বসাধারণের জন্য।
মসজিদটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো- পরিবেশ ভাবনা। পরিবেশবান্ধন পদ্ধতিতে নির্মীয়মাণ এই মসজিদে ব্যবহার করা হবে সৌর বিদ্যুৎ, থাকবে পানিশোধন পদ্ধতি, জৈব জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তি ও তাপশক্তিচালিত পাম্প। এ প্রসঙ্গে মসজিদ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম মুরাদ বলেন, আমরা এর মাধ্যমে দেখাতে চাই মসজিদগুলো কেমন পরিবেশবান্ধব হওয়া উচিত এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সম্পদের সঠিক ব্যবহারে ইসলামের নীতিমালা কেমন। তিনি আরো বলেন, এই শহরে এমন একটি মসজিদের বিশেষ প্রয়োজন ছিল। কেননা ক্যামব্রিজ হলো জ্ঞানচর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তির আন্তর্জাতিক রাজধানী। এখানে নিউটন ও ডারউইনের মত বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিরা পড়েছেন। পৃথিবীর সেরা ছাত্ররা এখানে ভর্তি হন এবং তারাই আগামীতে পৃথিবীর নেতৃত্ব দেবেন। ক্যামব্রিজে গত ২০ বছর ধরে যারা ইসলামিক স্টাডিজ পড়ছেন এবং পড়াচ্ছেন, আমি মনে করি আমার দায়িত্ব হলো তাদেরকে ডেকে এনে এই প্রজেক্ট দেখানো। আধুনিক ও শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম গর্ব করার মত মসজিদ দেখতে চায়। তারা এমন মসজিদ চায় যা মুসলিম ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করবে এবং থাকবে এর ঐতিহাসিক মূল্যও। বৃটিশ জনগণের কাছে আমরা তেমন একটি মসজিদ-ই তুলে ধরতে চাচ্ছি। ক্যামব্রিজ মসজিদ ট্রাস্টের সদস্যগণ আশা করছেন, শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে নির্মীয়মাণ মসজিদটি মিশ্র সংস্কৃতির প্রবাহে ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হবে। আমরা তাদের পবিত্র এই চেতনা ও প্রয়াসকে সাধুবাদ জানাই। আশা করবো তাদের এই উদ্যোগ পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদের মুসলিম নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং তাঁরাও মুসলমানদের সোনালি যুগের আলোকে যথার্থ চেতনায় মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণে অনুপ্রাণিত হবেন। আসলে মুসলমানদের সমাজ তো হবে মসজিদকেন্দ্রিক সমাজ। সেই নিরিখেই তো মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা উচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ