ঢাকা, বৃহস্পতিবার 23 March 2017, ০৯ চৈত্র ১৪২৩, ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

মো. শামীম হোসেন (সাভার সংবাদদাতা) : সাভারের আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় অবস্থিত নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল। প্রথম বর্ষ থেকে শুরু করে শেষ বর্ষ পর্যন্ত প্রায় ২২০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এই কলেজে।
তবে এতজন শিক্ষার্থীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, হাসপাতালে নেই রোগীও, শুধুমাত্র পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বোর্ডকে দেখানোর জন্য মাসিক চুক্তিতে শিক্ষক ভাড়া করে নিয়ে আসতো কর্তৃপক্ষ। এমনকি সুস্থ ব্যক্তিদের হাসপাতালে ভাড়া করে এনে রোগী হিসেবে সাজিয়ে রাখা হয় ওই হাসপাতালে। এতে করে চিকিৎসা সেবা দেখার জন্য বঞ্চিত হতে থাকে শিক্ষার্থীরা। আবার বিএমডিসির অনুমোদন দেখিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলেও নেই কোন অনুমোদন।
কর্তৃপক্ষের এমন প্রতারনা সহ্য করতে না পেরে কলেজ পরিবর্তনের (মাইগ্রেশন) আন্দোলনে নামে শতাধিক শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের এক পর্যায়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রী এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের কলেজ পরিবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়। এর পর এক সপ্তাহ তো দূরের কথা এক মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোন প্রজ্ঞাপন জারী না করায় আশুলিয়ার নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের ১০২ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে।
সুত্র জানায়, আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় ২০০৫ সালে নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম কয়েক বছর ঠিকমতো পরিচালনা হলেও এর পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই পরিচালিত হয়ে আসছে। সর্বশেষ নানা অনিয়ম ও সরকারি নীতিমালা ভঙ্গের অভিযোগে গত বছরের ১২ জুন কলেজটি বন্ধ করে দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
পরে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। তাদের আন্দোলনের মুখে বন্ধ ঘোষিত মেডিকেল কলেজগুলো পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। এর পরও থামেনি কর্তৃপক্ষের নানা অনিয়ম আর প্রতারনা। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন ও বিএমডিসির অনুমোদনের কথা বলে শিক্ষার্থীদের সাথে নতুন নতুন প্রতারনা করতে শুরু করে কলেজটির কর্তৃপক্ষ। তবে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের অনুমোদন তো দূরের কথা বিএমডিসির অনুমোদন নেই জানতে পেরে ওই কলেজের ২২০ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষার্থী কলেজ পরিবর্তনের (মাইগ্রেশন) দাবী জানায়।
পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিদেশী ৩৫ শিক্ষার্থীদের মাইগ্রেশন করে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ৩৫ বিদেশী শিক্ষার্থী কলেজ পরিবর্তন করে অনত্র্য ভর্তি হয়ে যায়।
এর পর নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজের আরো ১০২ শিক্ষার্থী মাইগ্রেশনের দাবী জানায়। তারাও মাইগ্রেশনের দাবীতে তাদের আন্দোলন চলমান রাখে। মানববন্ধন, বিভিন্ন দপ্তরে স্বারকলীপি প্রদান, সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্ন কর্মসুচি পালন করতে থাকে শিক্ষার্থীরা। পরে গত ১৫ ফেব্রুয়ারী দুপুরের দিকে মন্ত্রণালয়ের বিপরীত পাশে মাইগ্রেশনের দাবীতে অবস্থান কর্মসূচী পালন শুরু করে তারা। এর এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ৫ জনকে মন্ত্রণালয়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমোদন দেয়। তাদের মধ্য থেকে দুই শিক্ষার্থীর সাথে স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাছিম কথা বলেন। পরে কলেজ কর্তৃপক্ষের নানা অনিয়ম ও প্রতারনা কথা শুনে তিনি নিজে ওইসব শিক্ষার্থীদের মাইগ্রেশনের জন্য আগামী সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। এর পর এক মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কোন প্রঞ্জাপন জ¦ারী করা হয়নি।
নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজের আশরাফুজ্জামান নামের শেষ বর্ষের এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, ভর্তি হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজে কোন রোগীকে আসতে দেখা যায়নি। শিক্ষার্থী ছাড়া সব সময় ফাঁকা পড়ে থকে হাসপাতালের শয্যাগুলো।  তবে শুধুমাত্র পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বোর্ডকে দেখানোর জন্য মাসিক চুক্তিতে শিক্ষক ভাড়া করে নিয়ে আসতো কর্তৃপক্ষ। এমনকি তাদের দেখানের জন্য সুস্থ্য লোকজনকে  ভাড়া করে রোগী সাজিয়ে রাখা হতো ওই হাসপাতালে।
অন্যদিকে রিফাত সুলতানা ও তানজিনা মল্লিক সহ চতুর্থ বর্ষের আরো একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ ভর্তির সময় প্রসপ্রেক্টসে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলেছে। তবে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের অন্তর্ভুক্ত তো দূরের কথা বিএমডিসির অনুমোদনও নেই ওই কলেজের। বিএমডিসির অনুমোদন ছাড়া নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজে পড়াশুনা করে পরীক্ষায় পাস করলেও কোন লাভ নেই। তারা কখনোই কোন রোগীর চিকিৎসা দিতে পারবে না বলেও অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে করে একদিকে যেমন আর্থিক ক্ষতি অন্যদিকে তাদের জীবনের ভবিষৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যাবে।
শীক্ষার্থীরা আরো জানায়, শিক্ষার্থীদের মাইগ্রেশনের দাবীতে আন্দোলনের মুখে গত ১৫ ফেব্রুয়ারী শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে দুই জন প্রতিনিধি আশরাফুজ্জামান নয়ন ও জিনাত নাজমিনের সাথে কথা বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রী। এর পর তিনি ওই দুই শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে মাইগ্রেশন সংক্রান্ত এক নির্দেশে স্বাক্ষর করে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে যাবতীয় কর্যক্রম শেষ করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু এর মধ্যে এক মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সেই প্রজ্ঞাপন তাদের মেডিকেলে এসে পৌছায়নি। তাই তারা দ্রুত মাইগ্রেশনের দাবি জানান।
এব্যাপারে নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিজান বলেন, আমি নতুন এসেছি। বিএমডিসির অনুমোদন ও মাইগ্রেশনরে বিষয়ে তার জানা নেই বলেন।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব বদরুন্নাহার বলেন, নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মাইগ্রেশনের বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয় নির্দেশনা দিয়েছে। তবে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ওই কলেজের সরকারি শর্ত পূরণের জন্য তিন মাসের সময় দিয়েছিল। এ মাসের ১৯ তারিখে তাদের সময় শেষ। এখন সরেজমিনে কলেজটি পরিদর্শন শেষে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়া হবে। সরকারি শর্ত পূরণের সাথে মাইগ্রেশনের সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে এ বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বলে তিনি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ