ঢাকা, শুক্রবার 24 March 2017, ১০ চৈত্র ১৪২৩, ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

স্বাধীনতার মাস

সাদেকুর রহমান : ঘরে ঘরে প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তোলার দৃপ্তশপথ নিয়ে এগিয়ে চলছে বাংলার সাহসী সন্তানেরা। মুক্তিকামী মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। এদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী রংপুর, সৈয়দপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদী জনতার ওপর গুলী চালিয়েছে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশ অমান্য করে সেনাবাহিনী রংপুরে সান্ধ্য আইন জারি করেছে। এতে দেশব্যাপী প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও ব্যারিকেড সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ঢাকায় বেশ কয়েকটি প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সমবেত জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, ‘দাবি বানচালের জন্য কোনো শক্তি প্রয়োগ সহ্য করা হবে না’। এদিন ঢাকা টেলিভিশনের (বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশন) সকল কর্মচারী প্রতীক ধর্মঘট পালন করে।

১৯৭১ সালে অব্যাহত অসহযোগ আন্দোলনের এই সময়ের চিত্র ছিল এমনটিই। স্বাধীনতার সূর্যোদয়ে চির ভাস্বর মাস মার্চের চব্বিশতম দিন আজ শুক্রবার। আগের দিন সকল দৈনিক পত্রিকায় স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার ছবি প্রকাশিত হয়। 

২৩ মার্চ রাত হতে ২৪ মার্চ সকাল পর্যন্ত পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সৈয়দপুর সেনানিবাসের পার্শ্ববর্তী বোতলগাড়ি, গোলাহাট ও কুন্দুল গ্রাম ঘেরাও করে অবাঙালিদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাপক হত্যাকা- চালায়। এতে একশ’ নিহত এবং এক হাজারেরও বেশী আহত হয়। ২৩ মার্চের মতো এ দিনও গোটা পূর্ব পাকিস্তানে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন ভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ছিল পত্ পত্ করে। ইস্ট বেঙ্গল পাকিস্তান রাইফেলসের যশোর ট্রাংক রোডের অফিসেও এ দিন উড়ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

এদিন শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়ার মধ্যকার বৈঠক হয়নি। বৈঠক হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে। বৈঠকের পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগ আলোচনা আর দীর্ঘায়িত করতে প্রস্তুত নয়। দুর্ভাগ্যজনক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমাধানে শেখ মুজিব প্রেসিডেন্টের কাছে যে মূলনীতি উত্থাপন করেছেন, প্রেসিডেন্ট নীতিগতভাবে তা স্বীকার করে নিয়েছেন। এ স্বীকৃত মূলনীতি কার্যকর না করলে দেশ এক গুরুতর পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে। প্রেসিডেন্ট হাউজে এ আলোচনা প্রায় দুই ঘণ্টা চলে। রাতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আবারো সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তাজউদ্দীন আহমদ। এ সময় তিনি বলেন, বল এখন প্রেসিডেন্টের কোর্টে। প্রেসিডেন্টকে এখন তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে হবে। 

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় আগত সংখ্যালঘু পার্লামেন্টের দলসমূহের নেতৃবৃন্দ এদিন করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। বর্তমান রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক প্রশ্নে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনার জন্য তারা ঢাকা এসেছিলেন। ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি মিয়া মমতাজ মোহাম্মদ দওলতানা সাংবাদিকদের বলেন, তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে প্রত্যাবর্তন করছেন না। এছাড়া পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) ১৪ জন নেতার মধ্যে এদিন সাতজন পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। দলীয় প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে তারা ঢাকা এসেছিলেন।

এদিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে জুলফিকার আলী ভুট্টোর চতুর্থ দফা বৈঠক হয়। এ বৈঠক প্রায় ২৫ মিনিট চলে। বৈঠক শেষে ঢাকার শাহবাগস্থ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ থাকা হোটেল রূপসী বাংলা) ফিরে ভুট্টো সাংবাদিকদের বলেন, তিনি একনিষ্ঠভাবে বাংলাদেশের জনসাধারণের সেবা করেছেন এবং বাংলার জনগণ শোষিত হচ্ছে বলে তিনি অনেক আগে থেকেই সোচ্চার। সৈন্যবাহী একটি বিদেশী বিমান এদিন পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলে কোনো একটি গোপন স্থানে অবতরণ করবে বলে জানা যায়। সেনাবাহিনীর গুলীবর্ষণ, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার অশুভ তৎপরতায় পূর্ব পাকিস্তানে ক্রমশ বিস্ফোরোনোন্মুখ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এদিন রাত ৮টার দিকে ভুট্টোর প্রধান সহচর গোলাম মোস্তফা খাঁ শেখ মুজিবের সাথে দেখা করেন। খাঁ মুজিবের কাছে ভুট্টোর কাছে সর্বশেষ প্রস্তাব নিয়ে আসেন এবং তার চূড়ান্ত জবাব চান।

অন্যদিকে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঠিক এক দিন আগে অপারেশন সার্চলাইটের প্রস্তুতি নিচ্ছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। আর পরের দিন ২৫ মার্চ গভীর রাতে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে গণহত্যা করেছিল শত্রু সেনার দল। এই দিনে পাকিস্তানের করাচী থেকে সোয়াত নামক একটি জাহাজ আসে। এতে ৫ হাজার ৬৩০টি অস্ত্র আনা হয়। অস্ত্র নামাতে গিয়ে বাঙালি শ্রমিকরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাক হানাদার সামরিক অফিসারদের মুখের ওপর শ্রমিকরা অস্ত্র নামাতে অস্বীকৃতি জানায়। অবরোধ করে রাখে জাহাজটিকে। এক পর্যায়ে পাকিস্তানী সৈন্যরা শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলীবর্ষণ করে। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে বেশ কয়েকজন স্বাধীনতাকামী শ্রমিক। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে শহরে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। হাজার হাজার বিদ্রোহী জনতা বন্দর ঘিরে রাখে। সৈন্যরা যাতে শহরে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য সেনানিবাসের সাথে সংযোগ রক্ষাকারী সকল সড়ক বিনষ্ট করে দিয়েছে। এ ছাড়া পীচ ভর্তি ড্রাম, গাছের গুঁড়ি, ইট, পাথর দিয়ে বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়েছে। 

এ দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবনে বিভিন্ন সময়ে সমাগত মিছিলকারীদের উদ্দেশে শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় বিরামহীনভাবে ভাষণ দেন। তিনি পাকিস্তানীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, আর আলোচনা নয়, এবার ঘোষণা চাই। আগামীকালের মধ্যে সমস্যার কোনো সমাধান না হলে বাঙালিরা নিজেদের পথ নিজেরা বেছে নেবে। আমরা সাড়ে ৭ কোটি মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। কোনো ষড়যন্ত্রই আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না। পাকিস্তানী সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলার জনগণের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হলে তা বরদাশত করা হবে না। 

২৫ মার্চের আগেই সেনাবাহিনীতে বাঙালি ইউনিটগুলোকে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে ফেলা হয়। তাদের সেনানিবাসের বাইরে পাঠানো হয় বিভিন্ন কাজ দেখিয়ে। এক অংশ থেকে আরেক অংশকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় এবং সবগুলো অংশকেই রেডিও এবং তারহীন যোগাযোগের গ্রিড থেকে যত সম্ভব দূরে রাখা হয়। বাঙালি কর্মকর্তাদের হয় ছুটিতে পাঠিয়ে দেয়া হয় নয়তো নেতৃত্বের কেন্দ্র বা সরাসরি অপারেশনে নিয়োজিত ইউনিটগুলো থেকে যথাসম্ভব দূরে রাখা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানী কর্মকর্তারা বাঙালি ইউনিট পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে নেয়।

পশ্চিম পাকিস্তানের ইপিআর বাহিনীর (সেনাবাহিনীর একটি অংশ) কোম্পানিগুলোকে শহরগুলোর যেখানেই পারা গেছে সেখানেই মোতায়েন করা হয়েছে। অপরদিকে বাঙালি ইপিআর বাহিনীকে পাঠানো হয়েছে এলাকায়। অধিকাংশ ইপিআর ইউনিট তাদের মূল অ্যাকশনের অঞ্চল থেকে অনেক দূরে ছিল এবং নিজ অবস্থান থেকে বড় শহরগুলোতে পৌঁছতে তাদের অন্তত একদিন লাগতো। বাঙালি সেনাবাহিনীকে মূল শহর থেকে দূরে রেখে পাক হানাদাররা ইতিহাসের এক কলঙ্কযুক্ত হত্যাকা-ের ছক এঁকেছিল। এরপরের দিনই বাঙালি ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরতম ঘটনার ‘কালরাত’ আগত হয়েছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ