ঢাকা, শনিবার 25 March 2017, ১১ চৈত্র ১৪২৩, ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন রেমিটেন্স

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : গত ৫ বছরের মধ্যে চলতি বছরে সবচেয়ে কম রেমিটেন্স এসেছে। এটা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নানান ব্যাখ্যা দেয়া হলেও মূলত ক্ষমতাসীনদের বিদেশনীতি এবং বহি:বিশ্বের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতাই বড় কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ২০১৪ সালের আগেও রেমিটেন্সের পরিমাণ মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সর্বশেষ একতরফা নির্বাচনের পর থেকেই বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কমতে থাকে। একদিকে যেমন জনশক্তি রফতানি কমতে থাকে অন্যদিকে পোশাক শিল্পেও নানা সংকট দেখা দেয়। ইউরোপসহ অনেক দেশ এখন বাংলাদেশ থেকে পোশাকখাতে তেমন বিনিয়োগ করতে চাইছেনা। অনেকেই বলছেন, রেমিটেন্সের এই পতন অত্যন্ত ভীতিকর। কারণ, রফতানি আয়ের প্রধান খাত গার্মেন্ট কয়েক বছর ধরেই সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে। এমন অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় প্রধান খাত রেমিটেন্সেও যখন ধস নামার খবর শুনতে হয় তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। কারণ, বিপুল পরিমাণ আমদানি ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান আসে রফতানি আয় থেকে, এতদিন পর্যন্ত যার দ্বিতীয় প্রধান খাত ছিল রেমিটেন্স। সে রেমিটেন্সেই পতন শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, দেশের অর্থনীতি আসলে বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে পড়েছে।
এমন অবস্থায় কেবলই কল্পিত সাফল্যের কথা শোনানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত আর্থিক খাতে সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেয়া, বিশেষ করে জনশক্তি রফতানি এবং রেমিটেন্স বাড়ানোর ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠা। এজন্য সবচেয়ে বেশি দরকার সৌদি আরবসহ মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। এ উদ্দেশ্যে সরকারকে ইসলামী ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক কর্মকান্ড বন্ধ করতে হবে। প্রবাসীদের স্বজনরা যাতে সহজে ও ঝামেলামুক্তভাবে তাদের নামে পাঠানো টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করতে পারে, সে ব্যাপারেও সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, ব্যাংকে গিয়ে ভোগান্তির কবলে পড়তে হয় বলেই প্রবাসীরা হুন্ডিসহ নানা অবৈধ পন্থায় টাকা পাঠিয়ে থাকেন। এটাও রেমিটেন্স কমে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ।
মাস ভিত্তিতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণ সবচেয়ে কম লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে ৯৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার রেমিটেন্স এসেছে বাংলাদেশে। ২০১১ সালের নবেম্বরের পর গত ৫ বছরে একক মাস হিসাবে এত কম রেমিটেন্স কখনো আসেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হুন্ডির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে কমছে। প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর চলমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম থাকায় প্রবাসী আয় কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সব ধরনের হুন্ডি চক্র নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে হুন্ডি প্রতিরোধে বেশ কিছ্ ুউদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি কয়েক দফায় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের দুটি প্রতিনিধি দল মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় সরেজমিন তদন্তে যাবেন বলে জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসে দেশে রেমিটেন্স এসেছে ১০ কোটি ৯ লাখ ডলার। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এসেছে ১১৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার, ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এসেছে ১১৮ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। অন্যদিকে ২০১১ সালের নবেম্বর মাসে সর্বনিম্ন ৯০ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছিল। এর পর টানা ৪ বছর রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ার পর ২০১৬ সালের শুরুতে প্রবাসীরা অর্থ পাঠানো কমাতে শুরু করে। সব মিলিয়ে চলতি ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ৮১১ কোটি ২৪ লাখ ডলারের রেমিটেন্স এসেছে। যা আগের অর্থ বছরে একই সময়ের তুলনায় ১৬৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলার কম।
রেমিটেন্স কমার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনটি বড় কারণে রেমিটেন্স কমে যাচ্ছে। সেগুলো হলো তেলের দাম কমে যাওয়া, ইউরো এবং পাউন্ডের বিনিময় মূল্য পড়ে যাওয়া এবং হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ। রেমিটেন্স কমার পেছনে বেশ কিছু কারণ শনাক্ত করেছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক। তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে টাকার বিপরীতে পাউন্ড, ইউরো, রিয়ালের দর কমে গেছে। এ কারণে প্রবাসীরা রেমিটেন্স পাঠিয়ে টাকা পাচ্ছেন কম। এ জন্য তারা এখন রেমিটেন্স ধরে রাখছেন। দর বাড়লে পাঠাবেন। তা ছাড়া সম্প্রতি হুন্ডির প্রবণতাও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যেসব রেমিটেন্স আসছে সেগুলোর বেশিরভাগই হচ্ছে হুন্ডি।
সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় অর্থনীতির সব খাতেই উন্নয়ন-অগ্রগতির সুখবর শোনানো হয়। অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব অবস্থা যে তেমন নয় সে সম্পর্কিত তথ্যও আবার প্রকাশিত হয়ে পড়ে। বিস্মিত হতে হয় তখন, যখন কর্তা ব্যক্তিদেরই কারো কারো মুখ থেকে বিপরীত তথ্য জানতে হয়। এ রকম সর্বশেষ একটি তথ্যই জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ফজলে কবির। সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যা- ইন্ডাস্ট্রিজের ভোজসভায় তিনি বলেছেন, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের তথা রেমিটেন্সের প্রবাহ কমে গেছে। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিটেন্স কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। গবর্নর জানিয়েছেন, রেমিটেন্স কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান এবং বৈধ চ্যানেলে রেমিটেন্সের প্রবাহ বাড়ানোর উপায় খুঁজে বের করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুটি গবেষক দল শিগগিরই মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সফরে যাবে। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া গেলে রেমিটেন্স প্রবাহে উন্নতি ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন গবর্নর ফজলে কবির। বলার অপেক্ষা রাখে না, মাত্র এক অর্থবছরের ব্যবধানে রেমিটেন্স প্রায় ১৭ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য নিঃসন্দেহে আশংকাজনক। এটুকুই অবশ্য আমাদের উদ্বেগের কারণ নয়। আসল কারণ হলো, রেমিটেন্সের পরিমাণ কমছে ধারাবাহিকভাবে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেমিটেন্স প্রবাহে প্রথম পতন ঘটেছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। সেবার রেমিটেন্সের পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২৩ কোটি ২৮ লাখ ডলার কমে এক হাজার ৪২২ কোটি ৮৩ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছিল। এর পরের বছরে রেমিট্যান্স কিছুটা বাড়লেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আবারও প্রবাহে পতন ঘটে এবং এক হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার থেকে কমে এক হাজার ৪৯৩ কোটি ১১ লাখ ডলারে নেমে আসে। সংবাদপত্রের রিপের্টে সৌদি আরবের কথা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছিল। কারণ, বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার হিসেবে চিহ্নিত সৌদি আরব থেকে মাত্র এক মাসের ব্যবধানেই রেমিটেন্স কমেছিল পাঁচ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। একই ধারার পতন দেখা গেছে আরব আমিরাতসহ অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও।
রেমিটেন্স কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং তেলের দাম ও টাকার বিপরীতে বিদেশী বিভিন্ন মুদ্রার মান কমে যাওয়ার মতো কিছু কারণের উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্যদিকে দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা কিন্তু সব কারণকে দায়ী বলে মানতে রাজি হননি। তারা বরং বলেছেন, সরকারের একদেশকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে ইসলামী ও দেশপ্রেমিক দলগুলোর বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের কারণে বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছে। সে কারণে ওই দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া হয় বন্ধ করেছে নয়তো অনেক কমিয়ে দিয়েছে। উদাহরণ দিলে দেখা যাবে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে পর্যন্ত মোট রেমিটেন্সের প্রায় ৩৫ শতাংশই এসেছে সৌদি আরব থেকে। সবচেয়ে বড় সে চাকরির বাজারেই একদিকে বাংলাদেশীদের জন্য দরোজা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, অন্যদিকে কমে এসেছে শ্রমিকদের সংখ্যা। অনেক টানাপোড়েন ও দরকষাকষির পর সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মীদের নেয়ার ব্যাপারে সম্মত হলেও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অসততার কারণে নতুন পর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছে সংকটের। জি-টু-জি তথা সরকারি পর্যায়ে শ্রমিক পাঠানোর জটিল আয়োজন করতে গিয়ে মালয়েশিয়ার বাজার নষ্ট করেছে সরকার নিজেই। ওদিকে আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলো সরকারের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে শ্রমিক নেয়া হয় বন্ধ করেছে নয়তো অনেক কমিয়ে দিয়েছে। এভাবে সব মিলিয়েই বিদেশে বাংলাদেশীদের জন্য চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে এসেছে। ই-মেইল: jafar224cu@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ