ঢাকা, শনিবার 25 March 2017, ১১ চৈত্র ১৪২৩, ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আশংকাজনক হারে কমছে রেমিটেন্স

আল আমিন : গত কয়েক মাস ধরেই রেমিটেন্স আয় কমছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকও উদ্বিগ্ন। অনেকেই রেমিটেন্স কমায় রিজার্ভে প্রভাব পড়বে বলে আশংকা করছেন। এদিকে প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেই আশংকাজনকভাবে কমছে আয়। এজন্য দায়ী করা হচ্ছে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যসহ সাত দেশ থেকেই রেমিটেন্স কমেছে ৭১ কোটি ডলার। যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৫ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮০ টাকা করে)। এ দেশগুলো হচ্ছে- সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন ও সিঙ্গাপুর। তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০১৫-১৬) সাত দেশ থেকে রেমিটেন্স এসেছে ৯৮৩ কোটি ডলার। যা আগের অর্থবছরে (২০১৪-১৫) ছিল ১ হাজার ৫৪ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এসব দেশ থেকে  রেমিটেন্স কমেছে ৭১ কোটি ডলার।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কার্ব মার্কেট নিয়ন্ত্রণে এখনই বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স পাঠানোর খরচ অনেক বেশি। কস্ট অব রেমিটেন্স বা রেমিটেন্স পাঠানোর ফি মুক্ত রাখা যায় কিনা তা খতিয়ে দেখা উচিত। সেক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে কিছু অর্থ দেয়ার কথা ভাবা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৬ সালে জনশক্তি রপ্তানি শুরুর পর থেকে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। কর্মী যাওয়ার পাশাপাশি প্রায় প্রতি বছর রেমিটেন্সের পরিমাণ বাড়লেও সদ্য বিদায়ী বছরে তা কমেছে। ২০১০ সালে তিন লাখ ৯০ হাজার কর্মী বিদেশে গেলেও ২০১৫ তে বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৫৫ হাজারে। ২০১৬ সালে আরও দুই লাখ বেড়ে হয়েছে সাত লাখ ৫৭ হাজার।
এদিকে, ২০১০ সালে যেখানে এক হাজার একশ’ কোটি মার্কিন ডলার রেমিটেন্স এসেছিল, সেখানে ২০১৫তে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার পাঁচশ’ কোটি ডলারে। তবে, ২০১৬তে ১৬৭ কোটি ডলার কমে তা হয়েছে এক হাজার ৩৬০ কোটি ডলার। অদক্ষ কর্মী পাঠানো আর, অবৈধ পথে দেশে টাকা পাঠানোই এর কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৭ শতাংশ রেমিটেন্স কমেছে সিঙ্গাপুর  থেকে। এ সময় দেশটি থেকে রেমিটেন্স আসে ৩৮ কোটি ৭২ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪৪ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৭ শতাংশ রেমিটেন্স কমেছে সৌদি আরব থেকে। গত অর্থবছরে  রেমিটেন্স আসে ২৯৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩৩৪ কোটি ৫২ লাখ ডলার। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬ শতাংশ রেমিটেন্স কমেছে বাহরাইন থেকে। গত অর্থবছরে এ দেশটি থেকে রেমিটেন্স আসে ৪৮ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫৫ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। সংযুক্ত আরব আমিরাত  থেকে আয় হয়েছে ২৭১ কোটি ১৭ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৮২ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। কমেছে ৪ শতাংশ। কুয়েত থেকে রেমিটেন্স আসে ১০৩ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। আগের বছর ছিল ১০৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। এ দেশ থেকে রেমিটেন্স কমেছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। মালয়েশিয়া থেকে রেমিটেন্স আয় হয়েছে ১৩৩ কোটি ৭১ লাখ ডলার। আগের বছর ছিল ১৩৮ কোটি ১৫ লাখ ডলার। কমেছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং ওমান  থেকে রেমিটেন্স আসে ৯০ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। যা আগের বছর ছিল ৯১ কোটি ৫২ লাখ ডলার। এ হিসাবে রেমিটেন্স কমেছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় মন্দা সৃষ্টি হয়েছে। এতে এ দেশগুলোতে শ্রমিকদের আয় কমে গেছে। কোথাও কোথাও শ্রমিক ছাঁটাইয়েরও নজির রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় খোলা বাজারে ডলারের দামে ৩ থেকে ৪ টাকার ব্যবধান হওয়ায় হুন্ডির দিকে ঝুঁকছেন গ্রাহকরা।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, লোক যদি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি যায় তাহলে তো বেশি টাকা আসার কথা কিন্তু এ টাকা কোথায় যাচ্ছে। তাহলে কি সত্যি সত্যি দেশে আসছে না? নাকি বেসরকারি ভাবে আসছে (হুন্ডির মাধ্যমে)।
ইউল্যাব ও গবেষক রামুর শিক্ষক ড. জালাল উদ্দিন শিকদার বলেন, কত লোককে বিদেশে পাঠাতে পারলাম আর কত পরিমাণ টাকা দেশে আসছে। দুটোই কুয়ান্টিটি।
আর কোয়ালিটির দিকে আমরা কখনও নজর দেইনি। তিনি আরও বলেন, বাজারে একটা কথা আছে বেশি লোক পাঠালে বেশি টাকা আসবে। কিন্তু সেই ধারণাটা এখন ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রবাসী আয় আহরণের পাশাপাশি, অবৈধ পথে টাকা পাঠানো বন্ধের উদ্যোগ না নিলে প্রবাসী আয়ে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশংকা তাদের।
ড. জালাল উদ্দিন শিকদার বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত দক্ষ কর্মী তৈরি করা সম্ভব হবে না ততদিন পর্যন্ত রেমিটেন্সের পরিমাণ কখনও বেশি আসবে না। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পরোক্ষভাবে চাপ তৈরি করছে অবৈধ বাংলাদেশি যারা আছে তাদেরকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে। আর এটি রেমিটেন্সের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমাদের যে প্যারালাল মার্কেটে ডলারের যে দাম আছে সেটি ৮২ থেকে ৮৩ টাকার মতো। আর ইন্টার ব্যাংক মার্কেটে বড়জোর ৭৮ টাকায় পাওয়া যায়। আর এখানেই ৪/৫ টাকা তফাত হয়ে যাওয়াতে এটি বিরাট লোকসানের কাজ করে।
প্রবাসী আয় কমে যাওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে, তা আহরণের প্রক্রিয়া সহজ করার তাগিদ দিয়েছেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জাভেদ আহমেদ। এখন থেকে বিভিন্ন দেশের চাহিদার কথা মাথায় রেখে, অদক্ষ কর্মীর তুলনায় দক্ষ, আধা দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেয়ার কথাও বলেন এই কর্মকর্তা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ