ঢাকা, শনিবার 25 March 2017, ১১ চৈত্র ১৪২৩, ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রহস্যেঘেরা বাংলাদেশ ব্যাংকের অগ্নিকান্ড ॥ থানায় জিডি

 আগুন লাগার ঘটনা স্বাভাবিক বললেন অর্থমন্ত্রী

কামাল উদ্দিন সুমন: বাংলাদেশ ব্যাংকে বৃহস্পতিবার রাতে সংগঠিত অগ্নিকান্ডের ঘটনায় রহস্য তৈরী হয়েছে। অগ্নিকান্ড নিয়ে একাধিক ঘটনার প্রেক্ষিতে এমন রহস্য তৈরী হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের অগ্নিকাণ্ডে খবর ফায়ার সার্ভিসকে দেয় স্থানীয়রা। এমনকি অগ্নিকান্ড ঘটলে সাধারণত জরুরী এলার্ম বাজানো হয় কিন্তু ব্যাংকের ভেতর থেকে তা বাজেনি। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনে যথাযথ অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থাও নেই। এদিকে ব্যাংকে আগুনের ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক নুরুল ইসলাম মতিঝিল থানায় জিডি করেন। মতিঝিল থানার এসআই ইব্রাহিম জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বৃহস্পতিবার দিবাগত (২৩/৩/২০১৭) রাত আনুমানিক ৯ টা ২০ মিনিটের দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয় ৩০ তলা ভবনের ১৪ তলার বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের পূর্ব-দক্ষিু কোণে আগুনের শিখা দেখা যায়। তাৎক্ষণিক ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিলে ৩০ মিনিটের মধ্যে আগুনের শিখা নিভিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম।

অগ্নিকান্ডে ঘটনা তদন্তে দু’টি কমিটি গঠন করা হয়। একটি তিন সদস্যের অন্যটি পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট। নির্বাহী পরিচালক আহমেদ জামালের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিকে ২৮ মার্চের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালকের (ঢাকা) নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

সূত্র জানায়, রিজার্ভ চুরির ঘটনা নিয়ে এমনিতেই সমালোচিত বাংলাদেশ ব্যাংক, এর ওপর বৃহস্পতিবারের আগুন লাগার ঘটনা বিষয়টিকে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ দুটি ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক আছে কিনা তা নিয়েও চলছে জোর আলোচনা। উভয় ঘটনার মধ্যে একটি সাদৃশ্য এ প্রশ্নটিকে আরও জোরালো করেছে, আর তা হচ্ছে গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়েছিল ৩ দিনের ছুটির ফাঁকে, এবারও আগুন লাগার ঘটনার পরে রয়েছে তিন দিনের ছুটি। সঙ্গত কারণেই, দুটি ঘটনা কাকতালীয় নাকি উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক আছে তা নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নানকে। এমন প্রশ্নে বিব্রত অর্থ প্রতিমন্ত্রী প্রকাশ্যে এর সাদৃশ্যের কথা স্বীকার না করলেও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সিস্টেম হ্যাকড করে রিজার্ভ চুরি করা হয়। সেদিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। পরের দুইদিন শুক্র ও শনিবার বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে সাপ্তাহিক ছুটি পালিত হয়। আবার যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি। আবার ৭ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) চীনের নববর্ষ উপলক্ষে ছুটি ছিল ফিলিপাইনে। এই ছুটির ফাঁকে মার্কিন ফেডারেল ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে স্থানান্তর করা হয় ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকে। তিন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনের ছুটির দিনগুলোকে সমন্বয় করেই হ্যাকাররা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনে অগ্নিকা-ের খবর স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রথম জানতে পারেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। সাধারণ মানুষের টেলিফোন পেয়েই তারা আগুন নেভাতে এসেছিলেন বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আলী আহমেদ খান।

তিনি বলেছেন, অগ্নিকা-ের ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনও কর্মকর্তা কিংবা কেউই ফায়ার সার্ভিস অফিসে টেলিফোন করেননি। স্থানীয়রাই আমাদের খবর দেন। তারপর ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটের প্রায় ৭০ জন কর্মী যান ঘটনাস্থলে।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেছেন, অগ্নিকা- নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব লক্ষ্য করা গেছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা কেউই আমলে নেননি। এ ভবনের অবকাঠামো অগ্নিনির্বাপক উপযোগী নয়। তাছাড়া ফায়ার অ্যালার্মগুলোও অকার্যকর। যেগুলো আছে তা বাস্তবিক অর্থে কাজে লাগে না।

ব্রিগেডিয়ার আলী আহমেদ খান আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যুতের লাইন অনেক পুরনো। এক লাইন থেকে অনেক লাইনের সংযোগ দেয়া আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যালার্মিং সিস্টেম ভালো না। মাঝেমধ্যে ফলস অ্যালার্ম দেয়। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব কর্মী বাহিনীর মহড়া দেয়ার কথা। কিন্তু আমরা জেনেছি, সেটাও নাকি নিয়মিত হয় না।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেছেন, অগ্নিকা-ের সময় যে জরুরি অ্যালার্ম বাজার কথা তা বাজেনি। কারণ ভবনটির ফায়ার অ্যালার্মগুলো কার্যকরি নয়। সবই ফলস অ্যালার্ম।

ছুটির ফাঁকে আগুন লাগার ঘটনায় রিজার্ভ চুরির সময়ের সাদৃশ্য থাকা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম. এ. মান্নান বলেন, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা ঠিক হবে না। তবে আপাতত এমনটি মনে হচ্ছে না। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে এই ঘটনার কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও উল্লেখ করেন।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বারবার অগ্নিকা-ের ঘটনা কোনওভাবেই কাম্য নয় উল্লেখ করে অর্থ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কাকতালীয় হোক আর যাই হোক, এভাবে আগুন লাগার পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। আমাদের আইসিটি বিভাগ, বুয়েট ও কম্পিউটার সায়েন্সের বিশেষজ্ঞদের দেখানো হবে। ঘটনা যা-ই ঘটুক, প্রকৃত ঘটনা সবাইকে জানানো হবে। এখানে ঢেকে রাখার কিছু নেই।

তবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবনে আগুন লাগার ঘটনা স্বাভাবিক শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের পর তিনি সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

সাংবাদিকরা এসময় অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চান- কোনো নাশকতার কারণে এ অগ্নিকা- ঘটেছে কি না। অর্থমন্ত্রী বলেন, আগুন লাগার ঘটনা স্বাভাবিক। আনুষঙ্গিক কারণেই এটি ঘটতে পারে। 

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। পরে রাত ১০টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটের ৭০ জন কর্মী। রাত ১০টা ৩৪ মিনিটে আগুন সম্পূর্ণরূপে নেভানো হয়। ব্যাংক ভবনের ১৪ তলায় বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার মাসুদ বিশ্বাসের কক্ষের ১০-১৫ শতাংশ পুড়ে যায়। কক্ষটির বেশকিছু ফাইল ও কাগজপত্র পুড়ে গেছে। তবে শর্ট সার্কিটের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে ফায়ার সার্ভিস ধারণা করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ