ঢাকা, শনিবার 25 March 2017, ১১ চৈত্র ১৪২৩, ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রথমবার পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’

সাদেকুর রহমান : জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াল স্মৃতিবাহী পঁচিশে মার্চ আজ শনিবার। ১৯৭১ সালের এই দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। ছিচল্লিশ বছর আগে এদিন রাতেই নীলনকশা অনুযায়ী জেনারেল ইয়াহিয়া খানের রক্তপিপাসু সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’র নামে ইতিহাসের বর্বর ও কাপুরুষোচিত গণহত্যার ঘটনা ঘটায়। ভয়াল এই দিনটি তাই আমাদের জাতীয় জীবনে হাতেগোনা কয়েকটির একটি বেদনাঘন দিন। সেই বিভীষিকাময় ঘটনার কারণে পঁচিশে মার্চের রাতটি ‘কালরাত’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। স্বজন হারানোর বেদনায় সেদিন শোকাতুর হয়ে পড়েছিল গোটা বাঙালি জাতি। প্রতি বছর এ দিনটি এলেই আমাদের হৃদয় কষ্টে ভরে ওঠে, পুরানো ক্ষতচিহ্ন ফের ‘দগদগে ঘা’ হয়ে দেখা দেয়।

এদিকে একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর গণহত্যার দিনটি জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে দিবসটি এবারই প্রথমবারের মত ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হবে। মধ্যরাত থেকেই নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে দিবসটি পালিত হবে। এ উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সারা দেশে আলোক প্রজ্জ্বলন, আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

গত ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী গণহত্যাকে সংজ্ঞায়িত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদিন সংসদে বলেন, ‘জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর ‘জেনোসাইড কনভেনশন’ গ্রহণ করে। ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বরকে ‘জেনোসাইড ডে’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। কাজেই আমাদের কাছে সেই সুযোগ রয়েছে, জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী আমরা ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।’ 

পরে ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার  বৈঠকে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা এবং জাতীয় ও আর্ন্তজাতিকভাবে দিবসটি পালনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয় । দিবসটিকে ‘ক’ শ্রেণীভুক্ত দিবস অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হয় । এদিকে ৯ ডিসেম্বরের পরিবর্তের ২৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৫ মার্চ কালোরাতের তথ্য-উপাত্ত জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

এছাড়াও গণহত্যা দিবসের তথ্য নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিউইর্য়কে জাতিসংঘ সদর দফতর এবং জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। বাংলাদেশের মিশনগুলো যাতে দিবসটি বিশেষভাবে পালন করতে পারে, সেজন্য মিশনগুলোতে তথ্য-উপাত্ত পাঠানো হয়েছে ।

টালমাটাল মার্চের এদিন মানুষের ঢল নামে মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানম্িরর ৩২ নম্বর বাসভবনে। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সারাদিন প্রায় প্রতিদিন মিছিলের সামনে এসেই তিনি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করেন এবং সবাইকে সর্বাত্মক সংগ্রামের জন্য  তৈরি হওয়ার আহ্বান জানান। এদিন তার বাড়িতে সকাল থেকে ৪-৫শ’ সাংবাদিক উপস্থিত হতে থাকেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় দুইশ’ ছিলেন বিদেশী। দুপুর ১২টায় শেখ মুজিব খবর পান, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সদলবলে ঢাকা সেনানিবাসে চলে গেছেন। তখন আর কারো বুঝতে বাকি রইল না, আলোচনা সফল হয়নি এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের কার্যক্রম শুরু করবে। সকলের ধারণা ছিল তারা হয়তো শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে সামরিক শাসন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করবে। হয়তোবা রাজনৈতিক দল ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দেবে। তবে বর্বরোচিত গণহত্যা চালাবে এ দেশের কোনো মানুষ ঘূর্ণাক্ষরেও এ চিন্তা করেনি।

 বেলা ১১টায় সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে মেজর জেনারেল জানজুয়া, মেজর জেনারেল মিঠ্ঠা খান, মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহ এবং জেনারেল ওমর রংপুর যান। এ সময় ১৪ ডিভিশন সদর দফতরের জনৈক কর্নেলের হাতে একটি সিল করা প্যাকেট ছিল। রংপুর ২৩ ব্রিগেডের কম্রাার আব্দুল আলী মালিক তাদের স্বাগত জানান। সেখানে একমাত্র ইপিআর বাঙালি প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন ওয়াজিশকে ছাড়া সকল ইউনিট কম্রাারকে নিয়ে ব্রিগেডিয়ার মালিক  বৈঠক করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টার রংপুর ত্যাগ করে রাজশাহী, যশোর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা সেনানিবাস ঘুরে বিকেলে ঢাকা ফিরে এলো। বাইরে খবর ছড়িয়ে পড়ল পরিকল্পনা কমিশনের চেয়ারম্যান ইয়াহিয়ার অন্যতম প্রধান আলোচনাকারী এম আহমদ গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় প্রেসিডেন্ট হাউজ ত্যাগ করে ইয়াহিয়া খান সরাসরি করাচি চলে গেছেন। রাত পৌনে ৮টায় প্রেসিডেন্টের ঢাকা ত্যাগের কথা প্রথম জানা যায়।

এরই মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যালঘু পার্টিগুলোর নেতা ওয়ালী খান বলেন, বেজেঞ্জো এবং মিয়া মমতাজ দওলতানা ঢাকা ত্যাগ করেছেন। বিকেলে প্রেসিডেন্টের আইন বিষয়ক পরামর্শদাতা একে ব্রোহীও করাচিতে ফিরে যান। আগের দিন ২৪ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নয়া ফর্মুলার প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা হস্তান্তর সংক্রান্ত প্রেসিডেন্সিয়াল ঘোষণা বাস্তবানের উদ্দেশে এবং প্রস্তাবিত  বৈঠকে যোগদানের জন্য শেখ মুজিবের পরামর্শদাতারা এদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন। তাদের ধারণা ছিল ইয়াহিয়া এবং শেখ মুজিবের আনুষ্ঠানিক আলোচনা ব্যর্থ হয়নি। বিভিন্ন প্রশ্নের বিস্তারিত আলোচনার জন্য যখন উভয়পক্ষে পরামর্শদাতাদের মধ্যে  বৈঠক অব্যাহত রয়েছে, তখন নয়া ফর্মুলার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিকেলে ভুট্টো সাংবাদিকদের বলেন, প্রেসিডেন্টের সাথে  বৈঠক হবে, কেননা বঙ্গবন্ধু ও প্রেসিডেন্ট পরামর্শদাতাদের  বৈঠকে নতুন আবদার সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু কুচক্রীরা সব কিছু ম্লান করে দিয়ে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে মানব সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম  পৈশাচিক হত্যাকা- ঘটায়। ‘কালরাত’ হিসেবে এটি সমধিক পরিচিত। রাত সাড়ে ৯টায় তারা নির্বিচারে ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে, আরমানিটোলা, পিলখানার বিডিআর ক্যাম্পে হামলা চালায়। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার,  দৈনিক পত্রিকা অফিসে বোমা নিক্ষেপ ও অগ্নিসংযোগ করে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। অগ্নিসংযোগে সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে বোমাবর্ষণ ও ব্যাপকভাবে লুটপাট চালানো হয়। গভীর রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে বিমানে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে একটি মিলিটারি কোর্টে তার বিচারের ষড়যন্ত্র শুরু করা হয়। সেই ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নির্মম স্মৃতি আজো জাতিকে পীড়া দেয়।

মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন পঁচিশে মার্চ রাত সর্ম্পকে লিখেছেন, “সে রাতে ৭,০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার করা হয় আরো ৩,০০০ লোককে। ঢাকায় এই ঘটনা ছিল কেবল শুরু। পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে পাকিস্তানী  সৈন্যরা চালিয়ে যায় হত্যাকা-। সেই সাথে তারা জ্বালিয়ে দিতে শুরু করলো ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট। লুট আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হলো যেন। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠলো শকুন তাড়িত শ্মশান ভূমিতে।”

কলকাতা থেকে ডোনাল্ড সিম্যান ল্রনের ‘সানডে এক্সপ্রেসে’ লিখেন, “২৫শে  মার্চের মধ্যরাত থেকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর হাতে ২০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। একাত্তরের ২৮ মার্চ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র এখন বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে শেখ মুজিবের মুক্তি বাহিনীর সাথে পাকিস্তানের নিয়মিত বাঙ্গালী  সৈন্য, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে।”

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রকাশিত ‘স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী স্মারক’ গ্রন্থে বলা হয়, “২৫শে মার্চ সন্ধ্যার আগে করাচি থেকে প্রেরিত ‘দি টাইমস’ ও ‘দি গার্ডিয়ান’-এর সংবাদদাতাদের খবরে বলা হয়, ইয়াহিয়ার সঙ্গে শেখ মুজিবের আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।” একাত্তরের রণাঙ্গনের বীরসেনানী মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম তার ‘১৯৭১ হাজার সশস্ত্র প্রতিরোধ’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেন, “২৫শে মার্চ সকালে ইপিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দফতর পিলখানায় অবস্থানরত ২২তম বেলুচ রেজিমেন্টের  সৈন্যরা পিটি করার ছলে পিলখানার চারদিকে প্রদক্ষিণ করলো। শহরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত ইপিআর  সৈন্যদের পিলখানার ভেতরে নিয়ে আসা হলো এবং অস্ত্র জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। অবশেষে বাঙালি জাতির জীবনে নেমে এলো পঁচিশে মার্চের বিষাদমাখা অন্ধকার। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি জাতিকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য সর্বযুগের সবচেয়ে মর্মান্তিক গণহত্যায় মেতে উঠলো। কাপুরুষের মতো পাকিস্তানী হায়েনার দল অতর্কিত অঘোষিতভাবে ঘুমন্ত জাতিকে আক্রমণ করলো চরম পাশবিকতায়। টিক্কা খানের আদেশ মোতাবেক গণহত্যার নেশায় উন্মত্ত  সৈন্যরা রাত ১১ টা ৪৫ মিনিটে সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে আসে। পুরানো বিমান বন্দরের কাছে পাক  সৈন্যরা প্রথম ব্রাশ ফায়ারিং শুরু করে। অবিরাম গুলীবর্ষণের ফলে সংগ্রামরত উত্তাল জনতার মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ স্লোাগান স্তব্ধ হয়ে যায়। ঘাতক  সৈন্যরা অবিরাম গুলীবর্ষণ করতে করতে শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।”

২০১৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত রণাঙ্গনের বীর  সৈনিক লে. কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী তার ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১’ গ্রন্থে এ দিনের নির্মমতার কথা তুলে ধরে বলেন, “২৫ মার্চ সকালে জনাব ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে ৪৫ মিনিটব্যাপী এককভাবে এক গোপন  বৈঠক করেন। সারা দেশে জনতার উত্তাল তরঙ্গ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়লে সামরিক জান্তা নির্দ্বিধায় রংপুর, চট্টগ্রাম প্রভৃতি স্থানে গুলী চালিয়ে কমপক্ষে ১২০ জনকে হত্যা করেছে বলে খবর পাওয়া যায়।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা : ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তীকালীন সকল আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তান সরকারের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে গণহত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৫ মার্চ রাতে সমগ্র ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করা হয় ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কয়েকটি সুসজ্জিত দল ঢাকার রাস্তায় নেমে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলো ১৮নং পাঞ্জাব, ২২নং বেলুচ, ৩২নং পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এবং কিছু সহযোগী ব্যাটেলিয়ন। এই বাহিনীগুলোর অস্ত্রসম্ভারের মাঝে ছিলো ট্যাংক, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, রকেট নিক্ষেপক, ভারী মর্টার, হালকা মেশিনগান ইত্যাদি। এই সমস্ত অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাকিস্তানী বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে অগ্রসর হয়। ইউনিট নং ৪১ পূর্ব দিক থেকে, ইউনিট নং ৮৮ দক্ষিণ দিক থেকে এবং ইউনিট নং ২৬ উত্তর দিকে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘিরে ফেলে। পঁচিশে মার্চের গণহত্যার প্রথম পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষককে হত্যা করা হয়। অধ্যাপক ফজলুর রহমান এবং তার দুই আত্মীয় নীলক্ষেতের ২৩নং ভবনে নিহত হন। ১২নং ফুলার রোডের বাসভবনে পাকিস্তানী আর্মি ভূ-তত্ত্ববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল মুক্তাদিরকে হত্যা করে। তার লাশ জহরুল হক হলে (তদানীন্তন ইকবাল হল) পাওয়া যায়। ঢাকা হলের গণিত বিভাগের অধ্যাপক আ র খান খাদিম ও শরাফত আলীকে হত্যা করা হয়। তৎকালীন সময়ে হিন্দু ছাত্রদের আবাস জগন্নাথ হল আক্রমণের সময় হলের প্রভোস্টের বাসাও আক্রমণ করা হয়। হানাদার বাহিনী ভূতপূর্ব-প্রভোস্ট এবং জনপ্রিয় শিক্ষক, দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক জি সি দেবকে হত্যা করে, সঙ্গে তার মুসলিম দত্তক কন্যার স্বামীকেও। এর পর পাকিস্তানী বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী বাসভবনে আক্রমণ করে এবং সেখানে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামানকে তার পুত্র ও আত্মীয়সহ হত্যা করে। জগন্নাথ হলে প্রভোস্ট অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে মারাত্মকভাবে আহত হন এবং পরে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার সাথে সহযোগী হাউজ টিউটর অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকেও ছাত্রাবাসেই হত্যা করা হয়। অধ্যাপক আনোয়ার পাশার উপন্যাস ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ থেকে এ তথ্য জানা যায়। 

অসহযোগ আন্দোলন মূলত গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহরুল হক হলের ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন পরিষদ’কে কেন্দ্র করে। তাই, পাকবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম লক্ষ্য ছিলো এই হলটি। অধ্যাপক ড. ক ম মুনিমের মতে, এই হলের কম-বেশি ২শ’ ছাত্রকে পাকবাহিনী হত্যা করে। রাত বারোটার পর পাকসেনারা জগন্নাথ হলে প্রবেশ করে এবং প্রথমে মর্টার আক্রমণ চালায়, সেই সাথে চলতে থাকে অবিরাম গুলী। তারা উত্তর ও দক্ষিণের গেট দিয়ে ঢুকে নির্বিচারে ছাত্রদের হত্যা করতে থাকে। সেই আঘাতে ৩৪ জন ছাত্র প্রাণ হারান। ঢাকাস্থ তৎকালীন মার্কিন কাউন্সিলর আর্চার কে ব্লাড-এর বই ‘দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ হতে জানা যায়, ছাত্রীনিবাস রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় এবং ছাত্রীরা আগুন থেকে বাঁচতে হলের বাইরে আসা শুরু করলে পাকবাহিনী তাদের উপর নির্বিচারে গুলী চালায়। পাকবাহিনী নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সাথে আর্মি ইউনিট ৮৮ এর কথোপকথন থেকে জানা যায়, আনুমানিক ৩শ’ ছাত্রীকে সে সময় হত্যা করা হয়। 

বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও বাংলা একাডেমির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেত আবাসনের ২৪নং বাড়িতে। ওই বাড়ির নিচে দুপায়ে গুলীবিদ্ধ দুই মা তাদের শিশু সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সিঁড়ি ভেসে যাচ্ছিল তাদের রক্তে। পাক হায়নারা ভেবেছিল অন্য কোন দল অপারেশন শেষ করে গেছে। তাই তারা ওই বাড়িতে ঢোকেনি। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তখন প্রাণে বেঁচে যান।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, তাদের বাড়ির নিচে আর একজন অবাঙালি অধ্যাপক থাকলেও তিনি ২৫ মার্চের আগে কাউকে না জানিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। শুধু তাই নয়- বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকার সব অবাঙালি পরিবার তাই করেছিলেন। এ থেকেই ধারণা করা যায়, ২৫ মার্চের এই হত্যাকা-ের পূর্বাভাস অবাঙালিরা জানতো।

আজকের কর্মসূচি : নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ভিন্ন মাত্রায় এবার পালিত হবে ২৫ মার্চ-জাতীয় গণহত্যা দিবস। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক- সাংস্কৃতিক সংগঠন এ উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এ উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ২ দিনব্যাপী আলোকচিত্র প্রর্দশনীসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ২৫ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ সংলগ্ন স্থানে ‘রক্তাক্ত ২৫ মার্চ : গণহত্যার ইতিবৃত্ত’ শীর্ষক এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে । 

আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ গণবিচার আন্দোলন ও শ্রমিক কর্মচারি পেশাজীবী মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদ যৌথভাবে এ দিন বিকেল ৩টায় ঢাকার শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং মোমবাতি প্রজ্জ্বলন, গণসংগীত ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।

সারা দেশে সভা, সমাবেশ, র‌্যালি, আলোকচিত্র প্রদশর্নীসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে যথাযথ মর্যাদায় দিবসটি পালন করার জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ সকল সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী ও দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। 

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে পৃথক দুটি জনসভা অনুষ্ঠিত হবে এদিন। বিকাল ৩টায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে রাজধানীর লালবাগ আজাদ মাঠে এবং একই সময়ে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে মিরপুর বাংলা কলেজ মাঠে জনসভা অনুষ্ঠিত হবে।

এছাড়াও দিবসটি উপলক্ষে রাজধানী ঢাকা এবং যশোরে সমাবেশ করবে কেন্দ্রীয় ১৪ দল। আজ মিরপুর বধ্যভূমিতে এবং ৩০ মার্চ যশোরের চুকনগরে ১৪ দলের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সারা দেশে আলোক প্রজ্জ্বলন ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ