ঢাকা, শনিবার 25 March 2017, ১১ চৈত্র ১৪২৩, ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরে কি হচ্ছে বাংলাদেশ কী পাচ্ছে

স্টাফ রিপোর্টার : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা সংরক্ষিত হবে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে চারদিনের এ সফরে অন্তত দুই ডজন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার কথা থাকলেও বহুল প্রত্যাশিত তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি ও অন্যান্য অভিন্ন নদীর ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক খবর নেই। সরকারের পক্ষ থেকে তিস্তা চুক্তির আভাস দেয়া হলেও কোন প্রকার ‘হোম ওয়ার্ক’ না হওয়া এবং চুক্তিতে কি আছে, কি চাই, ইত্যাদি ব্যাপারে বিষয়টি ধূ¤্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সরকার প্রধানকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানোর অন্তরালে দিল্লী প্রতিরক্ষা চুক্তি বাগিয়ে নিতে চায় বলে ধারণা করছেন ওয়াকিবহাল মহল। 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৭ থেকে ১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী দিল্লী সফরে যাচ্ছেন। ৮ এপ্রিল দিল্লীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। মোদীর সঙ্গে বৈঠকের পর ৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজমীর শরীফ যাবেন। এর পরদিন ঢাকা ফিরবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার ভারতের রাষ্ট্রপতি সরকারি ভবনে থাকবেন। সাধারণত বিদেশি সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধানরা রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকেন না। ক্ষমতাসীনদের টানা মেয়াদে এটা হবে শেখ হাসিনার ভারতে দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সফর। এ সফর নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের তৎপরতা ঢাকায়ও দৃশ্যমান। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার মি. হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা তার দেশের স্বার্থ হাসিলে নিজ সরকারের নির্দেশনা মতো আরো আগে থেকেই উদ্দিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নীতি-নির্ধারকশ্রেণির ব্যক্তিবর্গের সাথে বৈঠক-আলোচনা করে চলেছেন। দুই সরকার প্রধানের আলোচ্যসূচি নির্ধারণে শ্রিংলা গত দু’ সপ্তাহে দু’বার সাক্ষাৎ-বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে। এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শংকরের ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে শেখ হাসিনার দিল্লী সফরের প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লী সফর নিয়ে কেন আলোচনার জন্য আমাদের পররাষ্ট্র সচিব দিল্লী সফর করেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বশেষ ২০১০ সালের জানুয়ারিতে ভারত সফর করেছেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২০১৫ সালের জুনে বাংলাদেশ সফর করেন।

চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এক যুক্ত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আসন্ন সফরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেকার বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হবে এবং দুই নেতার মধ্যে বন্ধুত্বের বন্ধন আরো ও সুদৃঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’ এর পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে এদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, নিরাপত্তা বিশ্লেষক থেকে শুরু করে দেশপ্রেমিক সাধারণ মানুষ পর্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত বৃহস্পতিবারও ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি হলে স্বাধীনতা হুমকির মধ্যে পড়বে। এর আগে বিএনপির পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীন দেশের ভূখ-ে ভারতীয় সৈন্যের উপস্থিতি দেশবাসী মেনে নেবে না।

প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ‘কানেকটিভিটি’ সবচেয়ে গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিয়োজিত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। গত ২০ মার্চ বিকেলে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান শ্রিংলা। ভারতের হাইকমিশনার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতি বেশ জোরেসোরে চলছে। এ কারণেই পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে আলোচনা। আলোচনায় কিছু সংযোজন ও বিয়োজন হচ্ছে। সফরের জন্য বেশ কিছু বিষয়ের অগ্রগতি হয়েছে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে কানেকটিভিট হাইপ্রায়োরিটি। আমি এখনই কিছু বলতে চাই না, এসব ঠিক সময়ে প্রকাশ্য হবে। এ অগ্রগতি রেল, সড়ক এবং বিদ্যুৎ আদান-প্রদানে ও সংযোগ বাড়ানোর বিষয়ে হতে পারে। এক প্রশ্নের উত্তরে শ্রিংলা বলেন, এ অঞ্চলে বিবিআইএন খুবই গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি এ অঞ্চলে যুগান্তকারী ফলাফল বয়ে নিয়ে আসবে। অবশ্য পর্যবেক্ষক মহল এ বিষয়ে বলছেন, কানেকটিভিটি সংক্রান্ত একটি চুক্তি ভুটানে র‌্যাক্টিফাই বিষয় সমস্যায় পড়তে পারে।

আসন্ন সফরের আলোচনার শুরু হতেই ভারতের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রসঙ্গটি ছিল প্রধান বিষয়। বিভিন্ন সূত্রে যেসব খবর আসছে, ভারত চাইছে বাংলাদেশের সাথে একটি দীর্ঘ মেয়াদী চুক্তিস্বাক্ষর। সেই চুক্তির মধ্যে থাকবে ভারত থেকে সমরাস্ত্র কেনা, ভারতীয় বাহিনীর নিকট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং অন্যান্য মিলিটারি টু মিলিটারি সহযোগিতা। এ চুক্তির খসড়ার অগ্রগতি হচ্ছে।

এ নিয়ে যখন বিএনপি সহ জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকায় প্রতিবাদ করতে থাকে, তখনি প্রসঙ্গ বদলানোর কৌশল নেয় দু’দেশের সরকার। 

এমন সমালোচনার জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে যে কোনো চুক্তি হতে পারে। তিনি আরো বলেন, আমাদের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে সামরিক, বেসামরিক, বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক চুক্তি হতে পারে। আমেরিকা এবং রাশিয়ার সঙ্গে অনেক দেশের সামরিক চুক্তি আছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি আছে। এটা নিয়ে ‘গেল রে গেল ইন্ডিয়া হয়ে গেল’ এমন অপপ্রচার এবং ভারতভীতি থেকে সবাইকে দূরে থাকতে হবে। ওবায়দুল কাদের এও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের কোনো চুক্তিই গোপন থাকবে না। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ মহল ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে আমেরিকা, রাশিয়ার সাথে চুক্তি আর প্রতিবেশী ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি এক জিনিস নয়।

এ কারণেই সম্ভাব্য সামরিক চুক্তি নিয়ে দেশের নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও উদ্বিগ্ন। ভারতের সঙ্গে সামরিক চুক্তির বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাাহ চৌধুরী বলেন, আজ আমাদের দেশে যেসব অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ড ও অপকর্ম পরিচালিত হচ্ছে সবকিছুই ভারতের মদদে হচ্ছে। তিনি বলেন, ভারত এখন আমাদের দেশের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে নতুন করে নিরাপত্তা ও সামরিক চুক্তির জন্য সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে। এটা হলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে, দেশকে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া হবে।

এদিকে, গত ১৭ মার্চ বিবিসি বাংলা “বাংলাদেশ-ভারত সম্ভাব্য ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে কী জানা যাচ্ছে?” শিরোনামে এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়াতে সম্ভাব্য একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর তা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে সামনে রেখে সম্ভাব্য চুক্তিকে আলোচনায় নিয়েই অনেকে এ নিয়ে উদ্বেগও ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনীতিক মহল অবশ্য এই প্রস্তাবিত চুক্তির বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কিছুই বলছে না।

তবে দুই দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এটা বোঝা যাচ্ছে যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি দিল্লীতে দুই সরকার প্রধানের শীর্ষ বৈঠকে আলোচিত হবে। আর এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হতে পারে।

প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় কী রয়েছে, সেটি নিয়ে ভারতীয় সাংবাদিক ও বিশ্লেষক সুবীর ভৌমিককে উদ্ধৃত করে বিবিসি বলেছে, “সামরিক ক্ষেত্রে আরো বাড়তি যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি - এসব ব্যাপারে দু’দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করা সেটা একটা ব্যাপার। দু’নম্বর হচ্ছে, ভারত চাইছে যে ভারতের কাছ থেকে বেশি পরিমাণে বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র কেনা হোক। বর্তমানে বাংলাদেশে বেশিরভাগ অস্ত্র চীন থেকে কেনে - ভারত সেই জায়গাতে ঢুকতে চাইছে। আর তিন নম্বর যেটা সেটা হচ্ছে, কিছু কিছু সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে যৌথ অভিযান বা সম্মিলিত অভিযান চালানো - সেরকম একটা সুযোগ তৈরি করার একটা ব্যাপার এ চুক্তির মধ্যে ভারত রাখতে চাইছে।”

ভারতীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে বিবিসি’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চুক্তির মেয়াদ হবে ২৫ বছর, আর এর আওতায় বাংলাদেশকে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়ারও প্রস্তাব আছে ভারতের। দীর্ঘমেয়াদী ওই চুক্তি করতে ভারত বিশেষভাবে আগ্রহী।

কিন্তু প্রশ্ন হলো ভারত কেন ভারত এরকম চুক্তি করতে চায়? সুবীর ভৌমিক বলেন, “ভারতের একটা মূল্যায়ন হচ্ছে অন্য সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে, প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সেভাবে এগোয়নি। এখানে ভারতের যে সমস্যাগুলো তার একটা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষার সমস্যা, আর দ্বিতীয় হচ্ছে চীন। এটা মাথায় রেখেই এ ধরনের একটা ডিফেন্স কো-অপারেশন প্যাক্ট ভারত করতে চাইছে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য।”

সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের দায়িত্বশীল কেউই বিস্তারিত কিছু বলছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিল্লীর একটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে বিবিসি জানায়, “সফরে কী নিয়ে চুক্তি হবে বা হবে না, সেটি এত আগে বলা সম্ভব নয়, কারণ তা পুরোপুরি নির্ভর করছে দুই সরকার-প্রধানের মধ্যে আলোচনার গতিপ্রকৃতির ওপর।”

ওই সূত্রটি আরও যোগ করেছেন, “তবে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার সমস্ত দিক নিয়ে আলোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক, আর তাতে অর্থনীতি-অবকাঠামো উন্নয়ন, কানেক্টিভিটির পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিও থাকতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনও বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে কি না, সেটা বলার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি।”

আর প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি নিয়ে বিবিসি বাংলা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মোঃ শহীদুল হকও কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেন, “এটা যখন ভিজিট হবে, তখনই আপনারা জানবেন যে কী কী চুক্তি হলো। এ চুক্তিগুলো যেহেতু আলোচনার মধ্যে আছে - এমওইউগুলো - সেজন্য এখন এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করাটা যথাযথ হবে না বলেই আমি মনে করি।” প্রতিরক্ষার বিষয়টি আলোচনার মধ্যে আছে কি-না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সব কিছুই আলোচনার মধ্যে আছে। প্রতিরক্ষা সবসময়ই আলোচনার মধ্যে ছিল।”

সামরিক বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা থাকায় সার্বিক বিচারে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত যে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা বাংলাদেশের জন্য খুবই স্পর্শকাতর বলে মনে করেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জামিল ডি. আহসান। তার কথায়, “প্রতিটা দেশেরই সামরিক নীতি থাকে, এবং এগুলো নিজস্ব বিষয় এবং গোপনীয় বিষয়। তাই প্রতিরক্ষা বিষয়টি বা প্রতিরক্ষা চুক্তি যেমন স্পর্শকাতর, তেমনি ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্কটাও কিন্তু স্পর্শকাতর”।

 সই হতে পারে ২৪ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক : এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা এবং ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, এই সফরে দেশটির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ২৪টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও দলিল সই হতে পারে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এসব চুক্তির মধ্যে গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প, পানিসীমায় সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি, ভারতের ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ প্রভৃতি বিষয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে গুরুত্ব পাবে। 

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বহরে সম্প্রতি নবযাত্রা ও জয়যাত্রা নামে দুটি সাবমেরিন যুক্ত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে ব্যবহারের জন্য চীন থেকে কেনা এই সাবমেরিন দুটির বিষয়ে  ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি খুব একটা ইতিবাচক নয়। সদ্য পদত্যাগ করা ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর গত নবেম্বরে ঢাকা সফরে এসে চীনের সাবমেরিনের বিষয়ে দিল্লির অবস্থান জানিয়ে যান। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জলসীমায় কোস্টগার্ডকে আরও শক্তিশালী করার ব্যাপারে ভারত সহযোগিতা করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছিলেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সফরে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা হতে পারে বলে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একজন জানিয়েছেন।

তবে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারে চুক্তি হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সফরে। এমনকি ভারতীয় গণমাধ্যম এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে এবার একগুচ্ছ চুক্তি সই হতে চলেছে।’

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, ‘সরকারি সূত্রে খবর, বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম ছাড়াও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার, পায়রা বন্দরে মাল্টিপারপাস (কন্টেইনার) টার্মিনাল নির্মাণ, লাইটহাউজেস ও লাইটশিপস, কোস্টাল ও প্রটোকল রুটে যাত্রী এবং ক্রুজ সার্ভিস সংক্রান্ত বিষয়ে দু’দেশের সচিব পর্যায়ের বৈঠকে যে সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়েছে, এবার তা চুক্তি হিসেবে রূপ নিতে পারে।’

এক্ষেত্রে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভারতের বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী লেভি পাবে বাংলাদেশ। শুল্ক ও বন্দরের চার্জও ভারত দেবে। অন্যদিকে পায়রা বন্দরের কাজকে ১৯টি কম্পোনেন্টে ভাগ করা হয়েছে। এর একটি কম্পোনেন্টে ভারত সহায্য করতে রাজি হয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রায় ভারতের ‘ইন্ডিয়ান পোর্ট গ্লোবাল’ নামে একটি সংস্থা টার্মিনাল বানাবে। এ ছাড়াও ভারতের আরও কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা পায়রা বন্দরে টার্মিনাল নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্যাসেঞ্জার ক্রুজ সার্ভিস জাহাজ চালাচলের বিষয়েও আলোচনা চূড়ান্ত হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ