ঢাকা, শনিবার 25 March 2017, ১১ চৈত্র ১৪২৩, ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনায় যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে

খুলনা অফিস : অপরিকল্পিতভাবে আবাসিক এলাকায় ছোট-বড়শিল্প কলকারখানা গড়ে ওঠা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কারণে খুলনায় যক্ষ্মার রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে । গত ছয় বছরে মিল শ্রমিক এলাকা এবং ঘন বসতি বস্তি এলাকা থেকে ৮৬৮ জন যক্ষ্মা রোগী সনাক্ত করা হয়েছে। তবে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, পর্যাপ্ত ওষুধ ও মাঠ পর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ করা আছে।

স্থানীয় সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে খুলনা জেলায় যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮২৮ জন। ২০১৫ সালে এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬২০ জন। ২০১৪ সালে জেলার নয় উপজেলায় যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয় দেড় হাজার। যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীর মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশই নারী।

সূত্র মতে, ১২ থেকে ৫০ বছরের উর্ধ্ববয়সী নারী-পুরুষ যক্ষ্মা রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এর পেছনে তিনটি কারণকে তারা দায়ী করেছেন। কারণগুলো হচ্ছে-অপুষ্টি, পরিবারের একজনের শরীর থেকে অপরজনের শরীরে জীবাণু ছড়ানো এবং অঞ্চল বিশেষ রোগের জীবাণুর সক্রিয় অবস্থান থাকা।

নগরীর খালিশপুর থানার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শেখ সাদ্দাম। ওই এলাকার কাশিমপুরে দীর্ঘদিন ধরে তার মুদি দোকানের ব্যবসা ছিল। ২০১৩ সালের দিকে হালকা কাশির সমস্যা দেখা দেয় তার, যা একপর্যায়ে যক্ষ্মায় রূপ নেয়। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে ওই এলাকা থেকে ব্যবসা গুটিয়ে তিনি চলে আসেন সরকারি বিএল কলেজের সামনে। সাদ্দামের মতো ওই এলাকার অধিকাংশ মানুষই কাশি ও যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে আবাসিক এলাকায় একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে এ ধরনের সমস্যা বাড়ছে। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের আধাকিলোমিটারের মধ্যে বসবাসরতদের মধ্যে বাড়ছে বধিরতার সমস্যাও।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আবাসিক এলাকার মধ্যে শিল্প-কলকারখানা স্থাপনে বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু এসব বিধিনিষেধ পাশ কাটিয়ে আবাসিক এলাকাগুলোতে সরকারি- বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠছে শিল্প-কলকারখানা। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের মধ্যে দিন দিন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, বাড়ছে স্বাস্থ্যব্যয়ও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল পোড়ানোর কারণে আশপাশের বাতাসে নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও ক্ষতিকর সালফার ছড়ায়। এমন পরিবেশে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার ফলে কাশি, নাক-চোখ জ্বালাপোড়া, হৃদরোগ ও যক্ষ্মা দেখা দেয় মানুষের মধ্যে। এছাড়া শব্দদূষণের কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়। এমনকি দীর্ঘদিন উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে থাকার ফলে বধির হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

নগরীর খালিশপুরের বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্যেও এর সত্যতা পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ফিল্ড সুপারভাইজার একে মুকতাদিরুল আলম জানান, দূষণের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মানুষের হাসপাতাল থেকে সেবা গ্রহণের হার আগের তুলনায় বেড়ে গেছে। এখানে আসা রোগীদের মধ্যে হাঁচি, কাশি, যক্ষ্মা ও কানের সমস্যায় আক্রান্তের সংখ্যাই বেশি।

সূত্র জানায়, খুলনা জেলার নয় উপজেলায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্র্যাক যক্ষ্মা আক্রান্তদের চিকিৎসা সুবিধা দিচ্ছে। এছাড়া মহানগরী এলাকায় এফএফ, পিকেএস এবং পিমে সিস্টেম নামক এনজিও এই রোগে আক্রান্তদের সেবা ও পরামর্শ দিচ্ছে। ওষুধের কোন ঘাটতি নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। তাদের দেয়া তথ্য মতে, অপুষ্টি, ছোঁয়াচে এবং ইথারে ইথারে জীবাণু ভেসে বেড়ানোর কারণে যক্ষ্মা রোগের বিস্তার বাড়ছে। তাছাড়া বয়োবৃদ্ধজনিত কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসায় যক্ষ্মা জীবাণু সহজে শরীরে বাসা বাঁধতে পারে। মহানগরীর ৯টি স্থানে মাইক্রোস্কপি পরীক্ষা করা হয়।

স্থানীয় বক্ষ্যব্যাধি ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহকারী হোসনে বলেন, ‘যক্ষ্মা রোগ নিরাময়ের জন্য আক্রান্ত ব্যক্তিকে দীর্ঘমেয়াদী ওষুধ সেবনের কোর্স শেষ করতে হয়। ফলে অনেক রোগী ২-৩ মাস ওষুধ সেবনের পর আর খেতে চায় না বা ক্লিনিকে আসে না। এ কারণে পুনরায় রোগটি শরীরে দানা বাঁধতে থাকে। তবে, আমাদের মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মীরা রোগীর বাড়িতে গিয়ে ওষুধপত্র দিয়ে খাইয়ে আসেন। আক্রান্ত ব্যক্তির কফ যেখানে-সেখানে ফেলা যাবে না। তাদের কফ মাটি গর্ত করে পুতে ফেলার নিয়ম রয়েছে।’

খুলনা বক্ষব্যাধি হাসপাতাল সূত্র জানায়, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের মধ্যে একটি মাত্র বক্ষব্যাধি হাসপাতাল হওয়ায় এখানে রোগীদের চাপ বেশি। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্রার (এমডিআর) রোগীদের মধ্যে পুরুষ ও মহিলা মিলে ৩৪ থেকে ৩৫ জন রোগী মারা গেছে। ওই সময়ের মধ্যে এমডিআর ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৭৯ জনের মতো। এর মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ৬ জন। এর মধ্যে ১ জন মহিলা ও ৫ জন পুরুষ রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে যশোর জেলার ঝিকরগাছা এলাকার বাসিন্দা ৩০ বয়সী এক নারী যক্ষ্ম রোগী মারা যান।

এ ব্যাপারে খুলনার সিভিল সার্জন ডা. এএমএম আব্দুল রাজ্জাক বলেন, ফার্নেস ও ডিজেল অয়েলের ধোঁয়ার কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও যক্ষ্মার মতো রোগ হয়ে থাকে। খুলনা মহানগরীতে এ ধরনের রোগের প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। আবাসিক এলাকায় শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠায় এমনটি হচ্ছে। কারণ শিল্প-কারখানা থেকে উৎপন্ন বর্জ্য আশপাশের পরিবেশে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। এসব বর্জ্যে বিদ্যমান ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শে আসার কারণে ওইসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তবে, এ রোগ মোকাবিলায় আমাদের পর্যাপ্ত ওষুধ রয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মীরাও কাজ করছেন।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ