ঢাকা, রোববার 26 March 2017, ১২ চৈত্র ১৪২৩, ২৬ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভারতের উত্তর প্রদেশে বিজেপির বিপুল বিজয় : হিন্দুত্ববাদের প্রবল উত্থান

২০১২ সালে ভারতের কয়েকটি বিধান সভার নির্বাচনী ফলাফল দেখে ভারতের অনেক নামিদামি রাজনৈতিক পন্ডিত এবং বিশ্লেষক মন্তব্য করেছিলেন যে, ভারতে সর্বভারতীয় জাতীয় রাজনীতির দিন শেষ হতে চলেছে। শুরু হয়েছে আঞ্চলিক রাজনীতির দিন। কেউ কেউ  আবার  এটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাসের ঢংয়ে তখন বর্ণনা করেছিলেন যে, এটি হলো সর্বভারতীয় রাজনীতির পতন পর্ব আর আঞ্চলিক রাজনীতির উত্থান পর্ব। কিন্তু ২০১৭ সালের ৫টি বিধান সভা নির্বাচনের ফলাফল ঐ সব পন্ডিত  এবং তাদের  হিসাব নিকাশকে সম্পূর্ণ ওলোটপালট করে দিয়েছে। ভারতের সবচেয়ে জনব-ল এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রদেশ বা রাজ্যের নাম উত্তর প্রদেশ। এতদিন বলা হতো যে, উত্তর প্রদেশ যে দিকে যায়, সারা ভারতই  নাকি সে দিকে যায়। একটু আগেই বলেছি যে, সমস্ত পন্ডিত প্রবরের গণনা ভুল হয়েছে। কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি বিশাল বিজয় নিয়ে এই বিধানসভা নির্বাচনে জয় লাভ করেছে। উত্তর ভারতে কংগ্রেস গো-হারা হেরেছে। ভেঙে চুরমার হয়েছে অন্যান্য দল। সমাজবাদী পার্টি  বা বহুজন সমাজ পার্টি, যারা এতদিন ধরে উত্তর প্রদেশের শাসন ভার নিজেদের দখলে রেখেছিল, তারাও এবার কুপোকাত হয়েছে। অথচ, কংগ্রেস সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজ পার্টি এতদিন ধরে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্ম নিরপেক্ষতার ছিল মুখর প্রবক্তা। ২০১৭ সালের নির্বাচনে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরাজয় ঘটেছে। তাদের রাজনৈতিক মৃত দেহের ওপর প্রবলভাবে জন্ম নিয়েছে হিন্দু জাতীয়তাবাদ। এই হিন্দু জাতীয়তাবাদকে ভারতে সকলেই এখন সংক্ষেপে  বলছে হিন্দুত্ব। এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে ভারতের রাজনৈতিক এবং সংসদীয় প্যাটার্ন সম্পর্কে দুটো কথা বলা দরকার।
সকলেই জানেন যে, ভারতে সংসদীয় বহদলীয় গণতন্ত্র বিরাজমান। ভারত একটি বিশাল দেশ। সে জন্য  এখানকার রাজনৈতিক ব্যবস্থা হলো ফেডারেল পার্লামেন্টারি বা যুক্তরাষ্ট্রীয় সংসদীয় সরকার। বড় দেশ বলে এবং ২৯টি রাজ্য আছে বলে ভারতের সংসদে রয়েছে দুটি কক্ষ। একটি কক্ষ হলো নিম্ন কক্ষ। এর নাম লোক সভা। আর একটি হলো উচ্চকক্ষ। এর নাম রাজ্যসভা। নিম্নকক্ষে যে দল বা জোট সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন লাভ করে তারা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করে। নরেন্দ্র মোদির বিজেপি গত নির্বাচনে সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করেছে এবং  তিনি যে জোট গঠন করেছেন সেটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তাই নরেন্দ্র মোদি আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং তার দল বিজেপি ভারতের ফেডারেল সরকার ক্ষমতায় আসীন।
ভারতীয় পার্লামেন্ট বা সংসদের আর একটি কক্ষের নাম রাজ্যসভা। এটি হলো সংসদের উচ্চকক্ষ। এখানে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে তারা কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করতে পারে না ঠিকই , তবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে। যদি কোন দল বা জোট রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা  অর্জনের পর  মনে করে যে, অমুক বিলটি তারা পাস হতে দেবে না বা অমুক  আইনটি  তারা প্রণয়ন করতে দেবে না তাহলে সেটি তারা ব্লক  করতে পারে।
ভারতীয় শাসন ব্যবস্থায়  পার্লামেন্টে  এই দুইটা কক্ষ ছাড়াও আরেকটি সংসদ রয়েছে। সেটি হলো প্রত্যেকটি  প্রদেশ বা অঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের প্রদেশগুলোর পরিষদকে বলা হতো প্রাদেশিক পরিষদ। এই বিধানসভায় যে দল বা গোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে তারা প্রাদেশিক সরকার বা রাজ্য সরকার গঠন করে। উদাহরণস্বরূপ, মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিম বঙ্গের সরকার গঠন করেছে। অর্থাৎ কেন্দ্রে তার  আসন সংখ্যা যাই থাক না কেন প্রদেশে তার মেজরিটি আছে। তাই তিনি প্রাদেশিক সরকার গঠন করে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। এভাবেই জয় ললিতা জয় রামের দল তামিল নাড়ুতে ক্ষমতায় রয়েছে(জয় ললিতার মৃত্যুর ফলে তার জায়গায় নতুন একজন মুখ্যমন্ত্রী এসেছেন)।
প্রদেশগুলো যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং  যোগাযোগ বিশেষ করে রেল পথের যোগাযোগ ছাড়া অবশিষ্ট প্রায় সমস্ত বিষয়ের ওপর প্রদেশ বা  রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ থাকে। কোনো আইন পাস করতে গেলে বা কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি করতে হলে কেন্দ্রকে আগে দেখতে হয় যে, ঐ বিষয়টির সাথে কোনো প্রদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা। যদি থাকে  তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রদেশের অনুমোদন বা সম্মতি ছাড়া কেন্দ্র ঐ বিষয়ে বিদেশী কোনো রাষ্ট্রের সাথে কোনো চুক্তি করতে  পারে না। তিস্তার পানি বণ্টন  চুক্তি তার জলন্ত  নজির। এর আগে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশের সাথে তিস্তা চুক্তি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই বিষয়টির সাথে পশ্চিম বঙ্গের স্বার্থ জড়িত। কারণ তিস্তা নদীর একটি অংশ যেমন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, অন্য অংশটি তেমনি পশ্চিম বঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কংগ্রেস যে চুক্তিটি করতে চেয়েছিল মমতা ব্যানার্জি তথা তৃণমূল কংগ্রেস সেটিতে রাজি হয়নি বলে তিস্তা চুক্তি সম্পাদিত হয়নি। এবারও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার  বিজেপি সরকার বাংলাদেশের সাথে তিস্তা চুক্তি করতে চাচ্ছেন। এবারও মমতা ব্যানার্জি রাজি হননি। তাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ৭ই এপ্রিল থেকে ১০ই এপ্রিল পর্যন্ত ভারতে যে রাষ্ট্রীয়  সফর করবেন সেই সফরকালে তিস্তা চুক্তি সম্পাদিত হবে না।
॥ দুই॥
এবার অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে, উত্তর প্রদেশে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। নরেন্দ্র মোদি এখন আর শুধু গুজরাটের নেতাই নন, উত্তর প্রদেশের নেতা হিসাবেও আবির্ভূত হয়েছেন। অথচ, অবাক ব্যাপার হলো এই যে, এই উত্তর প্রদেশেই ছিল কংগ্রেসের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। উত্তর প্রদেশে আমেথি নামক নির্বাচনী এলাকাটি ছিল ভারতের কংগ্রেসের দুর্গ। কংগ্রেসের প্রধান নেতা পন্ডিত নেহরু, তার  মেয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, ইন্দিরার পুত্র প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধী,  রাজিব গান্ধীর পত্নী কংগ্রেসের বর্তমান সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধীর অপর পুত্র সঞ্জয় গান্ধী প্রমুখ সকলেই এই আমেথি নির্বাচনী এলাকা থেকে এক বা একাধিক বার লোক সভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজিব গান্ধীর পুত্র রাহুল গান্ধীও টার্গেট করেছিলেন এই আমেথিকে। বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ যেমন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি, বগুড়া যেমন বিএনপির ঘাঁটি, তেমনি উত্তর প্রদেশ ছিল কংগ্রেসের ঘাঁটি।
কিন্তু ২০১৭ সালে দেখা যাচ্ছে যে দাবার ছক সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। উত্তর প্রদেশের বিধান সভার মোট আসন সংখ্যা হলো ৪০৩। ২০১২ সালের নির্বাচনে এই বিধান সভায় কংগ্রেস পার্টি পেয়েছিল ২৮টি আসন। এবার তারা পেয়েছে মাত্র ৭টি আসন। ২০১২ সালে সমাজবাদী পার্টি পেয়েছিল ২২৪ টি আসন। এবার তারা পেয়েছে ৪৭টি আসন। ২০১২ সালে বহুজন সমাজ পার্টি পেয়েছিল ৮০টি আসন। এবার তারা পেয়েছে ১৯ টি আসন। আর ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি  ২০১২ সালে পেয়েছিল ৪৭ টি আসন। এবার তারা পেয়েছে ৩১২ টি আসন। প্রিয় পাঠক ভাই বোনেরা, এখন দেখুন রাজনীতি বা ক্ষমতার তক্তা শুধুমাত্র পাল্টেই যায়নি, রীতিমত উল্টে গেছে। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী ঘরানার একজন বুদ্ধিজীবী বলেছেন, বিজয়ের এই  বৈপুল্য ছোটখাটো ব্যাপার নয়, বেশ বড় সড় ঘটনা। বিজেপির এই বিজয়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব আরও মজবুত হলো, এটা সহজেই বোঝা যায়। ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটের অর্থ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুণ জেটলি একটা পরিসংখ্যান দিয়েছেন। তার হিসাবে ২০১৪ তে লোকসভায় বিজেপির পক্ষে ভোটারদের সমর্থন ছিল ৪০ ভাগ, এবার সে হার প্রায় ৮০ ভাগ। এই বিজয় যদি ভারতীয় রাজনীতির মেরুকরণ এবং ভারতীয় গণমানসের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত হয় তাহলে এটা স্পষ্ট যে, সর্বভারতীয় প্রকল্প হিসেবে হিন্দুত্ববাদ স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে।
উত্তর প্রদেশে বিজেপির সাম্প্রতিক বিজয় ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নতুন মেরুকরণ নয়। সেটা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। এখন মেরুকরণের ভারসাম্য সুস্পষ্টভাবেই হিন্দুত্ববাদের দিকেই ঝুঁকে পড়েছে। অন্য তাৎপর্য ছাড়াও এই বিজয় প্রমাণ করছে যে, কংগ্রেসের পক্ষে আবার সর্বভারতীয় দল হিসেবে হাজির হওয়া এখন রীতিমতো অসম্ভব। একদিক দিয়ে হয়তো ভালই হয়েছে। সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে জাতীয়তাবাদী হিন্দুর চেহারা আড়াল করে রাখার চেয়ে সরাসরি নিজের হিন্দু পরিচয় সামনে আনা অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন, সৎ ও সত্য। ভারতীয় গণমানস তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে এটা বুঝেছে। কেন তাদের এই উপলব্ধি ঘটল তা নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক গবেষণা হতেই পারে। কিন্তু এটাই ভারতীয় রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা। এই বিজয়ে এটাই স্পষ্ট যে, বামপন্থাও ভারতীয় জাতীয় রাজনীতিতে পরাজিত শক্তি। রাজনীতির এই উত্থান পতনের মর্ম বোঝা আমাদের জন্য এখন খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে।
ভবিষ্যতে ভারতের রাজনীতিতে জাতীয় দলের চেয়েও নির্ধারক ভূমিকা রাখবে আঞ্চলিক দল। সমাজবাদী পার্টির ভরাডুবি থেকে সেই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ভারতীয় গণমানস রাজ্যকেন্দ্রিক চিন্তার চেয়ে জাতীয়তাবাদী হিন্দুত্ববাদ বা ভারতীয়তাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। রাজ্য ও কেন্দ্রের দ্বন্দ্ব এতে কমবে না। তাতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি দুর্বল হবে, সেটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
 জোটের প্রচারে প্রধান ছিলেন দুই দলের দুই প্রধান নেতা, উত্তর প্রদেশের দুই মেয়াদের মুখ্যমন্ত্রী মুলায়েম সিং যাদবের পুত্র, এই প্রদেশের  বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব আর কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী। নিজেদের সীমিত চিন্তা ও ব্যর্থতার কোনো পর্যালোচনা না করে এবং ভারতের নতুন বাস্তবতাকে আমলে না নিয়ে তারুণ্য দিয়ে তারা নরেন্দ্র মোদিকে ঠেকাতে পারবেন ভেবেছিলেন। বিজেপির পক্ষে প্রচারে ছিলেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ্। তাদের প্রচারে উন্নয়ন আর মেড ইন ইন্ডিয়ার আবেগ ছিল।
এই ভোটাভুটি থেকে ভারতীয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণ সম্পর্কে আমরা একটি ধারণা পেতে পারি। ১. কংগ্রেস জাতীয় দল হিসেবে তার গণভিত্তি আসলেই হারিয়েছে, ক্রমশ তার ভূমিকা আঞ্চলিক দলগুলোর অধিক কিছু হবে না। আগামীতে এ দলটির পক্ষে কেন্দ্রে শক্তিশালী জাতীয় দল হিসেবে ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা খুবই কম; ২. হিন্দুত্ববাদী বিজেপির বিরুদ্ধে আদর্শিক অবস্থান থেকে প্রতিরোধ করার সাংগঠনিক শক্তি কোনো দলেরই নেই, বামপন্থীদেরও নেই; ৩. ভারতে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আবেদন সাধারণ মানুষের কাছে বাড়ছে; ৪. সংখ্যালঘুকে ভোট ব্যাংক ভেবে যারা রাজনীতি করছে, তারা এক হিসাবে খাদে পড়ছে। বিজেপি তার হিন্দুত্বের শক্তি মুসলমানদের ভোট ছাড়াই কায়েম করতে পারছে। ভারতীয় রাজনীতির এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ দিক।
Email: asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ