ঢাকা, সোমবার 27 March 2017, ১৩ চৈত্র ১৪২৩, ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সঙ্কটের সন্ধিক্ষণে

চারদিকে চলমান পরিস্থিতিকে সঙ্কটের সন্ধিক্ষণ বলতে হয়। প্রকৃত সমস্যাকে ঢেকে রেখে বা আড়াল করে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ভালো আছি বলাটা বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সত্যের অপলাপ হবে। সর্বশেষ সিলেটের ঘটনার আগেও নানা স্থানে সশস্ত্র সংঘাত হয়। দলীয় দ্বন্দ্ব এবং আন্তঃদলীয় কোন্দলে বহু নেতাকর্মী আহত-নিহত হয়েছে। গুম ও ক্রসফায়ারের অনেক ঘটনা ঘটেছে। রাস্তায় প্রতিনিয়ত অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার কারণে বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। অপরাধী চালক ও সংশ্লিষ্টদের আইন ও শাস্তির আওতায় আনা হলে তারাই বরং চরম অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। সমাজ ও শাসনের জন্য এসব সামান্য বিষয় নয়। বিরাট বড় সমস্যাই বটে। কেউ আইন মানতে চাইছে বলেই একটি অস্থিরতা ও অমান্যবোধ সর্বত্র দৃশ্যমান হচ্ছে। সকলেই শক্তি ও সন্ত্রাস দিয়ে নিজের পক্ষে সব কিছুকে আনার চেষ্টা করছে। এভাবেই ঘনীভূত সঙ্কট তীব্রতর হয়েছে। সর্বশেষ পরিস্থিতিকে বলতেই হচ্ছে সঙ্কটের সন্ধিক্ষণ। 
সঙ্কটের সন্ধিক্ষণে কে? দেশ? জাতি? শাসক? শাসিত? সবাই? কে? নিরীক্ষা করলে দেখা যাচ্ছে, সঙ্কটের বাইরে কেউ নেই। সমাজে একটি সঙ্কটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ছোট-বড় সকলেই সেসব সমস্যার শিকারে পরিণত হয়। সামাজিক সঙ্কট থেকে আলাদাভাবে বেঁচে থাকার পথ নেই। বিপদ কম বা বেশি, সকলকেই গ্রাস করে। পরিস্থিতি এখন তেমনই শ্বাস-রুদ্ধকর। সবাই দৃশ্যমান বিপদ তো বটেই, অদৃশ্য বিপদের আতঙ্কে ন্যূব্জ হয়ে আছে।
কল্পনা করা যাক সিলেট বা সীতাকুণ্ড বা অন্যান্য সঙ্কট কবলিত এলাকার কথা। সাধারণ মানুষ সে পরিস্থিতিতে ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন। পথে-ঘাটে-বাসে-ট্রেনে চলন্ত মানুষজনও এখন আর নির্বিঘেœ নেই। একটা গোপন আতঙ্ক গ্রাস করেছে সবাইকে। এহেন বিপদ-সঙ্কুল পরিস্থিতির আশু অবসান দরকার।
অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জেনেছি যে, বিশ্বের অন্যত্র এমন সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে দল-মত সকলে মিলে সমাধানের জন্য কাজ করত। সর্বদলীয় সভা করে পরিস্থিতি সামলানো হতো। বাংলাদেশে এমনটি সম্ভব নয়। সকল দল এখানে এক সাথে বসতেই পারে না। একদল আরেক দলকে সহ্যই করে না। সরকারের হামলা-মামলায় অনেকগুলো রাজনৈতিক দল কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। নিজেদের বাঁচাতেই যারা প্রাণান্তকর অবস্থার সম্মুখীন, তারা আরেকজনের সমস্যার সমাধান দেবে কিভাবে? বস্তুতপক্ষে, সকল ক্ষমতা এখন সরকারের হাতেই কেন্দ্রীভূত। সকলেই তাই তাকিয়ে আছে সরকারের দিকেই। সরকারই এখন বিপদ মুক্তির একমাত্র দায়িত্বশীল।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সরকারের কার্যক্রম নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় না। মাথা ঘামাবার সুযোগও কম। জনগণ এদেশে শান্তি-শৃঙ্খলা, ভাত-কাপড় পেলেই খুশি। কে ক্ষমতায় এলো বা গেলো সেটা তাদের চিন্তার বিষয় হলেও করণীয় কিছু তারা করে না। অতএব সরকার জনগণকে তুষ্ট করে শাসনকার্য অব্যাহত রাখতে সচেষ্ট হবে বলেই সবাই আশা করেন। সরকারের যোগ্য মন্ত্রীবর্গ ও প্রশাসনিক কর্তাগণ অতিদ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতেও সক্ষম হবে বলে সকলের বিশ্বাস রয়েছে এবং আশা করা যায় যে, সব কিছু অল্প সময়ের মধ্যে ঠিক-ঠাক হয়ে যাবে, প্রধানমন্ত্রী প্রফুল্লচিত্তে বহু আকাক্সিক্ষত ভারত সফর সম্পন্ন করবেন ও সামনের নির্বাচন সুপরিকল্পিতভাবে সমাধান করে আরো একটি মেয়াদের জন্য দেশের শাসন কর্তৃত্ব হস্তগত করতে সমর্থ হবেন। একই সঙ্গে তিনি তার অনেক স্বপ্ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পাবেন। অনেক অর্ধ-সমাপ্ত কাজও সেই সুযোগে সমাপ্ত করবেন তিনি। রাজনৈতিক গতিধারা মোটামুটি এ রকমই একটি ছক ধরেই অগ্রসর হচ্ছে।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ছকের সাফল্য থামাতে বিদ্যমান সঙ্কট ও সমস্যা যে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এ কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সর্বাত্মক ক্ষমতাধিকারী সরকারের বিরুদ্ধে গভীর বা অগভীর ষড়যন্ত্র করার শক্তি ও সাহস কে বা কারা পাচ্ছে? জেল, জুলুম, ফাঁসি, হামলা, মামলা, গুম, খুন, অপহরণ, ক্রস ফায়ারের পরেও বিরোধিতা করার মতো শক্তি কোত্থেকে আবির্ভূত হলো? মাঠে তো তারা নেই। করারও কিছু যেন তারা দেখছে না।
আশা করা যায়, সরকার সব কিছু খতিয়ে দেখে একটা বিহিত-ব্যবস্থা করবেন এবং সাধারণ মানুষকে চিন্তামুক্ত করতেও সফল হবেন। জনগণ এতো গবেষণা করে কোনো কিছুর কূল-কিনারা করতে পারবে না। বরং দুষ্ট লোক কর্তৃক প্রকাশিত গুজবে বিভ্রান্ত হওয়াই জনগণের একটি অংশের অভ্যাস। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ভাষ্য ও বক্তব্যের বাইরে কোনো কান-কথা, গুজব, বিরোধীদের প্রচারণায় বিশ্বাস স্থাপন করার বদ-অভ্যাসও জনগণকে সম্পূর্ণভাবে পরিতাগ করতে হবে।
বাংলাদেশ-ভারতের ঐতিহাসিক মৈত্রী ও সম্পর্ক দৃঢ়করণের প্রত্যয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরের পূর্বে কোনো সঙ্কট ও সমস্যা সৃষ্টির কারণ কি হতে পারে? বিভিন্ন পত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুত্বের চুক্তিতে অন্য কিছু আবিষ্কার করার জন্য একদল লোক উঠেপড়ে লেগেছে। তারা গোলামী ও বশ্যতা নামক শব্দগুলো বারবার ব্যবহার করছে। সামরিক ও বেসামরিক নানা তথ্য সামনে নিয়ে আসছে। শ্রীলংকা, সিকিম ও ভূটানকে উদাহরণস্বরূপ সামনে দাঁড় করাচ্ছে। তেল, গ্যাস, সুন্দরবন, বন্দর সুবিধাসহ নানাবিধ জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোকে নিয়েও তারা উচ্চবাচ্য করছে। এতে সঙ্কট বাড়ানোর মাধ্যমে পরিস্থিতিকেই নাজুক করা হচ্ছে। জনগণের কোনো কোনো অংশ আবার এসব বিশ্বাসও করতে শুরু করেছে। ফলে এসব তৎপরতাকে সহজভাবে নেয়ার কোনো কারণ নেই।
বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে প্রধান বিরোধী দল নামধারী এরশাদ ও রওশনের কাছে কিছু প্রত্যাশা করা বাতুলতা মাত্র। সরকারের দয়ায় প্রধান বিরোধী দল হয়ে সরকারের দয়া-দাক্ষিণ্য পেয়ে অতীতের অবৈধ কর্মকাণ্ড জায়েজ করে নিতে পারলেই তারা চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। নয় বছরের অবৈধ শাসনে যারা গণতন্ত্রের বারোটা বাজিয়েছিল, রাস্তা-ঘাট রক্তাক্ত করেছিল, জনগণের ন্যূনতম অধিকারও যারা দেয়নি; তারা যদি বৈধ ও গণতান্ত্রিক হওয়ার সুযোগ পায় তাহলে সেটা গ্রহণ করবে না? তারা জানে, কোনো নির্বাচন ছাড়াই গণতন্ত্রের প্রহসনে অংশ নিয়েও তারা গণতান্ত্রিক হতে পারবে। কারণ, বাংলাদেশে কাউকে রাজাকার, দালাল, গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক ইত্যাদি বানানোর একমাত্র ও সর্বময় ক্ষমতা কাদের সেটা পতিত স্বৈরাচারের ভালোই জানা আছে। অতএব এহেন বিরোধী দল নিজেকে বাঁচাতেই মরিয়া। এদের কাছে কোনো কিছুর প্রত্যাশাই করা যায় না। অন্যবিধ যেসব রাজনৈতিক দল জনপ্রিয়তা ও শক্তি নিয়ে বাইরে অবস্থান করছে, তাদের অবস্থা দুর্বিষহ। মার খেতে খেতে তারা এখন পর্যুদস্ত। টিকে থাকার মতো করে কাগজে-কলমে তারা কোনোরকম অস্তিত্ব বজায় রাখছে।
জনগণকে এখন অবশ্যই রাজনৈতিক মাঠে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারীদের মুখাপেক্ষী হতে হবে। মুখাপেক্ষী হতে হবে এজন্য যে, তারাই এখন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার একমাত্র মালিক। সমস্যার সৃষ্টি ও সমাধান, উভয়টিই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। সঙ্কটের সন্ধিক্ষণে বলতে কিছু বলা হলেও তারা সে সকল সঙ্কট ও সমস্যার ঊর্ধ্বে। একমাত্র তাদের পক্ষেই সব কিছু সামলানো এবং ঠিক করে ফেলা সম্ভব এবং সেটা তাদের যেমন ইচ্ছা ও মর্জি, সেভাবেই করতেও তারা সমর্থ। প্রশ্নহীনভাবে তাদের সদয় মনোভাব পেলেই বরং মানুষ রক্ষা পাবে। অতএব, ভারত সফর বা জাতীয় স্বার্থ নিয়ে টুঁ শব্দটিও করার মানেই হলো সরকারকে বিব্রত ও বিরক্ত করা। রাজভক্ত  প্রজা-নাগরিকের কর্তব্য হলো নিজেকে রক্ষা করা। নিজে রক্ষার জন্য যতটুকু দরকার নমঃ নমঃ করাও যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন অন্যত্র। সিলেট, সীতাকু-সহ বিভিন্ন স্থানে যে আতঙ্ক, বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ঘনীভূত সঙ্কটের সন্ধিক্ষণ এবং কতিপয় দুর্মুখ-সমালোচকের মুখে যে জাতীয় স্বার্থ হানিকর ঘটনার পূর্বাভাস অত্যন্ত ভীতিকরভাবে প্রচারিত হচ্ছে, তাতে ষাষ্ঠাঙ্গে প্রণামসহ নমঃ নমঃ করেও কি পার পাওয়া যাবে? চিন্তার কারণটি এখানেই নিহিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ