ঢাকা, মঙ্গলবার 28 March 2017, ১৪ চৈত্র ১৪২৩, ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সহজ পদ্ধতি অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি

 

এইচ এম আকতার : নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই বেড়ে চলছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের এই সহজ পদ্ধতি অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। মোবাইল ব্যাংকিং-এ অর্থ পাচার ঠেকাতে ইতোমধ্যে সরকার নীতিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশে জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে মোবাইল ব্যাংকিং গ্রাহকের সংখ্যা ৭৯ লাখের বেশি বেড়েছে। এটা আগের মাসের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। যা একক মাস হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে মোট মোবাইল ব্যাংকিং গ্রাহক ছিল ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৫৪ হাজার। যা আগের মাস জানুয়ারি পর্যন্ত ছিল ৪ কোটি ১৯ লাখ ৩৩ হাজার। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, রেকর্ড পরিমাণ গ্রাহক বাড়লেও এ সময়ে মোবাইলে লেনদেন কমেছে। জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে মোট লেনদেন কমেছে প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ। আর দৈনিক লেনদেন কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ।

দ্রততম সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা পাঠানোর অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম মোবাইল ব্যাংকিং। বর্তমানে এ সেবা ব্যবহার করে মানুষ তাদের পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়ের কাছে বেশি টাকা পাঠাচ্ছেন।

তবে সম্প্রতি মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় অপব্যবহার ঠেকাতে বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে হিসাব খেলা ও পরিচালনা এবং লেনদেনে আরো কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এখন একজন ব্যক্তি যেকোনো মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় একটি মাত্র হিসাব চালু রাখতে পারবেন। যাদের একাধিক হিসাব চলমান আছে, তা দ্রত বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দৈনিক ও মাসিক লেনদেনের সীমা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে একজন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক একবারে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। আগে এই হার ছিল ২৫ হাজার টাকা। এখন থেকে গ্রাহক দৈনিক দুই বার এবং মাসে ১০ বার এই সেবা নিতে পারবেন, যা আগে ছিল দৈনিক তিন বার এবং মাসে ১০ বার। দৈনিক জমার সীমাও পরিবর্তন করা হয়েছে।

এখন দিনে সর্বোচ্চ দুই বারে ১৫ হাজার টাকা করে পাঠানো যাবে। মাসে ২০ বারে ১ লাখ টাকার বেশি পাঠানো যাবে না। আগে দিনে পাঁচ বারে ২৫ হাজার টাকা এবং মাসে ২০ বারে দেড় লাখ টাকা করে জমা করা যেত।

এ ছাড়া একটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে টাকা জমার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই হিসাব থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকার বেশি নগদ উত্তোলন করা যাবে না। পাশাপাশি ৫ হাজার টাকা বা এর অধিক লেনদেন করার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিপত্র প্রদর্শনের বিধান করা হয়েছে। এমনকি রেজিস্টার খাতায় গ্রাহকের স্বাক্ষর বা টিপসই সংরক্ষণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কোনো এজেন্ট এই ধরনের কার্যাদি যথাযথভাবে সম্পন্ন না করলে বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে এজেন্টশিপ বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

খুব অল্প সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা লেনদেনের জন্য মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা শুরু হয় ২০১০ সালে। মূলত দেশের স্বল্প আয়ের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার জন্য দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই উদ্যোগ নেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে এখন গড়ে প্রতিদিন ৫’শ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে এই প্রক্রিয়ায়। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের এই সহজ পদ্ধতি অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। অধিকাংশ মানুষ কোন একাউন্ট ছাড়াই লেনদেন করছেন প্রতিদিন।

 দেশে এখন এসব বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন বিজ্ঞাপন ও বিলবোর্ডে প্রচারের ফলে মানুষের কাছে বেশ পরিচিত এই মোবাইল ব্যাংকিং। খুব সহজে ও দ্রত টাকা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পাঠানোর এই মাধ্যম এখন অনেকেই পছন্দ করছেন।

এ ব্যবস্থায় মূলত গ্রাহককে মোবাইলে একটি ব্যাংক একাউন্ট খুলতে হয়। এই একাউন্টের মাধ্যমেই অন্য কোন মোবাইল ব্যাংক একাউন্টে টাকা পাঠাতে পারেন তিনি। তবে এই নগদ টাকা তুলতে মাঝখানে থাকেন একজন এজেন্ট। তারা মূলত ছোট ব্যবসায়ী যারা নিজের দোকান ঘরেই লাইসেন্স নিয়ে থাকেন ব্যাংকের কাছ থেকে।

মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকা এই এজেন্টরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের একাউন্ট থেকে টাকা আদান প্রদান করে থাকেন। সারা দেশে মোবাইল ব্যাংকিং এর এজেন্ট রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ ৬২ হাজার।

ঢাকার যাত্রাবাড়ির একজন এজেন্ট মোহাম্মদ হানিফ বলেন, তার কাছে যারা আসেন তাদের কারও একাউন্ট নেই। সবাই তার মোবাইল একাউন্ট থেকেই লেনদেন করেন।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অনুমোদনের ভিত্তিতে সাড়ে চার লাখের বেশি এজেন্ট এই নগদ টাকা লেনদেনের কাজ করছেন। আর বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে এখন গড়ে প্রতিদিন ৫’শ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে এই মোবাইলের মাধ্যমে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে এই বিপুল পরিমাণের অর্থের লেনদেন দেশের অর্থনীতিতে কি অর্থ বহন করছে? মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তারা বলছেন এক কথায় এর ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। ফলে অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে নানা পদক্ষেপ নিতে হবে? তিনি বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাংলাদেশে বিকশিত হচ্ছে। তাই একদিনে সব ঠিক হয়ে যাবে না। ব্যাংকগুলোকে প্রতিনিয়ত তদারকি করতে হবে।

সাবেক এই গবর্নর বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাংলাদেশে ডেভেলপ করছে। একদিনে সব ঠিক হয়ে যাবে না। এজেন্টদের মাধ্যমে যেটা হচ্ছে সেটাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। 

 সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তুলনামূলকভাবে যারা অসচেতন তাদেরকে ভুল বুঝিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে অন্যের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য বড় ধরনের সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় রয়েছে। অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দক্ষ কায়দায় তারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের টাকা লুফে নিচ্ছে। 

এদিকে অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্দেহজনক লেনদেন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এ মাধ্যমেই মানবপাচার থেকে শুরু করে ড্রাগ ব্যবসায়ে অর্থায়ন হচ্ছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওপর সরকার কঠোর নজরদারি আরোপ করতে যাচ্ছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে এ ব্যাপারে অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে। 

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে বেশি নিয়ম কানুনের বেড়াজাল তৈরি হলে তাদের লক্ষ্য যে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তারা এই ব্যবস্থায় নিরুৎসাহিত হয়ে পরতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ