ঢাকা, বুধবার 29 March 2017, ১৫ চৈত্র ১৪২৩, ২৯ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বার বার রাষ্ট্রপতিকে টেনে আনায় সুপ্রিম কোর্টের ক্ষোভ

 

স্টাফ রিপোর্টার : অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধিমালা প্রণয়নে সরকারকে আরো এক সপ্তাহ সময় দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। তবে সরকারপক্ষে আবারো সময় চাওয়ায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা ক্ষোভ প্রকাশ করে শুনানিতে বলেছেন এটা তো প্রেসিডেন্সিয়াল গভর্নমেন্ট না। সংসদীয় ব্যবস্থায় কেন বার বার রাষ্ট্রতিকে টেনে আনছেন? বিচার বিভাগ নিয়ে এটা কী করছেন? রাষ্ট্রপতিকে দেখিয়ে বিচার বিভাগকে ফেলে রাখবেন নাকি? সরকারের এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে উদ্দেশ্য করে প্রধান বিচারপতি কথাগুলো বলেছেন। 

গতকাল মঙ্গলবার সকালে গেজেট প্রকাশে সরকার পক্ষে আরো চার সপ্তাহের সময় আবেদন করলে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন। এরপর আদালত গেজেট আকারে প্রকাশে সরকারকে আরো এক সপ্তাহ সময় দেন। 

এদিকে বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ সংক্রান্ত বিধিমালা রাষ্ট্রপতির দেখা শেষ হলেই তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সুপ্রিম কোর্ট থেকে আরো এক সপ্তাহ সময় পাওয়ার পর দুপুরে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে তিনি সাংবাদিকদের একথা জানান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আমার মনে হয় না বিচার বিভাগের সাথে নির্বাহী বিভাগের কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। কন্ডাক্ট রুলসের (আচরণবিধি) ব্যাপারে দুই পক্ষেরই বক্তব্য ছিল, সেটা থাকা স্বাভাবিক। সেই বক্তব্যগুলো যাতে সুষ্ঠুভাবে নিরসন হয় সেই চেষ্টা করা হয়েছে। সেইভাবে এটা নিরসন হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির কাছে সেটা রয়েছে, তিনি এটা দেখতে চেয়েছেন, তিনি যে মুহূর্তে দেখা শেষ করে আমাদের কাছে দিয়ে দিবেন, সেই মুহূর্তেই আমরা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। 

অধস্তন আদালতের ৫৪০ জন বিচারককে প্রশিক্ষণ প্রদানে আইন ও বিচার বিভাগের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সেয়দ আমিনুল ইসলাম ও বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হাই কমিশনার সেলী আনে ভিনসেন্ট।

গত ১৪ মার্চ গেজেট প্রকাশ করতে দুই সপ্তাহ সময় দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত। ওইদিন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা বলেন, বিচার বিভাগকে জিম্মি করে রেখেছে সরকার। রাষ্ট্রের কাছে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ফেয়ার প্লে হচ্ছে না। এর ধারাবাহিকতায় বিষয়টি আবার শুনানির জন্য গতকাল মঙ্গলবারের কার্যতালিকায় আসে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাবিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে ১৪ মার্চ পর্যন্ত সময় দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত। গত ১২ ফেব্রুয়ারি এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের আলোচনার প্রেক্ষিতে বিধিমালার কিছু সংশোধন করে তা পুনঃর্বিবেচনার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। আমরা আদালতের কাছে দুই সপ্তাহ সময় চেয়েছি। আশা করি এই সময়ের মধ্যে গেজেট হবে। গেজেট হলে অচলাবস্থার অবসান হবে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি গেজেট প্রকাশে এক সপ্তাহ সময় দেন সর্বোচ্চ আদালত। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি ফের আরও দুই সপ্তাহের সময় চান এটর্নি জেনারেল। এরপর আদালত কালক্ষেপনের লিখিত কারণ জানতে চেয়েছিলেন। 

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা বিধিমালার গেজেট প্রকাশ না করায় আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিবকে ১২ ডিসেম্বর হাজির করতে এটর্নি জেনারেলকে মৌখিক নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর মধ্যে ১২ ডিসেম্বর নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালার গেজেট প্রকাশের প্রয়োজন নেই বলে সিদ্ধান্ত দেন রাষ্ট্রপতি।

১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর মাসদার হোসেন মামলায় (বিচার বিভাগ পৃথককরণ) ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেয়া হয়। ওই রায়ের ভিত্তিতে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা ছিলো। আপিল বিভাগের নির্দেশনার পর গত বছরের ৭ মে আইন মন্ত্রণালয় একটি খসড়া শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধি প্রস্তুত করে সুপ্রিম কোর্টে পাঠায়।

গত বছরের ২৮ আগস্ট শুনানিকালে আপিল বিভাগ খসড়ার বিষয়ে বলেন, শৃঙ্খলা বিধিমালা সংক্রান্ত সরকারের খসড়াটি ছিলো ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার হুবহু অনুরূপ। যা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থি। এর পরই সুপ্রিম কোর্ট একটি খসড়া বিধিমালা করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান। একইসঙ্গে ৬ নবেম্বরের মধ্যে তা প্রণয়ন করে প্রতিবেদন আকারে আদালতকে অবহিত করতে আইন মন্ত্রণালয়কে বলা হয়। গত বছরের ৬ নবেম্বর সে অনুসারে মামলাটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসে। কিন্তু সরকার পক্ষে এটর্নি জেনারেল এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি জানাতে পারেননি।

পরে আপিল বিভাগ বিধিমালা চূড়ান্তের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা লিখিতভাবে জানাতে এটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দিয়ে ৭ নবেম্বর আদেশের দিন ধার্য করেন। ওই দিন এটর্নি জেনারেল আট সপ্তাহের সময়ের আবেদন জমা দেন। যাতে বিধিমালাটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি। সর্বোচ্চ আদালত ২৪ নবেম্বর পর্যন্ত সময় দেন।

গত বছরের ২৪ নবেম্বর এটর্নি জেনারেল গেজেট প্রকাশে আরও এক সপ্তাহ সময় চাইলে আপিল বিভাগ তা মঞ্জুর করেন। পরে ১ ডিসেম্বর আইনমন্ত্রী ফিলিপাইনে রয়েছেন বলে ফের এক সপ্তাহ সময় চাওয়া হয়। সময় মঞ্জুরের পরও ৮ ডিসেম্বরের পর থেকে আরও কয়েক দফা সময় পায় সরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ