ঢাকা, বুধবার 29 March 2017, ১৫ চৈত্র ১৪২৩, ২৯ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সর্বোচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়ন কাম্য

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও গাইড লাইন থাকা সত্ত্বেও বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা আসামীকে বিজ্ঞাসাবাদের নামে রিমান্ডে নেয়া কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। এর ফলে নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনা বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকা-ের ঘটনা নির্দ্বিধায় ঘটে চলেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, অভিযুক্ত আসামী বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পুলিশী রিমান্ডে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে কোনো প্রকার নির্যাতন না করার জন্য সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা সামান্যতমও মানা হচ্ছে না। বলা যায়, আদালতের আদেশ বরাবরই লঙ্ঘিত হয়ে আসছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশী রিমান্ডে নির্যাতনের ভয়ংকর চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এ নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, আদালতের নির্দেশ অমান্য করা আদালত অবমাননা করা। এতে একদিকে গুরুতর অপরাধ, অপরদিকে আইনের শাসনকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। উল্লেখ্য যে, গত বছরের ১০ নবেম্বর সর্বোচ্চ আদালত বিনা পরোয়ানায় যে কোন মানুষকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারে আইনী নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছেন। এর পাশাপাশি হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ১০ দফার একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।
একই সাথে ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য ৯ দফা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব পালনে ৭ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়। এসব নির্দেশনা প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, পুলিশের মহাপরিদর্শক ও র‌্যাবের মহাপরিচালককে সরবরাহের নির্দেশ দেয়া হয়। আদালতের নির্দেশনার কপি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কাছে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত এ রায় বাস্তবায়ন করছে না।
সর্বোচ্চ আদালতের রায় এবং নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করা সত্যিই দুঃখজনক। এটা সরাসরিভাবে আইনের শাসনের পরিপন্থী। রাষ্ট্রের নাগরিকদের আশা-ভরসার জায়গাই হচ্ছে সর্বোচ্চ আদালত। অতএব সর্বোচ্চ আদালতের রায় অমান্য করা হলে বা অকার্যকর করে রাখা হলে তাদের আর অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রের নাগরিকদের নাগরিক মৌলিক অধিকার, স্বার্থরক্ষা, অধিকার, প্রতিষ্ঠা ও কল্যাণ সাধনে সর্বোপরি মানবাধিকার সুরক্ষায় আদালত সব সময় সচেষ্ট এবং রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়। আদালতের রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন ও প্রতিপালন করা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব। আমরা দেখেছি উচ্চ আদালত দেশের নাগরিকদের কল্যাণে অনেক প্রশংসনীয় রায় দিয়েছেন। দেখা গেছে, সেসব রায় সঠিকভাবে বাস্তবায়ন কিংবা বাস্তবায়নের উদ্যোগ পর্যন্ত নেয়া হয়নি। সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দেশ অনেক দূর এগিয়ে যেত। পুলিশ হেফাজতে আসামীর মৃত্যুও বিচার বহির্ভূত হত্যাকা- এবং বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার ও নির্যাতনের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে সারা দেশের মানুষের কাছে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উচ্চ আদালত এবং সর্বোচ্চ আদালত গণমানুষের স্বার্থ রক্ষায় ও নিরাপত্তা বিধানের বিষয়টি আমলে নিয়ে সংবিধান পরিপন্থী এই বেআইনী অপকর্মের প্রতিকার কীভাবে সমাধান করা যায় তা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করে নির্দেশনা দিয়েছেন। আদালতের এই রায়ে দেশের জনগণের মনে স্বস্তি, শান্তি ও আশাবাদ জেগে উঠেছে। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয়, আদালতের এই রায় আজ পর্যন্ত কার্যকর করা হয়নি। বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার এবং রিমান্ডে নেয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে চলেছে। এরপরও সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা কিছুতেই হচ্ছে না। এটা নিঃসন্দেহে আদালত অবমাননার শামিল। ওদিকে রায়ের কিছু নির্দেশনার সংশোধন চেয়ে সরকারের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে পুনর্বিবেচনা করার আবেদন করা হয়েছে। এর বিপক্ষে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, সরকারের পুনর্বিবেচনার আবেদন কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সর্বোচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছেন তা সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকারের উচিত রায় বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। রায় পালনের ব্যাপারে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, যারা আইন বা আদালতের রায় বা আদেশ সরাসরি অমান্য করছেন, তাদের জন্য কঠিন প্রতিকারের ব্যবস্থা অবশ্যই রয়েছে। আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আদালত অবশ্যই আরো একটা কঠোর আদেশ দিতে পারেন। প্রশ্ন হচ্ছে, সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের আলোকে সবকিছু সুবিবেচনা করেই তো চূড়ান্তভাবে এ রায় দিয়েছেন। এ রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িংত্ব ও কর্তব্য নয় কি? সরকার ও তার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা আইন ও আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবেন না, তারা তাদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়েই চলবেন, এ ক্ষমতা তারা পেলেন কোথায়? সর্বোচ্চ আদালতের এমন অবমাননা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে কী? এ ধরনের প্রবণতা সরাসরি প্রচলিত আইন, আদালত ও সংবিধান লংঘন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মারাত্মক ক্ষতিকর হুমকি হয়ে দেখা দেবে। আইন ও আদালতের এমন উপেক্ষা জনগণের মনেও নিদারুণ ক্ষোভের সৃষ্টি করবে। জনগণ নিশ্চয়ই মনে করবে, যেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিজেই আইন আদালত মানে না, সেখানে জনগণের সুবিচার পাওয়া কীভাবে সম্ভব?
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার, পাইকারিহারে গণগ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে গিয়ে বর্বর নির্যাতনের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই সারা দেশের জনগণের মনে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভয় ও আতঙ্ক হয়ে বিরাজ করছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইনকে হাতে তুলে নিয়ে ইচ্ছামাফিক কখন কাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে এবং রিমান্ডে নিয়ে গিয়ে বর্বর নির্যাতন চালাবে তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না।
দেশের সর্বসাধারণকে এই ভয়, আতাঙ্ক, নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্তি দিতেই এবং মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সর্বোচ্চ আদালত এক ইতিহাস সৃষ্টিকারী রায় ও নির্দেশনা দিয়েছেন। আদালতের এ রায় সব মহলেই প্রশংসিত হয়েছে। এ রায় বাস্তবায়নে সরকার ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের সমস্যা বা সংকট কোথায়, তা আমাদের বোধগম্য নয়। কারণ রায়ে স্পষ্ট করেই আসামী গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেয়ার আইনী নিয়ম বিধি ব্যাখ্যা করে বলে দেয়া হয়েছে। এ রায় নিয়ে কারো কোন প্রকারের দ্বিধা-সংশয় থাকার বা কালক্ষেপণ করার কোন যুক্তিই থাকতে পারে না। সঙ্গত কারণে আমরা মনে করি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার ও সরকারি প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল সবাইকে আইন মানতে হবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের নির্দেশনা প্রতিপালন করা সকলের জন্য অবশ্যই বাধ্যতামূলক। আমরা মনে করি জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে সর্বোচ্চ আদালতের রায় ও নির্দেশনা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করবে এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সর্বোচ্চ আদালত যে যুগান্তকারী আদেশ ও গাইড লাইন দিয়েছেন তা প্রতিপালনের নিমিত্তে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয় মনিটরিংয়ের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নাগরিক মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সর্বোচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছেন তা অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে। তা না হলে দেশের মানুষ যেমন তার আইনগত অধিকার কিছুতেই ফিরে পাবে না, ঠিক তেমনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আইন অমান্যের বর্বর দুঃখজনক ঘটনার শিকার কেবল হতেই থাকবে বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ