ঢাকা, বুধবার 29 March 2017, ১৫ চৈত্র ১৪২৩, ২৯ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রসঙ্গ

তারেকুল ইসলাম : প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন দিল্লী সফর নিয়ে দেশের জনগণ ভীষণ উদ্বিগ্ন, বিশেষত বাংলাদেশের সাথে ভারতের প্রস্তাবিত ২৫ বছর মেয়াদী এক প্রতিরক্ষা চুক্তির ব্যাপারে। উদ্বিগ্নতার বড় কারণ হচ্ছে, না ভারত না বাংলাদেশ কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত চুক্তিটির ব্যাপারে খোলাসা করছে না। কোনো বহির্দেশের সাথে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক যা-ই হোক না কেন, সেটার বিষয়াবলী জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। যদি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থ ক্ষুণ্নই না হয়, তাহলে এত লুকোচুরি ও গোপনীয়তা কেন? বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রতি হুমকিস্বরূপ কোনো গোপন চুক্তি এদেশের জনগণ মেনে নেবে না। কূটনৈতিক সূত্রমতে, আমাদের সরকার প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনো চুক্তি নয়, বরং এ ব্যাপারে একটি এমওইউ তথা সমঝোতা স্মারক পর্যন্ত সম্মত হয়েছে; অথচ ভারত ক্রমাগত চাপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিই করতে চাচ্ছে। এই যখন দ্বিমতের সংকট, তখন আমাদের সরকারের উচিত জনগণের ওপর নির্ভর করা। এ বিষয়ে জনগণের মতের প্রতিফলন ঘটালে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা আমলে নিলে নিঃসন্দেহে সরকার ভারতের চাপ ও আধিপত্যবাদী আচরণ উপেক্ষা করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ না হওয়ার মতো রাজনৈতিক হিম্মত ও শক্তি খুঁজে পাবে। আমরা মনে করি, ঠিক এই স্পর্শকাতর মুহূর্তে বিশেষত দিল্লী সফরের পূর্বেই প্রধানমন্ত্রীর মূল কর্তব্য হলো, দেশের গণমানুষের মতামত, ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষাকে প্রাধান্য দেয়া; অন্যথায় ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ে’র মতো অবস্থা হবে। আর এর চরম মাশুল দিতে হবে বাংলাদেশের জনগণকেই।
বাংলাদেশ সরকার চায় একটি এমওইউ-যা হবে কম আনুষ্ঠানিক (less formal) এবং এর কোনো সময়সীমা থাকবে না। প্রিন্ট ও ব্রডকাস্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরাখবর ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, ভারত ঠিক দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা চুক্তি করতেই নাছোড়বান্দা অবস্থানে রয়েছে, যেন বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চেতনার বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিয়ে এই চুক্তি করতে বাধ্য করা। এই চুক্তির বিষয়টি বাংলাদেশের কাছে প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর, বিগত বছরের ৩০ নবেম্বর বাংলাদেশে তার দুইদিনের সফরকালে। এই চুক্তিটি এতই স্পর্শকাতর যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভারতের কোনো প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে এই প্রথম বাংলাদেশে আসতে হলো। এরপর চলতি বছরের গেলো ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব সুব্রাহ্মনিয়াম জয়শঙ্কর বাংলাদেশে এলে আমাদের সরকার তাকে এ বিষয়ে চুক্তি নয়, বরং এমওইউ করতে রাজি আছে বলে জানায়। এমনকি এ বিষয়ে উভয় দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে লাগাতার আলোচনা হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর দুই বার পেছানোও হয়েছিল। শেষপর্যন্ত আগত এপ্রিল মাসের ৭-১০ তারিখ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নির্ধারণ করা হয়। প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত চুক্তি নাকি এমওইউ-উভয় দেশ এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্তভাবে একমত হতে পারেনি, অর্থাৎ এখনো সরকার পর্যায়ে আলোচনা চলমান। বিভিন্ন কূটনৈতিক বরাতে জানা যাচ্ছে, হাসিনা ও মোদির বৈঠক চলাকালেও এই আলোচনা চলবে এবং তখনই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে যে, এটি কি চুক্তি না এমওইউ হবে।
ভারতের প্রস্তাবিত এই দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা চুক্তিতে থাকতে পারে এমন কয়েকটি বিষয় ইতোমধ্যে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে উভয় দেশের মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে এবং এগুলো নিয়েও চলছে জোর আলোচনা-সমালোচনা। এই চুক্তি অনুযায়ী লাইন অব ক্রেডিটে বাংলাদেশকে ভারত ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে-এই শর্তে যে ভারত থেকে সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদি (military hardware) কিনতে হবে। এছাড়াও ভারতীয় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কাছে বাংলাদেশের বাহিনীরা প্রশিক্ষণ নিবে এবং বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সাথে ভারত প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ গড়ে তুলবে। বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সাথে ভারতের এহেন আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদীমূলক আচরণ দেখে দেশবাসী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত। যেচে এসে গায়ে পড়ে প্রতিরক্ষা চুক্তির নামে ভারতের এসব চাপিয়ে দেয়া আধিপত্যবাদী আবদারগুলো এদেশের জনগণ মানতে বাধ্য নয়।
বিশ্বপরাশক্তি চীন ও রাশিয়ার তুলনায় অস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রির মুরোদ যে এখনো ভারতের বিশেষ একটা হয়ে ওঠেনি তা খোদ ভারতের বিবেচক মহলও জানে। সম্প্রতি মিয়ানমার ও নেপালের কাছে ভারতের অতি নিম্নমানের অস্ত্রশস্ত্র বিক্রির বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও ভারতীয় সমরাস্ত্রের প্রতি আগ্রহী নয়। আর তাছাড়া ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের সবচে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হচ্ছে চীন। চীনের অস্ত্র তুলনামূলকভাবে দামে কম এবং পরিচালনা করাও সহজ। দীর্ঘদিন চীন থেকে ক্রয়কৃত অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়ায় এখন নতুন ধরনের সমরাস্ত্র আনলে সেগুলো পরিচালনা করাও কঠিন হবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য।
অন্যদিকে, এই চুক্তি অনুযায়ী ভারতীয় বাহিনীরা বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবে-এটা অত্যন্ত হাস্যকর। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, ২০০১ সালের ১৫ এপ্রিল রাতে স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় বিএসএফ বাহিনী কর্তৃক অবৈধভাবে দখল করে রাখা বাংলাদেশের পদুয়া গ্রাম কোনো গোলাগুলী ও রক্তপাত ছাড়াই পুনরুদ্ধার করেছিল আমাদের তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) এবং এর প্রতিক্রিয়ায় প্রতিশোধ নিতে ১৮ এপ্রিল ভারতীয় বর্ডার বাহিনী বিএসএফ শত শত সৈন্য নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে বড়াইবাড়ীতে আগ্রাসন চালায়; কিন্তু আমাদের চৌকস বর্ডার বাহিনী বিডিআর অল্প পরিমাণে সৈন্য নিয়ে অত্যন্ত চতুর কৌশলে সেই ভারতীয় আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছিল। এই প্রতিরোধযুদ্ধের সম্মুখ থেকে শত শত ভারতীয় সৈন্য কাপুরুষের মতো সেদিন পালিয়ে গিয়েছিল। বিডিআর বাহিনীর আক্রমণে বিএসএফ-এর ১৬ জনেরও বেশি সৈন্য নিহত হয়েছিল আর বিডিআর-এর মাত্র দু’জন সৈন্য শাহাদাতবরণ করেছিলেন। পরে বিএসএফ-এর নিকট তাদের লাশগুলো ফিরিয়ে দেয়া হয়। দৈনিক যুগান্তরকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ.ল.ম. ফজলুর রহমান বলেছিলেন, ‘বিনা কারণে রৌমারী সীমান্তে বিএসএফ’র গুলীবর্ষণ ও প্রাণহানির জন্য ভারতকে ক্ষমা চাইতে হবে। ক্ষতিপূরণ দিতে হবে’ (১৮ এপ্রিল, ২০০১)। বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে রাতের অন্ধকারে কাপুরুষের মতো শত শত ভারতীয় সৈন্যের অবৈধ অনুপ্রবেশ, এলোপাতাড়ি গুলী ছোঁড়া, বিডিআর সৈন্যদের হত্যা এবং বাংলাদেশের গ্রাম লুট ও জ্বালিয়ে দেয়ার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক আদালতে ভারতের বিরুদ্ধে মামলা করার দাবি উঠেছিল দেশব্যাপী। এরপর থেকে আমাদের বিডিআর বাহিনীর ওপর ভারতের ক্ষোভ রয়ে গেছে; যার ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো মনে করে, ২০০৯ সালে সংঘটিত ‘বিডিআর বিদ্রোহ’ আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়ার পরিকল্পিত চক্রান্তের অংশ মাত্র। বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় বাংলাদেশের অগণিত সেনা অফিসারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এমনকি মুক্তিযুদ্ধেও সেই পরিমাণ সেনা অফিসার আমরা হারাইনি। সুতরাং বাংলাদেশের বাহিনীসমূহ এইসব ইতিহাস ভুলে গিয়ে এবং তাদের শাহাদাতবরণকারী ভাইদের রক্তের সাথে বেঈমানি করে পরাজিত শত্রুপক্ষের বাহিনীদের কাছে প্রশিক্ষণ নেয়ার মতো আহাম্মকি করবে না বলেই আমরা বিশ্বাস করি। এছাড়া ২০০০ সালে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের মধ্যে সংঘটিত ‘নাফযুদ্ধ’-এ মিয়ানমারের ৬০০শ’ সৈন্য নিহত হয়েছিল। বাংলাদেশের কাছে মিয়ানমার করুণ গোহারা পরাজয় স্বীকার করেছিল। সুতরাং এইসব সাফল্য ও সক্ষমতা বিবেচনায় বাংলাদেশের বাহিনীদের কোনো প্রয়োজন নেই ভারতীয় বাহিনীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার।
ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে বলা হচ্ছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে দুটো সাবমেরিন কেনায় ভারত কর্তৃপক্ষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। ভারত মনে করছে, বাংলাদেশের কাছে চীনের সাবমেরিন বিক্রি হচ্ছে ভারতকে ঘিরে ফেলার জন্য চীনের পরিকল্পনার একটি অংশ। বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্রয় ইস্যুতে ভারতের এই ধরনের অভিযোগমূলক ব্যাখ্যাকে ‘উদ্ভট’ বলে খোদ ভারতীয় একটি ম্যাগাজিনে এক মতামত কলামে লেখা হয়েছে, “The Indian analysts have concluded that the sale of the submarines is part of a Chinese strategy to encircle India. It is a bizarre explanation, to say the least. Consider the following. Bangladesh is the buyer here – not a recipient – and, equally, China is the vendor – not donor. Beyond doubt, $406 million is a lot of money for Bangladesh’s economy, while for China this is a lucrative business deal. If Bangladesh is willing to spend such big money on an arms purchase, it is clearly based on a deliberate, well-considered, forward-looking decision. Also, it must be a decision that carries the approval of the highest level of leadership” (MK Bhadrakumar, Scroll.in, Nov 20, 2016). (অর্থাৎ, ভারতীয় বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, এই সাবমেরিন বিক্রি ভারতকে চীনের ঘিরে ফেলার কৌশলের অংশ। ন্যূনতম বলতে গেলে এটি একটি উদ্ভট ব্যাখ্যা। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করুন যে, এখানে বাংলাদেশ হচ্ছে ক্রেতা, কিন্তু গ্রাহক নয়; একইভাবে চীন হচ্ছে বিক্রেতা, দাতা নয়। সন্দেহ নেই, ৪০৬ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল কিছু; পক্ষান্তরে চীনের কাছে এটি দারুণ এক লাভজনক ব্যবসা। কোনো সমরাস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ অর্থ যদি বাংলাদেশ ব্যয় করতে চায়, তাহলে সুস্পষ্টভাবে এটি একটি সুচিন্তিত, বিবেচিত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। সাবমেরিন ক্রয়ের সিদ্ধান্তটিও নিশ্চয়ই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদন পেয়েছিল।) 
মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিন বছর আগে অর্থাৎ বিগত ২০১৩ সালেই বাংলাদেশ চীনকে সাবমেরিন ক্রয়ের এলপিও (Letter of Purchase Order) পাঠিয়েছিল এবং সাবমেরিন পরিচালনার প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য বাংলাদেশের সেনা ও নৌ বাহিনীর একদল অফিসার প্রায় এক বছর ধরে চীনে ছিলেন। এসব খবরাদি কি ভারত জানতো না? অবশ্যই জানতো; কিন্তু আমরা মনে করি, চীন ইস্যুটি ভারতের একটি অজুহাত এবং এই অজুহাতকে ব্যবহার করে এবং চাপ প্রয়োগ করে হলেও বাংলাদেশের সাথে একটা ডিফেন্স প্যাক্ট করাই মূল দুরভিসন্ধি। বাংলাদেশের সাথে এরকম একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করার মতলব ভারতের অনেক আগে থেকেই ছিল, কিন্তু সুযোগ খুঁজে পাচ্ছিল না। এবার চীন থেকে সাবমেরিন কেনার ইস্যুতে সেই সুযোগ বানিয়ে নিচ্ছে ভারত। এখন কথা হচ্ছে, ভারত কী উদ্দেশ্যে এরকম একটি ডিফেন্স প্যাক্ট করতে চায়, আর এটা যে সম্পূর্ণ ভারতের স্বার্থেই, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের চাওয়া-পাওয়ার কোনো মূল্য যে ভারতের কাছে নেই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যাই হোক, বাংলাদেশের সাথে ভারত মূলত এমন এক ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে চায়, যার মাধ্যমে সামরিক রসদ, অস্ত্রশস্ত্র ও সৈন্যবাহিনী ভারত তার উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে সহজে, সুলভে ও যথাসময়ে বাংলাদেশের সমতল রাস্তা (ট্রানজিট করিডোর) ব্যবহার করে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পাবে। ভারতের এই রাজ্যগুলোতে স্বাধীনতার দাবিতে দশকের পর দশক সশস্ত্র আন্দোলন চলছে এবং এই সশস্ত্র আন্দোলনগুলো দমাতে ঐ রাজ্যগুলোতে ভারত তার সামরিক রসদ ও অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ এবং সৈন্যবাহিনীর স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অনেকটা বেকায়দায় আছে। সাধারণত সেখানে পৌঁছতে শিলিগুঁড়ি করিডোরের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি রুট ছাড়া ভারতের আর গত্যন্তর নেই; ফলে সেক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থা হয়ে পড়ছে ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। অথচ বাংলাদেশের সমতল ভূমি তথা ট্রানজিট করিডোর ব্যবহার করে সহজে, সুলভে এবং যথাসময়ে ভারত তার সামরিক রসদ ও সৈন্যবাহিনী পাঠাতে পারবে। একইসঙ্গে চীনের সাথে ভবিষ্যতে কখনো সীমান্ত নিয়ে ঝামেলা বা যুদ্ধ হলে ভারত তার উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে রক্ষা করতেও সক্ষম হবে। সুতরাং এইসব বিবেচনায় ভারত যেকোনো মূল্যে এরকম একটি ডিফেন্স প্যাক্ট করতে চায়। এ বিষয়ে উইকলি হলিডে’র একটি কলামে লেখা হয়েছে, “The various militant groups (in Northeast Indian States) reportedly with external support are a constant threat to the Indian government. In the event of any escalation of the insurgency, it is natural that India would invoke the proposed defence pact to transport troops and arms through the transit corridor. This will no doubt endanger security and sovereignty of Bangladesh provoking the insurgents to trespass into Bangladesh territory. Given the urgency of the defence pact for India for transporting troops and arms through the available transit corridor, analysts have warned that India may even apply a stick and carrot policy to achieve its objectives” (Shamsuddin Ahmed, Weekly Holiday, March 10, 2017). (জানা যায়, বহির্শক্তির কাছ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ভারত সরকারের জন্য অব্যাহত হুমকি হয়ে উঠেছে। সেখানে কোনো ধরনের বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান তীব্রতর হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এটা স্বাভাবিক যে, বাংলাদেশের সহজলভ্য ট্রানজিট করিডোরের মধ্যদিয়ে সৈন্যবাহিনী ও সমরাস্ত্র পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারতের জন্য এই প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির দরকার হবে। সন্দেহ নেই, এটা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করবে, কারণ বিদ্রোহীরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনধিকার প্রবেশ করে হামলা করতে উত্তেজিত হয়ে উঠবে। আর যেহেতু সুলভ ও সহজ ট্রানজিট করিডোরের মধ্যদিয়ে সৈন্যবাহিনী ও সমরাস্ত্র পাঠানোর জন্য এরকম একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি ভারতের জন্য অতীব জরুরি, সেহেতু বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এমনকি ভারত তার উদ্দেশ্য হাসিলে খুব সম্ভবত ‘লাঠি ও গাজর নীতি’ প্রয়োগ করতে পারে।) এই লাঠি ও গাজর নীতি মানে হচ্ছে, আপনাকে হয় গাজর বা মুলা ঝুলিয়ে বশ মানানো হবে, আর নয়তো পেছন থেকে লাঠির বাড়ি দিয়ে কথা মানতে বাধ্য করা হবে। এই লাঠি ও গাজর নীতিতে এতদিন আওয়ামী শাসনামলে বাংলাদেশকে গাজর আর মুলা ঝুলিয়ে ভারত হরেদরে নানাবিধ সুবিধা আদায় করে নিয়েছে (বিনিময়ে বাংলাদেশের পাওনা এখনো অশ্বডিম্ব), এখন এই প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে কথা না শুনলে পেছন থেকে লাঠির বাড়ি প্রয়োগ করা হবে। আমাদের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন খুবই সন্নিকটে, ঠিক এমন একটি সময়কে বেছে নিয়েছে ভারত। আর চীন থেকে সাবমেরিন ক্রয় ইস্যুটি ভারতের একটি মোক্ষম অজুহাত; সুতরাং হয় ক্ষমতা না হয় চুক্তি সই। সম্প্রতি দেশজুড়ে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে এবং বিভিন্ন জঙ্গিবিরোধী অভিযানে বেশ কয়েকজন জঙ্গি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও নিহত হয়েছে। এমতাবস্থায় বিভিন্ন রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ অভিযোগ করছে যে, সরকার জঙ্গিবাদের ট্রাম্পকার্ড ব্যবহার করে ভারতের প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির পক্ষে ন্যায্যতা তৈরি করছে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি যে-পর্যায়েই যাক না কেন এবং এমওইউ’র পরিবর্তে যদি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আমাদের সরকার প্রধান সই করতে বাধ্য হন, তাহলে বাংলাদেশের জনগণ মানবে না। তারা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়।
লেখক : কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। Email: tareqislampt@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ