ঢাকা, বুধবার 29 March 2017, ১৫ চৈত্র ১৪২৩, ২৯ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রকৃতির স্বর্গ-বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন

অধ্যক্ষ ফোরকান আলী : বাংলাদেশের দক্ষিণ অংশে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের ব-দ্বীপ এলাকায় অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলার অংশবিশেষ জুড়ে বাংলাদেশের সুন্দরবন বিস্তৃত। পরস্পর সংযুক্ত প্রায় ৪শ’ নদী-নালা, খালসহ প্রায় ২শ’টি ছোট বড় দ্বীপ ছড়িয়ে আছে। সুন্দরবন নাম হওয়ার দু’ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। একটি সম্ভবত সুন্দরী বৃক্ষের আধিক্যের কারণে। অপরটি সাগরের বন কিংবা বনভূমির আদিবাসী চন্দ্রবেদে উদ্ভুত। ১৯২৮ সালে তৎকালীন বৃটিশ সরকার সুন্দরবনের স্বত্বাধীকার অর্জন করে। এলটি হজেয ১৮২৯ সালে সুন্দরবনে প্রথম জরিপ পরিচালনা করেন। ১৮৭৮ সালে সমগ্র সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা দেয়া হয়। ১৮৭৯ সালে সমগ্র সুন্দরবনের দায়িত্ব বন বিভাগের উপর ন্যস্ত করা হয়। সুন্দরবনের প্রথম বিভাগীয় কর্মকর্তার নাম এম, ডাব্লিউ, গ্রীন। তিনি ১৮৮৪ সালে সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। তখন বনকে ৭৫টি কম্পার্টমেন্টে ভাগ করা হয়। যার ৫৫টি বাংলাদেশে পড়েছে। বাংলাদেশ কম্পার্টমেন্টে নদীসহ সুন্দরবনের অবস্থান ৫ লাখ ৭৭ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমির উপর। সুন্দরবনে রয়েছে নানা প্রজাতির বৃক্ষ, লতা, গুল্ম এবং বিচিত্র প্রাণীর বাস। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আবাস এখানেই। অধিকন্ত এ বনভূমিতে রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৩০ প্রজাতির পাখি, ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর এবং বন এলাকার নদী নালায় প্রায় ৪শ’ প্রজাতির মাছ। রয়েছে মধু, মোমের বিশাল ভান্ডার। যা ইতিপূর্বে দেশের রাজস্ব আদায়ের সিংহভাগ পূরণ করতো। কিন্তু অপরিণামদর্শী পরিকল্পনা, অযোগ্য ব্যবস্থাপনা, অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারি ও সর্বোপরি চোর লুটেরাদের দাপটে সুন্দরবনের বনজ সম্পদ উজাড় হতে চলেছে। সুন্দরবন চোর, ডাকাত আর মাফিয়া চক্রের চরণভূমিতে পরিণত হয়েছে। ফলে একদিকে বনের ভারসাম্য হারাচ্ছে, বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু ভৌগোলিক দিক থেকে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে সমগ্র বাংলাদেশ। এসব দিক বিবেচনা করে বন বিভাগের সাথে পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা নামে নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। ইতিপূর্বেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমিরসহ বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু ও পাখ-পাখালী রক্ষার জন্য সুন্দরবনের ৩টি অংশের মোট ৮টি কম্পার্টমেন্টের ১ লাখ ৩৯ হাজার হেক্টর এলাকাকে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এসব কম্পার্টমেন্টের বনজ সম্পদ সংরক্ষণ করার সঠিক কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে বৈধ অনুমতির আড়ালে অবৈধ পন্থায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বন উজাড় করে চলেছে। একই সাথে অভয়ারণ্যের প্রাণীকূলের জীবন হরণের ঘটনা ও নিত্যদিনের। এতে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ সকল প্রজাতির জীবজন্তু বিলুপ্তির। সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের নয়। এটি গোটা বিশ্বের একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সম্পদ। যা গোটা বিশ্বের ভৌগোলিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এমন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদকে রক্ষায় এগিয়ে এসেছে ইউনেসকো। ইউনেসকোর বিশ্ব সম্পদ ও ঐতিহ্য কমিটি বাংলাদেশ সুন্দরবনকে ৭৯৮তম বিশ্ব সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সকল সম্পদকে রক্ষা করার জন্য ইউনেসকো সকল প্রকার আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে। তিনটি অভয়ারণ্যের মধ্যে পূর্ব অভয়ারণ্যটি ৪,৫ ও ৬ কম্পার্টমেন্টের কটকা, কচিখালী ও সুপতি ফরেস্ট অফিস নিয়ে গঠিত। এই অভয়ারণ্য ৩১ হাজার ২২৭ হেক্টর বনভূমি নিয়ে বেষ্টিত। এখানে কটকা ও কচিখালীতে বন বিভাগের দুইটি রেস্ট হাউজ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে পর্যটকদের জন্য সুউচ্চ টাওয়ার। যেখানে দাঁড়িয়ে সুন্দরবনের মনোমুদ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। কটকা ও কচিখালীতে সমুদ্রতীরের বিস্তৃত বেলাভূমির বালুকারাশি মন জুড়ানো সৌন্দর্য ধারণ করে আছে। পূর্ব অভয়ারণ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অন্য যে কোন এলাকার চেয়ে এখানকার সুন্দরী ও কেওড়া গাছগুলো তুলনামূলক লম্বা হয়। এছাড়া এই অভয়ারণ্যটি হরিণ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুমিরের প্রচুর সমারোহ। তবে টাইগার পয়েন্ট বলতে এক নামে এ অভয়ারণ্যকে বোঝায়। দ্বিতীয় অভয়রাণ্যটি দক্ষিণ অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। এই কম্পার্টমেন্ট ৩৬ হাজার ৯৭০ হেক্টর বনভূমি নিয়ে গঠিত। এ অঞ্চলের অদূরেই ‘পুতনীদ্বীপ’ বা পুটনি আইল্যান্ড অবস্থিত। যা ম্যানগ্রোভ ইকোলজিক্যাল স্টাডির জন্য উপযুক্ত বনভূমি। নীলকমল ও দোবাকি নামে এ অভয়ারণ্যে বন বিভাগের দুটি স্টেশন রয়েছে। এখানে হিরণ পয়েন্ট বা হরিণ পয়েন্ট অবস্থিত। এ অঞ্চলে ‘ক্যানোপি’ উচ্চতার সৌন্দর্য এ অভয়ারণ্যে দেখা যায়। এই এলাকাটি হরিণের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও এখানে বাঘ, কুমির, পাখিসহ অন্যান্য প্রজাতির জীবজন্তু রয়েছে। নীলকমল এলাকায়ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার রয়েছে। সেখানে বসে সুন্দরবনের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ঝাঁক ঝাঁক নয়নাভিরাম চিত্রাহরিণেরও সাক্ষাৎ মিলে। তৃতীয় অভয়ারণ্যটি পশ্চিম অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ অভয়ারণ্যটি ভারতীয় সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের সাথে সংযুক্ত। এই কম্পার্টমেন্ট ৭১ হাজার ৫০২ হেক্টর বনভূমি নিয়ে গঠিত। নোটাবেকি, পুস্পকাটি এবং মান্দারবাড়িয়া ফরেস্ট স্টেশন ৩টি এ অভয়ারণ্যে অবস্থিত। এই এলাকা সুন্দরবনের মধ্যে অধিক লবণাক্ততা এলাকা হিসেবে পরিচিত। যে কারণে এ অঞ্চলে সুন্দরী গাছের বৃদ্ধি কম। তবে এ এলাকায় গরান গাছের বৃদ্ধি বেশি। এ অভয়ারণ্যে মূল্যবান পশুর এবং ধুন্দুলের ও আধিক্য রযেছে। সমগ্র সুন্দরবনের এই অঞ্চলেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা সব থেকে বেশি। এছাড়া দক্ষিণ মান্দারবাড়িয়া রয়েছে দীর্ঘ বালুকাময় বেলাভূমি। সুন্দরবনের অভয়ারণ্য বিশ্বের সকল সৌন্দর্য পিপাসু পর্যটকদের অবলোকনের ব্যবস্থা করা হয়ছে। প্রতিবছর বহু দেশী-বিদেশী পর্যটক, গবেষক, ছাত্র-শিক্ষক সাংবাদিক সুন্দরবন ভ্রমণে আগমন করে। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্যপ্রাণীর আনাগোনা ও সমুদ্র সৈকত পর্যটকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। কটকা, কচিখালী, নীলকমল, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর, মান্দারবাড়ীয়া, শেখেরটেক মন্দির প্রভৃতি ট্যুরিস্ট স্পটে পর্যটকদের আগমন ঘটে। এখানে বনের ভিতর দিয়ে কাঠের তৈরি পথ, গোল ঘর, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, কুমির ও হরিণের লালন পালন কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া ম্যানগ্রোভ আরবোরেটাম প্রভৃতি অবাকাঠামো সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করা হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে এখানে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে পর্যটকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। (তথ্য সূত্র সুন্দরবন বিভাগ)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ