ঢাকা, বৃহস্পতিবার 30 March 2017, ১৬ চৈত্র ১৪২৩, ০১ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জঙ্গিবাদ নির্মূলে খালেদা জিয়ার আহ্বান

বিএনপির চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের সমস্যাকে জাতীয়ভাবে মোকাবিলার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ২৮ মার্চ এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ এক বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশও এই সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ভয়ংকর এ সমস্যাকে নির্মূল করতে হলে ক্ষমতাসীনদের দোষারোপের রাজনীতি পরিত্যাগ করতে হবে এবং এ উদ্দেশ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সিলেটের শিববাড়ি এলাকায় জঙ্গি বিরোধী অভিযানে অসাধারণ সাফল্য দেখানোর জন্য নেতৃত্বদানকারী সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডোসহ প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতি অভিনন্দন জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় জঙ্গিবাদের নামে সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত সন্ত্রাসী কর্মকা-ে দেশবাসীর মতো তিনি নিজেও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের অবশ্যই প্রতিহত ও নির্মূল করতে হবে এবং এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে অগ্রসর হতে হবে। জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে তার জানানো আহ্বানের পুনরাবৃত্তি করে খালেদা জিয়া বলেছেন, বিভিন্ন উপলক্ষে এই আহ্বান জানিয়ে এলেও ক্ষমতাসীনরা সে আহ্বানের প্রতি এ পর্যন্ত চরম উপেক্ষা দেখিয়েছেন।
তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রসঙ্গক্রমে আরো বলেছেন, একথা বুঝতে হবে যে, কেবলমাত্র দমন অভিযান চালিয়ে সমাজ থেকে জঙ্গিবাদের শিকড় পুরোপুরি উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। দু’-একটি দমন অভিযানের সাফল্যেও আত্মপ্রাসাদ লাভ করার কোনো সুযোগ নেই। মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে গণতন্ত্রহীনতা, জবাবদিহিতাহীন শাসন, দুর্নীতি, সুবিচারের অভাব এবং যুব সমাজের বেকারত্বই জঙ্গিবাদ বিস্তারের প্রধান কারণ। সুতরাং জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে চাইলে এসব কারণকে দূর করতে হবে। এজন্য জনগণকে আস্থায় নিয়ে তাদের সক্রিয় সহযোগিতা নিতে হবে। অন্যদিকে বর্তমানে স্পর্শকাতর একটি সময়ে জঙ্গিবাদের আকস্মিক বিস্তার এবং দমন অভিযানে স্বচ্ছতার অভাবে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। সকল প্রশ্ন ও সন্দেহ-সংশয় দূর করার পাশাপাশি অবিলম্বে বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়ে বেগম খালেদা জিয়া স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ও বিস্তার ঘটেছিল। কিন্তু বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ চার দলীয় জোট সরকার কঠোর হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছিল। শুধু তা-ই নয়, জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেটওয়ার্কও সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দিয়েছিল। জোট সরকার শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের জীবিত অবস্থায় গ্রেফতার করে প্রকাশ্য বিচারের মাধ্যমে প্রাণদণ্ড দেয়াসহ তাদের শাস্তিও কার্যকর করেছিল। সে সময় কারো ব্যাপারে বা কোনো পর্যায়েই প্রশ্ন বা সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হয়নি। অন্যদিকে বর্তমান সরকার সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর ফলে একদিকে জনগণ অন্ধকারে থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে জনমনে সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। এমন অবস্থায় দোষারোপের রাজনীতি ছেড়ে জনগণকে আস্থায় নিয়ে এবং জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে জঙ্গিবাদের সমস্যা মোকাবিলা করা দরকার বলে মন্তব্য করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। এ উদ্দেশ্যে সরকারের পাশাপাশি জনগণের প্রতিও জঙ্গিবাদ নির্মূলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আমরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এই আহ্বান এবং তার বিবৃতির মূল কথাগুলোকে সময়োচিত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। বলাবাহুল্য, এর কারণ আসলে সরকারের রহস্যময় কার্যক্রম। যেমন সর্বশেষ সিলেটের ঘটনায় দেখা গেছে, মাত্র চার-পাঁচজন কথিত জঙ্গিকে গ্রেফতার বা হত্যার জন্য প্রায় পাঁচ দিন ধরে অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডোরা থাকায় এতো বিলম্বের কারণে জনমনে সঙ্গত প্রশ্ন ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। কেননা, দক্ষ ও দুর্ধর্ষ প্যারা-কমান্ডোদের জন্য এ ধরনের অভিযান অনেকটা ডাল-ভাতের মতো সাধারণ বিষয় হওয়ার কথা। খালেদা জিয়াও কিছুটা ঘুরিয়ে একই কথা বলেছেন। ঘটনাপ্রবাহে সামনে চলে আসা অন্য কিছু প্রশ্নও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিতজনেরা সত্যিই জঙ্গি ছিল কি না- সে প্রশ্ন এসেছে ঘুরে-ফিরে। এর কারণ, তাদের কারো বিরুদ্ধেই আগে থেকে আইনানুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। না তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, না করা হয়েছে প্রকাশ্যে বিচার। অন্যদিকে চারদলীয় জোট সরকারের সময় শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ চিহ্নিত সকল জঙ্গি-সন্ত্রাসীকে জীবিত অবস্থায় গ্রেফতার করে প্রকাশ্যে বিচার করার পর প্রাণদ-সহ আদালতের দেয়া রায় অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছিল। এ কথাটাই বলেছেন খালেদা জিয়া।
আমরাও মনে করি, ঢালাওভাবে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে অভিযানের আড়ালে হত্যা করার পরিবর্তে সন্দেহভাজন সকলকেই প্রথমে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা দরকার। তার বা তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও প্রমাণ করা দরকার। এটাই আইন ও গণতন্ত্রের বিধান। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের আমলে সেটা করা হচ্ছে না বলেই বেগম খালেদা জিয়া তার নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের নেয়া পদক্ষেপের উদাহরণ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আইন, সংবিধান ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও আমরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কারণ, সুচিন্তিতভাবে তৈরি করা শোরগোলের আড়ালে অনেক নিরীহ মানুষেরও জঙ্গি হিসেবে অশুভ পরিণতির অসহায় শিকার হওয়ার আশংকা রয়েছে। সে আশংকা দিন-দিন বেড়েও চলেছে। এ ধরনের সম্ভাবনা ও আশংকার কারণেই সরকারের উচিত প্রতিটি বিষয়কে প্রকাশ্যে নিয়ে আসা এবং জনগণকে তথ্য-প্রমাণসহ অবহিত করা। সরকারকে একই সাথে জাতীয় ঐক্যের আহ্বানের ব্যাপারেও ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে হবে। কারণ, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ আসলেও একটি বৈশ্বিক সমস্যা। জনগণকে যুক্ত করে ও তাদের সহযোগিতা নিয়ে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে এর মোকাবিলা করা গেলেই শুধু সমস্যার স্থায়ী সমাধান আশা করা যেতে পারে। আমরা তাই বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ