ঢাকা, বৃহস্পতিবার 30 March 2017, ১৬ চৈত্র ১৪২৩, ০১ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসবাদের মর্মকথা

বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে বলেছেন, বুধবার (২২ মার্চ) ওয়েস্ট মিনিস্টার ব্রিজ ও পার্লামেন্ট এলাকায় সন্ত্রাসী হামলাকে ‘ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ’ বলা ভুল। বরং একে বলতে হবে ‘ইসলামিস্ট সন্ত্রাসবাদ’ বা ইসলামবাদী সন্ত্রাসবাদ। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকালে হাউস অব কমন্সে বিবৃতি দেয়ার পর এক এমপির প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন তেরেসা মে। কনজারভেটিভ দলের এমপি মাইকেল ট্রমলিনসন প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘গতকাল যা ঘটেছে সেটাকে ইসলামিক সন্ত্রাসের কর্মকাণ্ড বলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কি আমার সঙ্গে একমত যে, যা ঘটেছে সেটা ইসলামিক নয়, ঠিক যেমন আইরিনিভের হত্যাকাণ্ড খ্রিস্টান ও সন্ত্রাস ছিল না, আর মূলত দুটোই ধর্মের বিকৃতি’। জবাবে একমত পোষণ করে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন ‘ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ’ ব্যবহার করা সঠিক নয়। এ ঘটনাকে ‘ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ভুল। বরং এটা ‘ইসলামিস্ট সন্ত্রাসবাদ যা মহান একটি ধর্ম বিশ্বাসের বিকৃতি।
২২  শে মার্চ বৃটেনের ওয়েস্ট মিনিস্টার ব্রিজ ও পার্লামেন্ট এলাকায় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশেষ মহল আবারো ইসলাম ও মুসলমানদের সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ নিয়ে বৃটেনের হাউস অব কমন্সেও বিতর্ক লক্ষ্য করা গেছে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীও ওই ঘটনাকে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। বরং তিনি ‘ইসলামিস্ট সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে বিবেচনা করতে চান, যা মহান ধর্ম ইসলামের বিকৃতি। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী হামলার ঘটনাকে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেছেন এবং তিনি এই বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন যে, ওই ধরনের হামলার সাথে মহান ধর্ম ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রসঙ্গক্রমে উঠে এসেছে ১৯৭৯ সালে হাউস অব কমন্সে আইরিশ ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির গাড়িবোমা হামলার ঘটনা। ওই হামলায় কনজারভেটিভ এমপি আইরিনিভ নিহত হয়েছিলেন। ওই ঘটনাকে ‘খ্রিস্টান সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করা যায় না। বরং তা ছিল ধর্মের বিকৃতি। এভাবে বিবেচনা করলে একথা বলা যায় যে, বর্তমান সময়ে মাঝে মাঝে মুসলিম নামধারী কোনো কোনো ব্যক্তির যে সন্ত্রাসী তৎপরতা দেখা যায় তার কারণে ইসলাম কিংবা মুসলিম জাতির নিন্দাবাদ করা যায় না। বরং ওইসব ঘটনাকে মুসলিম নামধারী কিছু ব্যক্তির ভ্রান্তচিন্তা কিংবা বিকৃত তৎপরতা হিসেবে অভিহিত করতে হয়। ফলে যৌক্তিক কারণেই বিবেকবান প্রাগ্রসর ব্যক্তিদের বর্তমান সময়ে স্পষ্ট করেই বলা প্রয়োজন যে, কিছু কিছু ব্যক্তির ভুল কর্মকা-ের কারণে বর্তমান সময়ে কিছু কিছু মিডিয়া ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যেভাবে মুসলিমদের ‘সন্ত্রাসী’ এবং ইসলামকে ‘সন্ত্রাসবাদী ধর্ম’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রোপাগা-া চালাচ্ছেন তা আরো বড় ভুল।
বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ইসলাম সন্ত্রাসবাদের ধর্ম নয়, বিষয়টি স্পষ্ট করার কারণে আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই। তবে একবিংশ শতাব্দীতে যেভাবে সন্ত্রাসবাদের সূচনা হলো এবং যাদের পরিকল্পনা ও মদদে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাসবাদের নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে সেই মুখোশটাও উন্মোচন হওয়া প্রয়োজন। তবে দুঃখের বিষয় হলো, পাশ্চাত্যের নেতৃবৃন্দ সেই মুখোশ উন্মোচনে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। আগ্রহ দেখালে তো থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসতে পারে। ইতোমধ্যে ইরাক যুদ্ধ এবং আইএস সম্পর্কে বৃটেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার তদন্তে যে সত্য বেরিয়ে এসেছে তাতে সন্ত্রাসবাদের দায় থেকে আমেরিকা ও বৃটেনসহ বড় বড় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মুক্ত ভাবতে পারে না। এমন বাস্তবতায় পৃথিবীতে একের পর এক সন্ত্রাসের নাটক মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে। এই আপদ থেকে বিশ্ববাসীকে মুক্ত করতে পারে বড় বড় রাষ্ট্রগুলোই। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে তারা এগিয়ে আসবে কী?
সন্ত্রাসবাদের নামে বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে যেসব নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে তার মর্মকথা এখন মানুষের কাছে প্রায় স্পষ্ট। এই পৃথিবীতে আরো কিছু আপদ বিরাজ করছে। আমরা জানি, উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতা সব সময়ই সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবুও মতলববাজ রাজনীতিক ও কিছু কিছু ধর্মগুরুর কারণে মাঝে মাঝেই পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে উগ্রতা ও সাম্প্রদায়িকতার তা-ব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে ভারতের গুজরাট রাজ্যের কথা উল্লেখ করা যায়। নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন সাম্প্রদায়িকতার লেলিহান শিখায় জ্বলেপুড়ে মরেছে বহু মুসলিম নর-নারী ও শিশু। ব্যাপকভাবে ধর্ষণের শিকার হয়েছে মুসলিম নারীরা। ইতোমধ্যে নরেন্দ্র মোদির অনেক উন্নতি হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, তবে গুজরাটের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি।
রয়টার্স পরিবেশিত খবরে বলা হয়, নরেন্দ্র মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটে আবারো মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা হয়েছে। রাজ্যের পাটনা জেলার চানসামা থানা এলাকায় ৫ হাজারেরও বেশি হিন্দু হামলা চালায় মুসলমানদের গ্রামে। এতে দুই মুসলিম নিহত ও কমপক্ষে ১৪ জন আহত হয়েছেন। এ সময় মুসলমানদের অন্তত ৯০টি বাড়ি ও অনেক যানবাহন পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ওই হামলায় ভদাঠাল গ্রামের আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ২৬শে মার্চ গুজরাটের ঊর্ধ্বতন এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা এই তথ্য জানান। এই ঘটনায় স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকে প্রাণের ভয়ে পাশের গ্রামে পালিয়ে গেছে এবং কিছু বাসিন্দা ধরপুর গ্রামের কাছে এক মেডিকেল কলেজে আশ্রয় নিয়েছে। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও ৭ রাউন্ড গুলীবর্ষণ করেছে। শান্তি বজায় রাখতে গ্রামটিতে রাজ্য রিজার্ভ পুলিশের তিনটি কোম্পানি মোতায়েন করা হয়েছে।
গুজরাটে ভয়াবহ সহিংস সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস আছে। ২০০২ সালে হিন্দুরা দাঙ্গা বাধিয়ে রাজ্যটিতে কয়েক হাজার মুসলমানকে হত্যা করে। ওই সময় রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি দাঙ্গা রোধে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে মুসলমানদের হত্যায় ইন্ধন জুগিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় মোদি বেঁচে যান। তবে এ বিষয়টি উপলব্ধি করা যায় যে, রাজ্যের একজন মুখ্যমন্ত্রীর বিপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ দেয়ার মতো পরিবেশ একটি দুর্লভ বিষয়। মোদি তখনও ধর্মভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতি করেছেন এবং এখনও করে যাচ্ছেন। তাঁর উগ্র সমর্থকের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভারতে আরএসএস ও বিজেপি যে রাজনীতি করে যাচ্ছে তা ভারতের সংবিধানের সাথে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ? ভারত তো নিজেকে একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু ওই ঘোষণার সাথে ভারতের বর্তমান রাজনীতির তো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
আমরা অতীতে ভারতের দায়িত্বশীল রাজনীতিকদের মুখে বৈচিত্র্যের ঐক্যের কথা শুনেছি। তারা বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ ও মতের মানুষদের নিয়ে ভারতকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু বর্তমানে সেই ধারার বিকাশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বরং ক্ষুদ্রতা, বিভ্রান্তি ও সাম্প্রদায়িক উগ্রতা ভারতের ঐক্য ও সংহতির চেতনায় ফাটল সৃষ্টি করে চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে মহল বিশেষ নিজেদের কর্তৃত্বের সাফল্যে ঢেঁকুর তুললেও এর পরিণতি ভারতের জন্য কল্যাণকর বলে বিবেচিত নাও হতে পারে। বিষয়টি ভারতের শাসকদলের উপলব্ধি করা প্রয়োজন। দেশটির সাধারণ মানুষ তো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাজে বসবাস করতে চায়। জনগণের এমন আকাক্সক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেয়া কি ক্ষমতাবানদের কর্তব্য নয়?

আর্কাইভ