ঢাকা, বৃহস্পতিবার 30 March 2017, ১৬ চৈত্র ১৪২৩, ০১ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সার্ফিংয়ে অনন্য নাম জাফর আলম

নাজমুল ইসলাম জুয়েল : খেলাটির প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকার কারণেই একটি ফেডারেশন গঠন করা হয়েছে। সার্ফিং নামক খেলাটি পৃথিবীতে ঐতিহ্যবাহী হিসেবেই পরিচিত। বাংলার ক্রীড়ামোদি দর্শকদের কাছে এই খেলাটা অনেকটাই অপরিচিত ও বিদেশী খেলা হিসেবে পরিচিত। তাই এদেশের মানুষের কাছে সার্ফিং নামক খেলার তেমন একটা কদর নেই। ফুটবল ও ক্রিকেট জানা মানুষের অনেকেরই এই খেলাটি সমন্ধে তেমন একটা ধারনা নেই। তবে যেভাবে বেসবল আর গলফ আমাদের খেলাধুলার অংশ হয়ে গেছে ঠিক সেভাবেই সার্ফিংও আমাদেরকে নতুন কিছু শেখাতে চাইছে। অনেকেই হয়তো মনে করতে পারেন খুব সাম্প্রতিক সময়ে বুঝি এই খেলাটির যাত্রা শুরু হয়েছে। কিন্তু ব্যপারটি আসলে সেরক কিছু নয়। আজ থেকে প্রায় ১৬ বছর আগে ২০০১ সালের শুরুতে টম বাওয়ার নামে আমেরিকার এক নাগরিক তার পাঁচ জনের দল নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে আসেন সার্ফিং করতে। তারপর একদিন দুপুরে সেই সমুদ্রের লাবনী পয়েন্টে জাফর নামে একজনকে সার্ফিং করতে দেখে সেই দলেরই একজন রীতিমতো আশ্চর্য হয়ে যান। বাইনোকুলারে সেই দৃশ্য দেখে তার নাকি বেশ ভালও লেগেছিল সেদিন। সেই দলের দলনেতা সেখানে গিয়ে দেখেন জাফর যেটা দিয়ে সার্ফিং করেছে সেটাকে লেস নেই মানে সুতা নেই। এই সুতা বাধা হয় যাতে করে সমুদ্রে কখনো সার্ফিং করতে করতে হারিয়ে না যায়। জাফরকে কাছে টমের যে কি আনন্দ হয়েছিল সেটা নাকি ভাষায় প্রকাশ করা মতো নয়। তারপর যেটা দিয়ে সার্ফিং করেন সেটা দেখে তো টম অনেকটা চমকে ওঠেন। তারপর জাফরের বোটে লেস বেঁধে দিলেন পাশাপাশি তার বোটের তলায় মোমের আবরন তৈরি করে দিলেন। বোটের তলায় মোমের আবরন দেওয়ার কারনে সার্ফিং বোটটা যেন সমুদ্রের পানির উপর আছড়ে পড়ে উড়াল দিতে থাকে। এরপর অনেকটা আড়ালেই টম বাওয়ার জাফরের সার্ফিং এর গডফাদার বনে যান। এরই ধারাবহিকতায় টম জাফরকে নিয়ে গেছেন ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও শ্রীলংকায়। তারপরই এই টমের সহায়তায় তিন মাসের একটা প্রশিক্ষণে অংশ নিতে স্বপ্নেরদেশ আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন জাফর। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে অনেকেই অতিরিক্ত লোনা পানির কারনে সার্ফিং করতে ভয় পান। তারওপর যেভাবে ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ে তাতে করে ভয় না পাওয়ার কোন কারন নেই। তবে নিজে তেমন একটা শিক্ষত না হয়েও বর্তমানে জলবায়্ ুপরিবর্তনের ভয়াল থাবায় পড়তে থাকা কক্সবাজারকে রক্ষা করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহায়তা কামনা করেছেন। জাফল আলম বর্তমানে যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানাচ্ছেন।
যেখানে টম তার বাহিনী নিয়ে আসার পরও সেখানকার ছেলেরা ভয়ে সমুদ্রের মাঝে যেতে পারেননি তখন জাফর সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন নিজের জাত চিনিয়ে। অনেকে নিজের শখকে পুরন করতে সার্ফিং করতে নেমে পড়ের সেখানে জাফরের মনে কোনে অনেক বড় স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নটা টমের মতো মানুষের সান্নিধ্য না পেলে হয়তো প্রকাশই করা হতোনা। বাংলাদেশের মানুষের কাছে একেবারেই অপরিচিত এই খেলাটির কারনে জাফরকে খেলতে দেশে বিদেশী অনেক পর্যটক বিমুদ্ধ হয়ে চেয়ে থাকেন। তবে এখন যেভাবে খেলতে নামেন সৈকতে এই ব্যপারটা যে হতে পারে সেটা কখনোই কল্পনাও করতে পারেননি কেই। জাফরের এই সার্ফিং এর প্রেমে পড়ার সময়টাও অনেক দিনের পুরনো। ১৯৯৫ সালে যখন তিনি স্কুল ছাত্র তখন ক্লাস ফাকি দিয়ে একদিন চলে যান সমুদ্র সৈকতে। সেখানে লম্বা একটি সরু কাঠের উপর এক বিদেশীকে সমুদ্রের পানির উপর দাপিয়ে বেড়াতে দেখে তার চোঁখ কপালে উঠে যাওয়ার মতো অবস্থা। তারপর যখন সার্ফিং করে সেই বিদেশী তীরে ফিরে আসেন তখন জাফর তার সাথে বেশ ভাব জমিয়ে তুলে। একটা সময় এই বোটটির প্রতি তার আগ্রহের কথা জানান। তারপর মাত্র ২ হাজার টাকার বিনিময়ে এটা কিনেও নেন জাফর। কক সিটের তৈরি এই বোটটার নাম যে সার্ফিং সেটা জানা ছিলনা জাফরের। তারপর পরিবারের অনেকটা আড়ালেই একেবারে অপরিচিত এই বোটটি নিয়ে নতুন দিগন্তে পা রাখার মিশন শুরু করেন জাফর। কিন্তু কোন প্রশিক্ষণ কিংবা নিয়ম জানা না থাকার কারণে সমুদ্রে নেমে তেমন একটা সুবধা করতে পারতেন না তিনি। কক্সবাজার শহরের বাহার ছড়ার একেবারে নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম তার। বাবার মূল পেশা ছিল চায়ের দোকানদারী। পরিবারের আর্থিক অবস্থা তেমন একটা ভাল না থাকার কারণে প্রাইমারীর বেশি পড়াশোনা করা সম্বব হয়নি তার। তারপর ১৯৯৮ সালে সমুদ্রে বিপদাপন্ন বিদেশী পর্যটকদের উদ্ধারকারী দলে যোগ দেন জীবিকার তাগিদে। এরপর একদিন সমুদ্রে স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখে বুঝতে পারে সে যে খেলাটির জন্য এতদিন পরিশ্রম করতে সেই খেলাটির নাম সার্ফিং। তার এই সার্ফিং নিয়ে একা একা কসরত করা ২০০১ সাল পর্যন্ত অব্যহত থাকে। অনেকে জাফরকে দেখে হাসাহাসি করতো। আবার বেরসিক পুলিশও এই বড় বোর্ড নিয়ে সমুদ্রে চলাচল করতে দেখলে মাঝে মধ্যেই বাদ সেধে বসতো। এরপর সমুদ্রের ঝড়ের মতোই একদিন হঠাৎই তার প্রিয় বাবা তাদের সবাইকে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান।
তখন আরো বেশি একা হয়ে পড়েন জাফর আলম। তারপর সার্ফার জাফরকে বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফোন কোম্পানী বাংলালিংকের বিজ্ঞাপনচিত্রে। তারপর তাকে নিয়ে আলোচনার ডালপালা মেলতে শুরু করে। এরপর সর্বপ্রথম বিবিসি ওয়ার্ল্ড টেলিভিশন প্রথম জাফরকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারপর একে একে আল জাজিরা টেলিভিশন, এএফপি, এপিসহ বিদেশী অনেক সংবাদ সংস্থা। কিন্ত অনেকটা আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে দেশে এত চ্যানেল থাকতে তাকে নিয়ে কেউ তেমন একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেনি। দিনে দিনে নিজেকে একজন আন্তর্জাতিক মানের সার্ফার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে কক্সবাজারের জাফর। সার্ফিং বাংলাদেশ নামে তার একটি ক্লাবও রয়েছে। সেখানে ৪০ জন ছাত্রকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তিনি। তার ২ জন ছাত্র এ বছর ইন্দোনেশিয়ার বালিতে গিয়েছিলেন সার্ফিং করতে। তবে তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দেশে সার্ফিং বোর্ড না পাওয়া। তাই জাফর যখনই বিদেশে গেছেন তখনই ২/১টা করে বোর্ড নিয়ে এসেছেন। এখন তার কাছে মোট ৩৪ টা বোর্ড রয়েছে। বাংলাদেশের কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতকে একজন সার্ফারের জন্য আদর্শ বিচ বলেই দাবী করেছেন জাফর। তার কথায়, বিশ্বের অন্যান্য সমুদ্র সৈকতের তলদেশে পাথর রয়েছে আর আমাদের এখানে রয়েছে বালি। তাই সার্ফিং করতে গিয়ে কোন সার্ফারের সমুদ্রে তলিয়ে গেলেও আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। পাশাপাশি এই সৈকতের ঢেউয়ে অনেকক্ষণ ভেসে থাকা যায়। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ঢেউ ১৫ ফুট উচ্চায় আসে বলে জানিয়েছেন জাফর। জাফর এখন স্বপ্ন দেখেন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত হবে সার্ফারদের মিলনমেলা। যা বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে আরো অনেক বেশি সমৃদ্ধ করবে বলেই তার বিশ্বাস। এছাড়া গত ১৬ বছরে তার প্রিয় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ৪ মাইল ভেঙ্গে যাওয়ার রীতিমতো কষ্টে দিনাতিপাত করছেন জাফর। তাই সারা দুনিয়ায় বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের এ অবস্থার হাত বাঁচাতে সহায়তা চেয়ে আসছেন। কারণ তার বিশ্বাস পৃথিবীর দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকত হারিয়ে যেতে পারেনা। জাফরের বিশ্বাসই যেন সত্যি হয়। এখন তো তার স্বপ্নকে পূরণ করতে নতুন নতুন সার্ফার তৈরি হচ্ছে। তারাই আগামীর মশাল হাতে নিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ