ঢাকা, বৃহস্পতিবার 30 March 2017, ১৬ চৈত্র ১৪২৩, ০১ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ডাউন সিনড্রোম শিশু

ডাউন সিনড্রোম বা ডাউন শিশু প্রকৃতির খেয়ালে তৈরি এক বিশেষ ধরনের শিশু। প্রতি ৫০০ হতে ৭০০ শিশুর মধ্যে একটি শিশু ডাউন সিনড্রোম বা ডাউন শিশু হিসাবে জন্মগ্রহণ করতে পারে। আমেরিকায় প্রতিবছর প্রায় ৬০০০ ডাউন শিশুর জন্ম হয়। বলা হয়ে থাকে আমাদের দেশে প্রায় দুই লাখ ডাউন শিশু আছে আর প্রতিদিন জন্ম নেয় প্রায় পনেরোটি। ডাউন শিশুরা সাধারণত আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধী শিশু হিসাবে বেঁচে থাকে। সারা বিশ্বে একুশে মার্চ “বিশ্ব ডাউন সিনড্রোম দিবস” পালিত হয়।
আমাদের শরীর গঠনের সবচেয়ে ক্ষুদ্র অংশকে কোষ বা সেল বলা হয়। প্রতিটি মানব কোষের মধ্যে ২৩ জোড়া ক্রোমোজম নামের অঙ্গানু থাকে যার অর্ধেক আসে মায়ের কাছ থেকে আর অর্ধেক আসে বাবার কাছ থেকে। কোটি কোটি ডিএনএ-এর সমন্নয়ে এক একটি ক্রোমোজম তৈরী হয়। এই ডিএনএন কে বলা হয় আমাদের বংশগতির ধারক ও বাহক। অর্থাৎ আমাদের শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য যেমন, আচার আচরন, বুদ্ধিমত্তা, চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রং সবকিছুই এই ডিএনএ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে মানব শরীরে এই ডিএনএ বা ক্রোমোজমের অসামঞ্জস্য দেখা দিলে নানারকম শারীরিক ও মানসিক ত্রুটি দেখা দেয় যাদের কে আমরা সাধারনভাবে জন্মগত ত্রুটি বা জেনেটিক ত্রুটি বলে থাকি। ডাউন সিন্ড্রোম বা ডাউন শিশু সেরকম একটি জেনেটিক ত্রুটি যুক্ত মানব শিশু যার শরীরের প্রতিটি কোষে ২১ নং ক্রোমোজমটির সাথে আংশিক বা পুর্নভাবে আর একটি ক্রোমোজম (Trisomy 21) সন্নিবেশিত থাকে। আর এই অতিরিক্ত ক্রোমোজমটির কারনে ডাউন শিশুর বিশেষ কিছু শারীরিক ও মানসিক ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। এই শিশুদের চেহারা একই রকম হয় বলে খুব সহজেই ডাউন শিশুদেরকে চেনা যায়। ব্রিটিশ চিকিৎসক ল্যাংডন ডাউন এই শিশুদের বৈশিষ্ট্য সর্বপ্রথম বর্ননা করেন বলে তার নামারুসারে “ডাউন সিনড্রোম” কথাটি প্রচলিত হয়।  ডাউন শিশুদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য: ডাউন শিশুদের কিছু নির্দিষ্ট শারিরীক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন-
১. মাংশপেশীর শিথিলতা, ২. বামন বা কম উচ্চতা, ৩. চোখের কোণা উপরের দিকে উঠানো, ৪. চ্যাপ্টা নাক, ৫. ছোট কান, ৬. হাতের তালুতে একটি মাত্র রেখা, ৭. জিহবা বের হয়ে থাকা ইত্যাদি।
ডাউন শিশুদের মানসিক জটিলতা: অন্য শিশুদের চেয়ে ডাউন শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে দেরিতে বেড়ে ওঠে। বেড়ে ওঠার মাইল ফলকগুলো যেমন বসতে শেখা, দাঁড়াতে শেখা, হাঁটতে শেখা, কথা বলতে শেখা এসব দেরিতে ঘটে। আবার কেউ কেউ কোন একটি কখনই শেখে না। ডাউন শিশুরা বেশীরভাগই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে থাকে। অনেক সময় এরা অত্যন্ত হাসিখুশী ও সংগীতপ্রিয় হয়ে থাকে।
ডাউন শিশুর শারীরিক জটিলতা: বেশীরভাগ ডাউন শিশুর জন্মগত হার্টের সমস্যা থাকে যার কারণে অনেকেই জন্মের পর মারা যায়। কারো কারো হার্টের অপারেশনের প্রয়োজন হয়। শুধু তাই নয়, ডাউন শিশুদের অনেকেই লিউকেমিয়া, থায়রয়েড সমস্যা, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণ শক্তির সমস্যা, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, জীবানু সংক্রমণ, শারীরিক স্থুলতা, ইত্যাদি জটিলতায় ভুগতে পারে। ডাউন শিশুদের গড় আয়ু সাধারণ মানুষের চেয়ে কম।
কি কারণে ডাউন শিশুর জন্ম হয়: ঠিক কি কারণে মায়ের গর্ভে ডাউন শিশুর জন্ম হয় তা সম্পূর্ণ জানা যায়নি। তবে একথা প্রমাণিত যে কোন নারী যত অধিক বয়সে মা হবেন, তার সন্তান ডাউন শিশু হবার সম্ভাবনাও তত বেশী হবে। যেমন ২৫ বছর বয়সের প্রতি ১২০০ জন গর্ভবতী মায়ের মধ্যে একজনের, ৩০ বছর বয়সের প্রতি ৯০০ জন মায়ের মধ্যে একজনের ডাউন শিশু হতে পারে। কিন্তু ৩৫ বছর বয়সের পর ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে থাকে। ৩৫ বছর বয়সের প্রতি ৩৫০ জন গর্ভবতী মায়ের মধ্যে একজনের এবং ৪০ বছর বয়সের প্রতি ১০০ জন মায়ের একজনের ডাউন শিশু হতে পারে। অধিক বয়সের মায়ের গর্ভে ডাউন শিশু হবার সম্ভাবনা বাড়লেও যেহেতু যুবতী বয়সেই বেশীরভাগ নারী মা হয়ে থাকেন তাই যুবতী বয়সের মায়েদের মধ্যেই ডাউন শিশু সচরাচর দেখা যায়। তার মানে যে কোন বয়সের মায়ের ডাউন শিশু হতে পারে। অন্যদিকে কোন মায়ের আগে একটি ডাউন শিশু থাকলে পরবর্তীতে ডাউন শিশু হবার সম্ভাবনা বাড়ে। পরিবেশ দূষণ, গর্ভবতী মায়ের ভেজাল খাদ্যে ও প্রসাধনী গ্রহণ, তেজস্ক্রিয়তা ইত্যাদি কারণেও ডাউন শিশুর জন্ম হতে পারে বলে ধারনা করা হয়। অনেক সময় বাবা-মা ত্রুটি যুক্ত ক্রোমোজমের বাহক হলে তাদের  সন্তানও ডাউন শিশু হতে পারে।
কিভাবে ডাউন শিশু সনাক্ত করা যায়: একজন চিকিৎসক যে কোন বয়সের শিশুকে দেখেই ডাউন শিশু কিনা তা সন্দেহ করতে পারেন। কারন তাদের কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্য থাকে। বাবা মায়েরা যখন দেখেন তাদের  সন্তানের চেহারা একটু ভিন্ন ধরনের,  শিশুর গায়ে শক্তি কম, নির্ধারিত বয়সে বসতে, দাঁড়াতে বা হাঁটতে শিখছেনা, শারীরিক বৃদ্ধি কম, কম বুদ্ধি সম্পন্ন, তখন তারা চিকিৎসকের সরনাপন্ন হন। চিকিৎসক শিশুর রক্তের ক্রোমোজম সংখ্যা বা ক্যারিওটাইপিং পরীক্ষার মাধ্যমে ডাউন শিশু কি না তা নিশ্চিৎ করেন।
প্রসূতি মায়ের ডাউন শিশু জন্ম নেয়ার ঝুঁকি  নির্নয় পরীক্ষা : ১১ হতে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভবতী মায়ের রক্তে প্যাপ-এ, এইচসিজি এবং ১৬ হতে ২০ সপ্তাহের মধ্যে এএফপি, ইসট্রিয়ল, এইচসিজি ইত্যাদি রাসায়নিক পদার্থের মাত্রা পরীক্ষা করে ডাউন শিশুর জন্ম হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে ধারনা করা যায়। তাছাড়া আল্ট্রাসনোগ্রাফী করে মায়ের পেটে ১১ হতে ১৪ সপ্তাহের শিশুর ঘাড়ের পিছনের তরলের মাত্রা, নাকের হাড়ের উপস্থিতি, “ডাকটাস্ ভেনোসাস” নামক প্রাথমিক রক্তনালীর রক্তপ্রবাহ ইত্যাদি নির্নয়ের মাধ্যমেও ডাউন শিশু জন্ম নেয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত মায়েদেরকে ডাউন শিশুর নিশ্চিত পরীক্ষা করার উপদেশ দেয়া হয়।
পেটের সন্তান ডাউন শিশু কি না তার নিশ্চিত পরীক্ষা: গর্ভাবস্থার ১১ হতে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে প্রাথমিক গর্ভফুল হতে কোষকলা সংগ্রহের মাধ্যমে অথবা ১৫ হতে ১৮ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভের বাচ্চার চারপাশের তরল পদার্থ সংগ্রহের মাধ্যমে বাচ্চার ডিএনএ পরীক্ষা করে গর্ভের বাচ্চাটি ডাউন শিশু কি না তা ১০০ ভাগ নিশ্চিত করা যায়। এ সময় বাচ্চার আকার হয় প্রায় ২-৪ ইঞ্চির মতো। কাজেই রিপোর্ট অনুযায়ী বাবা-মা গর্ভাবস্থা চালিয়ে যাওয়ার ব্যপারে নিশ্চিৎ হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
প্রতিরোধের উপায়: সুযোগ ও সচেতনতার অভাবে আমাদের দেশে এখনো বেশীরভাগ গর্ভবতী মা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে পারেননা। অন্যদিকে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকলেও গর্ভবতী মাকে ডাউন শিশু সম্পর্কে বা অন্য কোন জন্মগত ত্রুটি সম্পর্কে ধারণা দেয়ার ব্যপারটি উপেক্ষিত। তাছাড়া দেশের সব জায়গায় পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সুযোগ নেই। অনেক প্রতীক্ষার পর কোন বাবা-মায়ের যখন একটি ডাউন শিশুর জন্ম হয় তখন ঐ সংসারে আনন্দের বদলে চরম হতাশা নেমে আসে। ডাউন শিশু পরিবার, সমাজ ও দেশের বোঝা। কাজেই সচেতন হওয়া ছাড়া প্রতিরোধের কোন উপায় নেই। উন্নত বিশ্বে প্রত্যেকটি গর্ভবতী মাকে ডাউন শিশু এবং অন্যান্য সম্ভাব্য জন্মগত ত্রুটি ও তা নির্নয়ের পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পর্কে ধারণা দেয়া চিকিৎসকের জন্য বাধ্যতামূলক। যেহেতু মা এর বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডাউন শিশু হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধিক বয়সে, বিশেষ করে পঁয়ত্রিশোর্ধ বয়সে মা হওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়। মেধাবী শিশুর জন্ম নিশ্চিৎ করতে হলে ডাউন শিশুর মতো প্রতিরোধযোগ্য প্রতিবন্ধী বা জন্মগত ত্রুটির বিষয়টি পাঠ্য বইতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গর্ভবতী মাকে সেবা দানের ক্ষেত্রে অনাগত শিশুর জন্মগত ত্রুটির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।  আশার কথা, মায়ের গর্ভে ডাউন শিশু নির্নয়ের যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখন দেশেই হচ্ছে। চাই শুধু সচেতনতা।
-ডা. রেজাউল করিম কাজল
সহযোগী অধ্যাপক
প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
ফোন: ০১৯১৯-০০০০১১

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ