ঢাকা, বৃহস্পতিবার 30 March 2017, ১৬ চৈত্র ১৪২৩, ০১ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জঙ্গি মূসাকে খুঁজছে ভারতীয় এনআইএ

২০১৪ সালের ২ অক্টোবর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় চার্জশিটভুক্ত ২৯ জনের মধ্যে একজন হলেন মাইনুল ইসলাম ওরফে মূসা। গত বছরের ৬ জুলাই বর্ধমান রেল স্টেশনে ভারতীয় জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনআইএ) হাতে ধরা পড়ে মূসা নামে এক ব্যক্তি। এনআইএ’র গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য ছিল যে মূসা নামের ঐ ব্যক্তি কলকাতার বোস রোডে অবস্থিত মাদার তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটি মাদার হাউজে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিল। কলকাতা পুলিশ সন্দেহ করে বর্ধমানের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় চার্জশিটভুক্ত পলাতক মূসার সঙ্গে আটক হওয়া মূসার মিল থাকতে পারে। আটক এই মূসার বাড়ি বাংলাদেশে। ঐ বছরের ১৫ আগস্ট ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল কলকাতায় গিয়ে মূসাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট নব্য জেএমবির নেতা মূসাকে খুঁজছিল। তবে কলকাতায় আটক হওয়া মূসার সঙ্গে বাংলাদেশের নব্য জেএমবি’র মাইনুল ইসলাম ওরফে মূসা’র চেহারার কোনো মিল ছিল না। এরপর থেকে এনআইএ-ও আসল মূসাকে ধরার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।

মূসার প্রকৃত নাম মাইনুল ইসলাম। ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহীর বাগমারায় জেএমবি’র সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের প্রকাশ্য অভিযানের সময় জেএমবিতে যোগ দেয় মূসা। ঐ সময় মূসা বাগমারার তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। বাগমারার গণিপুর ইউনিয়নের বজ্রকোলা গ্রামে মূসার বাড়ি। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর তিনি রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন। পরে সেখান থেকে রেফার্ড নিয়ে ঢাকা কলেজে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। অনার্সে উত্তীর্ণ হওয়ার পর উত্তরার লাইফ স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরই মধ্যে বাগমারার বাসুপাড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাঁইপাড়া গ্রামের আব্দুস সামাদের মেয়ে তৃষ্ণামনিকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি ৬ তলা বাড়িতে ওঠেন। এই বাড়িতেই সপরিবারে ভাড়া থাকতেন মেজর জাহিদ। মূসা মেজর জাহিদের মেয়েকে পড়াতেন। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট আশুলিয়ার একটি বাড়ি থেকে তৃষ্ণামনিকে গ্রেফতার করে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তথ্য পেয়েছেন যে তৃষ্ণামনি গ্রেফতার হওয়ার পর মূসা নব্য জেএমবি’র কামালের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম ওরফে মর্জিনাকে বিয়ে করেছেন।

মূসার মা সুফিয়া বেগম জানান, মেজর জাহিদ, জেএমবি’র আরেক নেতা তানভীর কাদিরসহ অনেক নেতা বাসার ছাদে মিটিং করতেন। ঐ মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেই জঙ্গি দলে ঢুকে পড়ে তার সন্তান মূসা। গত ৮ মাস আগে সে একবার গ্রামের বাড়িতে আসে। ওই সময় সৌদি আরব যাবে বলে ৩ লাখ টাকার জমি বিক্রি করে বাড়ি থেকে চলে যায়। যাওয়ার সময় বাড়িতে থাকা তার ছবিসহ বেশ কিছু কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের ঘটনায় আমি লজ্জিত । এক সময় আমার ছেলে ভালো ছাত্রও ছিল। জানিনা আমার ছেলের ভাগ্যে কি আছে। তবে আমার ছেলের মতো আর কোন ছেলে যেন জঙ্গিতে জড়িয়ে না পড়ে।’

স্থানীয়রা জানান , জঙ্গি মুসা বাগমারা থেকে নিজের জমিজমা বিক্রি করে চলে যায়। মুসা গ্রামে থেকে যাওয়ার আগে বাড়িতে থাকা তার ছবিসহ বেশ কিছু কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলেছিল বলে জানান তারা । এরপর থেকে সে পরিবারের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখেনি।

এদিকে , ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর এক সাংবাদিক সম্মেলনে তৎকালীন সরকার উৎখাতে ধর্মান্ধ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার একটি অভ্যুত্থান পরিকল্পনা নস্যাৎ করার খবর দেয়া হয়েছিল। ওই সম্মেলনে অভ্যুত্থান চেষ্টাকারীদের নেতা হিসেবে জানানো হয় মেজর জিয়ার নাম। সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া জিয়া পালিয়ে জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সাথে যুক্ত হন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়ে আসছে ওই সময় থেকেই। সারাদেশে নানা নামে জন্ম নেয়া নানা জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রধানদের সাথে উঠে আসে জিয়ার নাম । দেশবিদেশে আলোচিত হয়ে উঠেন জিয়া । গতবছরের পহেলা জুলাই রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকা গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোঁরায় জঙ্গি হামলার ঘটনায় দেশী বিদেশী ২৬ জন নিহত হলে আবার জোরেশোরে উচ্চারিত হতে থাকে মেজর জিয়ার নাম । এরপর দফায় দফায় হলি আর্টিজান হামলা মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানাতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ পুলিশের উচ্চপদস্থরা বারবারই বলে আসছেন ওই ঘটনার নায়ক সেই মেজর জিয়াই । সেনাবাহিনীতে ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার পর পালিয়ে জঙ্গিনেতার খাতায় নাম লেখানো মেজর জিয়ার পুরো নাম সৈয়দ জিয়াউল হক । 

গুলশান হামলার পর পুলিশের অভিযানে তানভীর কাদেরী, তামিম ও মেজর জাহিদসহ সব মাস্টারমাইন্ড জঙ্গি নিহত হয়েছে। সম্প্রতি সহযোগীসহ নিহত হয়েছে আরেক মাস্টারমাইন্ড মারজান। এরপরই পুলিশ-র‌্যাবের তালিকার শীর্ষে বাকী রয়ে গেল শুধু নব্য জেএমএমবির প্রধান মেজর জিয়া আর মুসার নাম। সিলেটের আতিয়া মহলের অভিযানে মুসা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে ।

কে এই জিয়া

জিয়াউল হকের পুরো নাম সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক। বাবার নাম সৈয়দ মোহাম্মদ জিল্লুল হক। বাড়ি মৌলভীবাজারের মোস্তফাপুরে। সর্বশেষ ব্যবহৃত বর্তমান ঠিকানা পলাশ, মিরপুর সেনানিবাস, ঢাকা। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) আধ্যাত্মিক নেতা জসীমুদ্দিন রাহমানীকে গ্রেফতারের পর এবিটির শীর্ষ সংগঠক, সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল হকের নাম জানতে পারেন গোয়েন্দারা। দেশের ব্লগার, প্রকাশক, মুক্তমনা লেখকসহ অন্তত নয়জনকে টার্গেট করে হত্যার নেপথ্যে ছিলেন মেজর জিয়া। আরও কয়েকজনকে হত্যাচেষ্টা পরিকল্পনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

ব্লগার হত্যা ছাড়াও গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার মাস্টারমাইন্ডদের একজন হলেন এই জিয়া। মূলত সেনাবাহিনীতে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার পরই ২০১২ সালে আলোচনায় আসেন মেজর (চাকরিচ্যূত) সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক। অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই জিয়ার আর কোনো সন্ধান মেলেনি। জিয়াকে ধরতে সেই সময় পটুয়াখালী শহরের সবুজবাগ এলাকায় জিয়ার শ্বশুর মোখলেছুর রহমানের বাসায় দফায় দফায় অভিযান চালায় পুলিশ। রাজধানীর কয়েকটি স্থানেও জিয়ার খোঁজে চলে অভিযান। কিন্তু আজও জিয়া রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মেজর জিয়ার শাশুড়ি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা হামিদা বেগম সেই সময় গণমাধ্যমকে জানান, জিয়া পটুয়াখালীর বাসায় কখনো আসেননি। ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের তদন্ত দ্রুত শেষ করার জন্য সেই সময় সেনাবাহিনীতে মোট ৬টি তদন্ত আদালত কাজ শুরু করে। একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের তদন্ত আদালত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের কাজে যুক্ত ছিলেন। লে. কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তার নেতৃত্বে ৩ সদস্য করে ঢাকার বাইরে আরও পাঁচটি তদন্ত আদালত তখন গঠন করা হয়েছিল। সেই সময় সেনাবাহিনীর সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মেজর জিয়া হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে জড়িত। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন এর খবর অনুযায়ী, গত বছরের ৯ জানুয়ারি করাচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে এক বন্দুকযুদ্ধে এজাজসহ আল-কায়েদার চার জঙ্গি নিহত হয়। ওই খবরে এজাজ ওরফে সাজ্জাদকে একিউআইএসের কমান্ডার বলে উল্লেখ করা হয়। পরে বাংলাদেশের জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত গোয়েন্দারা এজাজ নিহত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হন। এজাজের মৃত্যুর পরে আনসারুল্লাহ নতুন নেতৃত্বে পুনর্গঠিত হয়। জসীমুদ্দিন রাহমানীর স্থলে তাত্ত্বিক নেতা হন পুরান ঢাকার ফরিদাবাদের এক মাদ্রাসা শিক্ষক। আর সামরিক শাখার নেতৃত্বে আসেন মেজর (বহিষ্কৃৃত) সৈয়দ মো. জিয়াউল হক।

বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, মেজর জিয়া আগে থেকেই উগ্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুফতি জসীমুদ্দিন রাহমানী গ্রেফতার হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ধরা পড়ার আগে তিনি একাধিকবার ঢাকা ও চট্টগ্রামে মেজর জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

জিয়া কোথায়?

রাজধানীসহ দেশের একাধিক স্থানে জঙ্গিবিরোধী সফল অভিযানে একের পর এক জঙ্গি নিহত হলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে পুরস্কার ঘোষিত আরেক শীর্ষ জঙ্গিনেতা চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক। এখন এই মেজর জিয়ার সাথে কৌশলে গা-ঢাকা দিয়েছে নব্য জেএমবির সংগঠক বাসারুজ্জামান ওরফে চকলেট। দীর্ঘদিন ধরে তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ্যে এলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে তারা।

পুলিশ সদর দফতর ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, আদর্শিক দিক থেকে নব্য জেএমবি এবং এবিটি কাছাকাছি। তবে তাদের কার্যক্রম ভিন্ন। এবিটির লক্ষ্যের অন্যতম হচ্ছে ব্লগার ও মুক্তমনা মানুষ হত্যা।

অন্যদিকে বাসারুজ্জামান চকলেট নব্য জেএমবির মূলহোতা নিহত জঙ্গি নেতা তামিম চৌধুরীর আস্থাভাজন। নব্য জেএমবির টার্গেট মাজারপন্থী, শিয়া সম্প্রদায় ও বিদেশী নাগরিক হত্যা। বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হওয়া এবিটি ও নব্য জেএমবির সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একের পর এক অভিযানে ছিন্নভিন্ন জঙ্গি নেটওয়ার্ক। তবে এবিটি প্রধান মেজর জিয়া রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। একাধিকবার ধরতে গিয়েও মেজর জিয়াকে ধরতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। জঙ্গি দমনে নিয়োজিত একাধিক কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, দেশেই আত্মগোপনে মেজর জিয়া। জিয়ার মুখে দাড়ি ছিল। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে দাড়ি ছেটে ফেলা হয়েছে।

অন্যদিকে নব্য জেএমবির মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তিতে সক্রিয় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার বাসারুজ্জামান ওরফে চকলেট। গুলশান হামলার আগে নব্য জেএমবির কাছে বৈদেশিক অর্থায়ন সংগ্রহ ও বণ্টনের দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। পাশাপাশি সংগঠনের আইটিবিষয়ক কাজও তদারক করে।

‘জিয়াকে গ্রেফতার করা গেলে জঙ্গি নির্মূল সহজ হবে’

মেজর জিয়াকে গ্রেপ্তার করা গেলে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা অনেকাংশে সহজ হবে বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন,‘যতখানি তথ্য আছে তাতে ধারণা করা হচ্ছে জিয়া দেশেই অবস্থান করছে এবং বিভিন্ন সময় স্থান পরিবর্তন করছে। জিয়া যেন পালাতে না পারে সে জন্য ইতোমধ্যেই সব জায়গায় পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছে।’

পুলিশ জানায়, জিয়া এবিটির অন্যতম সমন্বয়কারী। দাড়ি ফেলে দিলে তার চেহারা কেমন হতে পারে তেমন কিছু ছবি গোয়েন্দারা সঙ্গে রাখছেন। তাকে ধরিয়ে দিতে গত ২ আগস্ট ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ