ঢাকা, শুক্রবার 31 March 2017, ১৭ চৈত্র ১৪২৩, ০২ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শহর থেকে দূরে

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : এই ঢাকা মহানগরী আমার স্থায়ীভাবে বসবাস ৪৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে। এই নগর বদলে গেল আমার চোখের সামনেই। এখনও অবিরাম বদলে যাচ্ছে। ঢাকায় যখন থাকতে শুরু করেছিলাম, তখন এই নগরীতে এতসব সুউচ্চ ভবন ছিল না। খোলা জায়গা ছিল প্রচুর। স্থানে স্থানে জলাশয়। যত দূর মনে পড়ে ধোলাই খাল দিয়ে ছোট লঞ্চ আসতো। পান্থপথ ছিল খাল। এখানে বড়শি ফেলে লোকে মাছ ধরতো। বাসের রুটও ছিল কম। মুড়ির টিন মার্কা বাস ছিল। তার সামনে একটি লিভার ঘুরিয়ে শ্যালো মেশিনের মতো স্টার্ট দিতে হতো।  টমটম ছিল প্রধান বাহন। মালিবাগের উত্তরে, মোহাম্মদপুরের পশ্চিমে পুরোটাই ছিল জলাশয় আর নদী। ধানমন্ডি ছিল প্রকৃতই ধানক্ষেত। এখানে ওখানে দু’ একটি দেড় তলা বাড়ি ছিল। তার দোতলায় ২৫ কিংবা ৪০ পাওয়ারের টিমটিমে আলো জ্বলতো। নিয়ন বাতি তখনও আসেনি। পুরানো ঢাকায় চামড়ার ব্যাগে করে ভিস্তিরা বাড়িতে বাড়িতে পানি দিয়ে যেত। এমনি সব আদিম ব্যবস্থা ছিল।

তারপর কয়েক দিন আগে আমিও তেমনি একটা ছুট দিয়েছিলাম। গন্তব্য হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ। লক্ষ্য দু’টো দিন একেবারে নিরিবিলি চা বাগানের সবুজের ভেতরে চুপচাপ শুয়ে থাকা। শ্যামলী বাসের টিকিট কাটলাম যাবার দু’দিন আগে। দুপুর একটায় বাস। পান্থপথের কাউন্টার থেকে আমাকে বলা হলো, সোয়া এগারোটায় কাউন্টারে রিপোর্ট করবেন। যথাসময়ে কাউন্টারে হাজির হলাম। কিন্তু যে মিনিবাস আমাদের সায়েদাবাদ পর্যন্ত নিয়ে যাবে, সেটি তো আর আসে না। অবশেষে সে বাসটি এলো দুপুর বারোটায়। সাড়ে বারোটা নাগাদ সায়েদাবাদের নির্ধারিত কাউন্টারে আমাদের নামিয়ে দিল। সে কাউন্টারে জানতে চাইলাম, একটার বাস কখন আসবে? তারা বললেন, একটার বাস ক্যানসেল হয়ে গেছে। আপনার বাস এখন তিনটায়। চৈত্রের দাবদাহ। তার ওপর ওয়েটিং রুমের অর্ধেক ফ্যান বিকল। ঘরভর্তি লোক ঘেমে নেয়ে উঠেছে। আমি পান্থপথ কাউন্টারে ফোন করলাম, ভাই আমাকে আগে কেন জানালেন না যে, বাস ক্যানসেল। তাহলে আরও পরে আসতাম। তিনি সন্তোষজনক কোনা জবাব দিতে পারলেন না। জানতে চাইলাম আমার সিরিয়াল ঠিক আছে তো। বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, আগের সিরিয়ালই আছে।

অবশেষে তিনটার সেই প্রতীক্ষিত বাস এলো। আমাদের ডাক পড়লো। বাসে উঠে দেখি, আমাদের জন্য নির্ধারিত সীটে অন্য লোক বসে আছে। তাকে টিকিট দেখিয়ে বললাম, এ সিট তো আমাদের জন্য বরাদ্দ। তিনিও তার টিকিট বের করে দেখালেন, একই সিরিয়াল। কাউন্টারে ফিরে এলাম। বাস তখন ছাড়ে ছাড়ে। বললাম, আগে বাস থামান। আমাদের লাগেজ তো বক্সে, সিট পাইনি। বাস চলতে শুরু করেছিল। থামানো হলো। আমরা একটু জোরই করলাম। শেষে বাস থেকে এক দম্পতিকে নামিয়ে আনা হলো। তাদের লাগেজ নামিয়ে দেয়া হলো। তাদের টিকিট তিনটার বাসেই ছিল। মনটা খারাপ হয়ে গেল। তবু শেষ পর্যন্ত বাসে গিয়ে উঠলাম। আমাদের বলা হয়েছিল, তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাব শায়েস্তাগঞ্জ। কিন্তু জ্যাম ঠেলে শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছলাম রাত সোয়া আটটায়।

হোটেলে ঢুকে গোসল আসল সারতে সারতে প্রায় রাত দশটা বেজে গেল। তখন আমাদের প্রতিনিধি মইনুল হাসান রতন এসে খবর দিলেন যে, প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক এবং জনপ্রতিনিধিরা দূর দূরান্ত থেকে এসে অপেক্ষা করছেন আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য। গেলাম। শায়েস্তাগঞ্জের মতো ছোট শহরে চমৎকার গোছানো দোতলা প্রেস ক্লাব। বিশ্বাসই হচ্ছিল না। তারা কথা বললেন। সে কথার মধ্যে বেশির ভাগ জুড়ে ছিল সরকারের অত্যাচার, নিপীড়ন, মামলা হামলা, গুম, খুন- এসব বিষয় নিয়ে। জনপ্রতিনিধি এমন কাউকে পাওয়া গেল না, যার নামে একাধিক মামলা নেই। এর মধ্যে মাঝেমধ্যে পুলিশ এসে হয়রানি করে, বাড়ি ঘেরাও করে। কাগজপত্র, বিছানা-বালিশ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ঘরবাড়ি তচনছ করে যায়। প্রতিকারহীন। তারা কেউ বা এসেছিলেন হবিগঞ্জ থেকে, কেউ বা মাধবপুর কিংবা অন্য কোনো উপজেলা থেকে। সবাই জানালেন একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা। তবু আশার কথা এই যে, তারা কেউ হাল ছেড়ে দেননি। সুদিনের প্রতীক্ষায় আছেন।

রাতটা হোটেলেই কাটালাম। সকালে চা বাগানের উদ্দেশ্যে যাত্রা। গাড়িতে ২৫ মিনিট জার্নির পর শুরু হলো সুরমা টি এস্টেট এলাকা। সাড়ে ১৩ হাজার একর জমির বাগান। এত বড় বাগান এ অঞ্চলে আর নেই। চারদিকে যত দূর চোখ যায়, সবুজ চা গাছের বাগান। মনে হলো গাছগুলোর ওপর বুঝি শুয়ে থাকা যাবে। সব গাছ উচ্চতায় সমান। মাঝে মাঝে ছায়া গাছ। ফলে এক সবুজের বিছানা। কোথায়ও কোথায়ও গাছের ওপরের দিকটা শুকনো। রোদে পুড়ে গেছে। তবে গত ক’ দিনের বৃষ্টিপাতে সেই শুকনো ডগায় ছোট্ট ছোট্ট কুশি গজাতে শুরু করেছে। চায়ের ভালো ফলনের জন্য রোদ ছায়া বৃষ্টি সমান দরকার। আবার চা গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকলে চলবে না। পানি লাগবে। তবে তা যেন প্রবাহিত হয়ে যায়। সে পানি যাবে কোথায়? তার জন্য গভীর নালা কেটে দেয়া আছে। সে নালার পানি গিয়ে জমা হবার জন্য আছে জলাধার। আবার খরার সময় প্রয়োজন হলে এই জলাধার থেকে পানি সেচ দেয়াও সম্ভব। জানালেন সহকারী ম্যানেজার মলয় দেব রায়।

আমরা গিয়ে পৌঁছলাম বাগানের গেইটে। সেটি এমন জমকালো কিছু নয়। দারোয়ান খুলে দিলেন। দু’পাশে ছায়ার নিচে নতুন চারা উৎপাদনের ব্যবস্থা। দু’ভাবে নতুন চারা তৈরি করা হয়। এক ধরনের চারাগাছ তৈরি হয় বীজ থেকে। আর এক পদ্ধতি কাটিং। একটি মাঝারি ধরনের না শক্ত না নরম ডাল কেটে নেয়া হয়। তারপর একটি কুশি আর একটি পাতা সমেত ইঞ্চি খানেক ডাল কেটে বুনে  দেয়া হয় চারা উৎপাদনের বেডে। সেখানেই বেড়ে ওঠে চারাগুলো। কাটিং-এর চারাগুলো থেকে যে গাছ তৈরি হয়, সেগুলো ফলন দেয় ৬০ থেকে ৭০ বছর। আর বীজের মাধ্যমে যেগুলো উৎপাদিত হয়, সেগুলো ফলন দেয় ১০০ বছর পর্যন্ত। এ বছর সুরমায় ৫০০ একর নতুন জমিতে চারা লাগানো হয়েছে। এসব গাছ থেকে দু’ বছরের মধ্যেই পাতা তোলা যাবে।

বেশ কিছ দূর যাওয়ার পর দেখা মিললো ম্যানেজারের বাংলোর। সোয়া শ’ বছরের পুরানো বাগান। একেবারে বৃটিশ আমলের ঐতিহ্যবাহী ভবন। মেরামতিতে খানিকটা আধুনিকতার ছোঁয়া। ম্যানেজার আবুল কাশেমের বাড়ি গাজীপুরে। ১৯৮৮ সাল থেকে আছেন প্লান্টেশনের সঙ্গে। এই বাগানে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় এক দশক ধরে। অমায়িক হাসিখুশি মানুষ। আমাদের সাদরে বরণ করলেন। আমার সঙ্গে যারা গিয়েছিলেন, তারা আগে থেকেই আমাকে বলেছিলেন, কাশেম সাহেব সবার কাছেই প্রিয় সদাশয় মানুষ। বাংলোতে ঢুকেই তার  প্রমাণ পেলাম। সবার সঙ্গেই তার ভালো সম্পর্ক। তা হোক সাংবাদিক কিংবা জনপ্রতিনিধি। সবাই তাকে সম্মানও করেন। 

তার সহকারী ম্যানেজার মলয় দেব রায়। স্মার্ট তরুণ এই অফিসার আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন বাগানের অনেক খানি। তিনিও যেন চা বাগানের প্রেমেই পড়ে গেছেন। প্রথম প্রথম নিঃসঙ্গ লাগত। এখন চা গাছ নিয়েই তার জীবন। আমাদের ঘুরে ঘুরে বাগান দেখিয়ে জানালেন চা উৎপাদনের নানা রহস্য। যা আমার আগে জানা ছিল না। প্ল্যান্টার হিসেবে অনেক দূর যাবেন মলয় দেব রায়। আমি তার সাফল্য কামনা করি।  

আগের রাতে ঝড় হয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি আর গাছ পড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ল-ভ-। বিদ্যুৎ নেই। গাছে গাছে কোকিলের স্পষ্ট ডাক শুনলাম বহুকাল পড়ে। কোথায়ও কোনো শব্দ নেই। নৈঃশব্দের এত আবেদন সেও যে কত কাল পড়ে অনুভব করলাম! সন্ধ্যা নামতেই ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকতে শুরু করল। বহুকাল আগেই ফেলে আসা গ্রাম জীবনের স্মৃতি মনে পড়ে গেল। মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল। কাশেম সাহেবের বাড়ি গাজিপুরে। ১৫ দিন এক মাস পড়ে বাড়ি যান দু সন্তানের এই জনক। তবে চা বাগানের এই সবুজ আর নৈঃশব্দকেই ভালবেসে ফেলেছেন আবুল কাশেম। আমরা থেকে গেলাম ম্যানেজার সাহেবের আতিথ্যে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ