ঢাকা, শুক্রবার 31 March 2017, ১৭ চৈত্র ১৪২৩, ০২ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

উগ্রপন্থী দলের উত্থান ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : জঙ্গি, জঙ্গিবাদ, জঙ্গিবাদী শব্দগুলো ইংরেজি militant ও militancy শব্দগুলোর অনুবাদ। ইদানীং এগুলো প্রচার মাধ্যমে ব্যবহৃত হচ্ছে, কিছু দিন আগেও শব্দগুলোর এতো ব্যাপক ব্যবহার ছিল না। আর আভিধানিক বা ব্যবহারিকভাবে এগুলো নিন্দনীয় বা খারাপ অর্থেও ব্যবহৃত হতো না। শাব্দিক বা রূপকভাবে যোদ্ধা বা যুদ্ধে ব্যবহৃত বস্তু বুঝাতে এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হতো। বৃটিশ ইন্ডিয়ার কমান্ডার ইন চিফকে ‘জঙ্গিলাট’ বলা হতো। শক্তিমত্তা বা উগ্রতা বুঝাতেও এই শব্দ ব্যবহার করা হয়। Oxford Advanced Learner’s Dictionary-তে বলা হয়েছে, militant. adj. favoring the use of force or strong pressure to achieve one’s aim. militant: n. militant person, esp. in politics. Merriam-Webster’s Collegiate Dictionary-তে বলা হয়েছে, militant 1: engaged in warfare or combat : fighting. 2: aggressively active (as in a cause).  এ সকল অর্থে কোনোটিই বেআইনী অপরাধ বুঝায় না। কিন্তু বর্তমানে ‘জঙ্গি’ বলতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে বেআইনীভাবে নিরপরাধ বা অযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, হত্যা ইত্যাদি অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিকে বুঝানো হয়। আর এদের মতবাদকেই জঙ্গিবাদ বলা হয়। এই অর্থে প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত পরিভাষা সন্ত্রাস বা উগ্রপন্থী। সন্ত্রাস-এর পরিচয়ে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে: terrorism: the systematic use of violence to create a general climate of fear in a population and thereby to bring about a particular political objective. নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুশৃঙ্খলভাবে সহিংসতার ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা।’ মার্কিন সরকারের ফেড়ারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফ.বি.আই) terrorism বা সন্ত্রাসের সংগায় বলেছে : government, the civilian population or any segment thereof, in furthcrance. ‘কোনো সরকার বা সাধারণ নাগরিকদেরকে ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্য পূরণর জন্য ব্যক্তি বা সম্পদের বিরুদ্ধে ক্ষমতা বা সহিংসতার বেআইনী ব্যবহার করা’।

এই সংগায় মূল কর্মের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে। শক্তি, ক্ষমতা বা সহিংসতার ব্যবহার যদি বেআইনী হয় তবে তা ‘সন্ত্রাস’ বলে গণ্য হবে। আর যদি তা ‘আইনসম্মত’ হয় তবে তা ‘সন্ত্রাস’ বলে গণ্য হবে না। এখানে সমস্যা হলো, আইন ও বেআইনী নির্ণয় নিয়ে। এভাবে আমরা দেখছি যে, এভাবে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসীকে চিহ্নিত করা কঠিন এবং এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ প্রায় অসম্ভব। এজন্য অন্য অনেক সমাজবিজ্ঞানী কর্মের উপর নির্ভর না করে আক্রান্তের উপর নির্ভর করে। সন্ত্রাসকে সংগায়িত করতে চেষ্টা করেছেন। তাদের ভাষায়:terrorism is premeditated. Politically motivated violence perpetrated against noncombatant targets.

‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে অযোদ্ধা লক্ষ্যের বিরুদ্ধে সহিংসতা হলো সন্ত্রাস।’ উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ছাড়া সাধারণভাবে সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এক প্রকারের যুদ্ধ। তবে যুদ্ধের সাথে এর পার্থক্য হলো: যুদ্ধ রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের দাবিদার কর্তৃক পরিচালিত হয়, ফলে সেক্ষেত্রে ক্ষমতা ব্যবহারের বৈধতা বা আইনসিদ্ধতার দাবি করা হয়। এতে সাধারণত যোদ্ধাদেরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং এর উদ্দেশ্য হয় সামরিক বিজয়। পক্ষান্তরে উগ্রপন্থী ব্যক্তি বা দল রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকার নয়। তবে তারা রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে চায়। এজন্য তারা তাদের বিপক্ষ যোদ্ধা-অযোদ্ধা সবাইকে নির্বিচারে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে তাদের প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতি সাধন করতে থাকে। যাতে এক পর্যায়ে ভীত হয়ে সংশ্লিষ্ট সরকার ও জনগণ অভিষ্ট ‘রাজনৈতিক পরবর্তন’ করতে রাজি হয়্ সাধারণভাবে যারা সম্মুখ বা গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের উপর সামরিক বিজয় লাভ করতে পারবে না বলে মনে করে তারাই এরূপ সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়।

মানব ইতিহাসের সন্ত্রাসের বিস্তারিত আলোচনা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য ইসলামের নামে সন্ত্রাসের ইতিহাস পর্যালোচনা করে এর কারণ ও প্রতিকারের বিষয় চিন্তা করা। প্রাচীন যুগ থেকে ইহুদী উগ্রবাদী ধার্মিকগণ ‘ধর্মীয় আদর্শ’ প্রতিষ্ঠার জন্য সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়েছেন। মানব ইতিহাসে প্রাচীন যুগের প্রশিদ্ধতম সন্ত্রাসী কর্ম ছিল উগ্রপন্থী ইহুদী যীলটদের (Zealots) সন্ত্রাস। খৃস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী ও তার পরবর্তী সময়ে রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে বসবাসরত উগ্রবাদী এ সকল ইহুদী নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আপোসহীন ছিল। যে সকল ইহুদী রোমান রাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা করত বা সহঅবস্থানের চিন্তা করত এরা তাদেরকে গুপ্ত হত্যা করত। এজন্য এরা সিকারী (the Sicarii: dagger men) বা ছুরি-মানব নামে প্রসিদ্ধ ছিল। এরা প্রয়োজনে আত্মহত্যা করত কিন্তু প্রতিপক্ষের হাতে জীবিত ধরা দিত না। মধ্যযুগে খৃস্টানদের মধ্যে ধমীয় ও রাজনৈতিক কারণে সন্ত্রাসের অগণিত ঘটনা আমরা দেখতে পাই। বিশেষত ধর্মীয় সংস্কার, পাল্টা-সংস্কার (both the Reformation and the Counter-Reformation)-এর যুগে ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্টদের মধ্যে অগণিত যুদ্ধ ছাড়াও যুদ্ধ বহির্ভূত সন্ত্রাসের অনেক ঘটনা দেখা যায়।

ইসলামে রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত কোনো প্রকার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য প্রাণ বা সম্পদের ক্ষতি করা অত্যন্ত কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ কারণে ইসলামের ইতিহাসে সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের ঘটনা কম। ইসলামের ইতিহাসে আমরা যুদ্ধ দেখতে পেলেও সন্ত্রাস খুবই কম দেখতে পাই। ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন প্রকারের যুদ্ধ হয়েছে। যেমন মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে অমুসলিম রাষ্ট্রের, মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে মুসলিম রাষ্ট্রের, মুসলিম রাষ্ট্রের বিদ্রোহীদের যুদ্ধ ইত্যাদি। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম সমাজে মুসলমানদের মধ্যে অথবা অমুসলিমদের মধ্যে সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের মাধ্যমে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠা বা অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের উদাহরণ খুবই কম। এ জাতীয় যে সামান্য কিছু ঘটনা আমরা দেখতে পাই তার মধ্যে অন্যতম খারিজীদের কর্মকান্ড। সমকালীন সাহাবীগণের কর্মপদ্ধতি পর্যালোচনা করা অপরিহার্য। কেননা, প্রেক্ষাপট, কারণ ও তত্ত্ব সকল দিক থেকেই আধুনিক জঙ্গিবাদ প্রাচীন জঙ্গিবাদের সাথে একই সূত্রে বাঁধা।

ইসলামের ইতিহাসে উগ্রবাদের প্রথম ঘটনা আমরা দেখতে পাই খারিজী সম্প্রদায়ের কর্মকাণ্ড ৩ে৫ হিজরী সালে (৬৫৬ খৃ.) ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হযরত উসমান ইবন আফ্ফান রা. কতিপয় বিদ্রোহীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। বিদ্রোহীদের মধ্যে রাষ্টক্ষমতা দখলের বা রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার মত কেউ ছিল না। তারা রাজধানী মদীনার সাহাবীগণকে এ বিষয়ে চাপ দিতে থাকে। একপর্যায়ে হযরত আলী রা. খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। মুসলিম রাষ্ট্রের সেনাপতি ও গভর্নরগণ আলীর আনুগত্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। তিনি দাবি জানান যে, আগে খলীফা উসামের হত্যাকারীদের বিচার করতে হবে। আলী দাবি জানান যে, ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পূর্বে বিদ্রোহীদের বিচার শুরু করলে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পেতে পারে, কাজেই আগে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ক্রমান্বয়ে বিষয়টি ঘোলাটে হয়ে দু’পক্ষের যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। সিফ্ফীনের যুদ্ধে উভয় পক্ষে হতাহত হতে থাকে। এক পর্যায়ে উভয়পক্ষ আলোচনা মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য সালিসী মজলিস গঠন করেন।

এই পর্যায়ে আলী রা.-এ অনুসারীগণের মধ্যে থেকে কয়েক হাজার মানুষ আলীর পক্ষ ত্যাগ করে। এদেরকে ‘খারিজী’ (দলত্যাগী) বা বিদ্রোহী বলা হয়। এরা ছিল ইসলামের দ্বিতীয় যুগের মানুষ, যারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইন্তেকালের পর ইসলাম গ্রহণ করে। এদের প্রায় সকলেই ছিল যুবক। এরা ছিল অত্যন্ত ধার্মিক, সৎ ও নিষ্ঠাবান আবেগী মুসলিম। সারারাত তাহাজ্জুদ আদায় ও সারাদিন যিকর ও কুরআন অধ্যয়নে রত থাকার কারণে এরা ‘কুররা’ বা ‘কুরআন বিশেষজ্ঞ’ বলে সুপরিচিত ছিল। এরা দাবি করে যে, একমাত্র কুরআনের আইন ও আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনগণের দুই যুদ্ধে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও যদি তাদের একদল অপর দলের উপর অত্যাচার বা সীমালঙ্ঘন করে তাহলে তোমরা জুলুমকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। এখানে আল্লাহ দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, সীমালঙ্ঘনকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। মু’আবিয়ার দল সীমালঙ্ঘনকারী, কাজেই তাদের আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। এ বিষয়ে মানুষকে সালিস করার ক্ষমতা প্রদান অবৈধ। এছাড়া কুরআন কারীমে বলা হয়েছে: ‘কর্তৃত্ব শুধুমাত্র আল্লাহরই’ বা ‘বিধান শুধু আল্লাহরই।’ কাজেই মানুষকে ফয়সালা করার দায়িত্ব প্রদান কুরআনের নির্দেশের স্পষ্ট লঙ্ঘন। কুরআন কারীমে আরো বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারাই কাফির।’

উক্ত আয়াত সমূহের মর্ম উপলদ্ধি না করতে পেরে খারিজীরা বলে যে, আলী ও তাঁর অনুগামীগণ যেহেতু আল্লাহর নাযিল করা বিধান মত মু’আবিয়ার সাথে যুদ্ধ না চালিয়ে সালিসের বিধান দিয়েছেন, সেহেতু তাঁরা কাফির। তারা দাবি করে, আলী বা মু’আবিয়া বা ও তাঁদের অনুসারীগণ সকলেই কুরআনের আইন অমান্য করে কাফির হয়ে গিয়েছেন। কাজেই তাদের তাওবা করতে হবে। তাঁরা তাঁদের কর্মকে অপরাধ বলে মানতে অস্বীকার করলে তারা তাঁদের সাথে যুদ্ধ শুরু করে। তাঁরা নিজেদের মতের পক্ষে কুরআনের বিভিন্ন আয়াত উদ্বৃত করতে থাকে। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. ও অন্যান্য সাহাবী তাদেরকে এই মর্মে বুঝাতে চেষ্টা করেন যে, কুরআন ও হাদীস বুঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পারঙ্গম হলেন রসূলুল্লাহ (স)-এর আজীবনের সহচর সাহাবীগণ। কিন্তু তারা সাহাবীদেরকে দালাল, আপোসকামী, অন্যায়ের সহযোগী ইত্যাদি মনে করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে।

সালিসি ব্যবস্থা আলী রা. ও মু’আবিয়া রা. এর মধ্যকার বিবাদ নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ হওয়াতে তাদের দাবি ও প্রচারণা আরো জোরদার হয়। তারা আবেগী যুবকদেরকে বুঝাতে থাকে যে, আপোসকামিতার মধ্যদিয়ে কখনো সত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কাজেই দীন প্রতিষ্ঠার জন্য কুরআনের নির্দেশ অনুসারে জিহাদ চালিয়ে যেতে হবে। ফলে বছর খানেকের মধ্যেই তাদের সংখ্যা ৩/৪ হাজার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২৫/৩০ হাজার উন্নীত হয়। ৩৭ হিজরীতে মাত্র জ্জ হাজার মানুষ আলীর রা.’র দল ত্যাগ করে। অথচ ৩৮ হিজরীতে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে আলীর বাহিনীর বিরুদ্ধে খারিজী বাহিনীতে প্রায় ২৫ হাজার খারিজী বিদ্রোহী উপস্থিত ছিল।

আরবী সাহিত্যে রচিত এদের কবিতা ইসলামী জযবা ও জিহাদী প্রেরণায় ভরপুর। এদের নিষ্ঠা ছিল অতুলনীয়। রাতদিন নফল সালাতে দীর্ঘ সাজদায় পড়ে থাকতে থাকতে তাদের কাপালে দাগ পড়ে গিয়েছিল। তাদের ক্যাম্পের পাস দিয়ে গেলে শুধু কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজই কানে আসতো।’ কুরআন পাঠ করলে বা শুনলে তারা আল্লাহর ভয়ে, আখিরাতের ভয়ে ও আবেগে কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে যেত। পাশাপাশি এদের উগ্রতা ও হিংস্রতার কারণে ৩৭ তিজরী থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এদের গুপ্ত হত্যা ও যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। ৬৪-৭০ হিজরীর দিকে আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবাইর রা. ও উমাইয়া বংশের শাসকগণের মধ্যে যুদ্ধে তারা আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইরকে সমর্থন করে। কারণ তাদের মতে তিনিই ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন উসমান ও আলী রা.-কে কাফির বলে মানতে অস্বীকার করলেন এবং তাদের প্রশংসা করলেন তখন তারা তার বিরোধিতা শুরু করে।

৯৯-১০০ হিজরীর দিকে উমাইয়া খলীফা উমর ইবনে আব্দুল আযীয র. তাদের ধার্মিকতা ও নিষ্ঠার কারণে তাদেরকে বুজিয়ে ভাল পথে আনার চেষ্টা করেন। তারা তাঁর সততা, ন্যায়বিচার ও ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণের বিষয়ে একমত পোষণ করে। তবে তাদের দাবি ছিল, উসমান রা. ও আলী রা.-কে কাফির বলতে হবে, কারণ তারা আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত বিধান প্রদান করেছেন। এছাড়া ম’আবিয়া ও পরবর্তী উমাইয়া শাকদেরকেও কাফির বলতে হবে, কারণ তারা আল্লাহর বিধান পরিত্যাগ করে শাসকদের মনগড়া আইনে দেশ পরিচালনা করেন। যেমন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রাজকোষের সম্পদ যথেচ্ছ ব্যবহারে, শাসকের ক্ষমতা প্রদান ইত্যাদি। উমর ইবনে আব্দুল আযীয র. তাদের এ দাবি না মানলে শান্তি প্রচিষ্টা ব্যর্থ হয়। তাঁর নিজের শাসনকার্য ইসলামসম্মত বলে স্বীকার করা সত্ত্বেও তারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে।’ তারা মনে করতো যে, ইসলামী বিধিবিধানের সামান্য লঙ্ঘন হলেই মুসলিম ব্যক্তি কাফিরে পরিণত হয়। এজন্য তারা তাদের বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে দলবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করে এবং পাশাপাশি গুপ্ত হত্যা করে। এছাড়া যারা আলীকে কাফির মনে করেন না এরূপ সাধারণ অযোদ্ধা পুরুষ, নারী ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে।

এখানে উল্লেখ্য যে, অধিকাংশ সাহাবী আলী রা. ও মু’আবিয়া রা. থেকে মধ্যকার রাজনৈতিক মতবিরোধ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত ছিলেন। প্রসিদ্ধ তাবিয়ী মুহাম্মদ ইবনে সীরীন বলেন, ‘যখন ফিতনা শুরু হলো, তখন হাজার হাজার সাহাবী জীবিত ছিলেন। তাদের মধ্যে থেকে ১০০ জন সাহাবীও এতে অংশগ্রহণ করেননি। এতে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের সংখ্যা ৩০ জনের ও কম ছিল।’ এ সকল সাহাবী ও অন্যান্য সাহাবী-তাবেয়ীগণ নৈতিকভাবে আলীর রা. কর্ম সমর্থন করতেন। তাঁকে পাপী বা ইসলামের নির্দেশ লঙ্ঘনকারী বলতে কখনোই রাজি হতেন না। খারিজীরা এদেরকেও কাফির বলে গণ্য করতো এবং হত্যা করতো।

সাহাবী খাব্বাব ইবনুল আরাত রা.-এর পুত্র আব্দুল্লাহ তাঁর স্ত্রী-পরিজনদের নিয়ে পথে চলছিলেন। খারিজীরা তাঁকে উসমান রা. ও আলী রা. সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তিনি তাঁদের সম্পর্কে ভাল মন্তব্য করেন। তখন তারা তাঁকে নদীর ধারে নিয়ে জবাই করে এবং তাঁর গর্ভবর্তী স্ত্রী ও কাফেলার অন্যান্য নারী ও শিশুকে হত্যা করে। এ সময়ে তারা একস্থানে বিশ্রাম করতে বসে। সেখানে একটি খেজুর গাছ থেকে একটি খেজুর ঝরে পড়লে একজন খারিজী তা তুলে নিয়ে মুখে দেয়। তখন অন্য একজন বলে, তুমি মূল্য না দিয়ে পরের দ্রব্য ভক্ষণ করলে? লোকটি তাড়াতাড়ি খেজুরটি উগরে ফেলে দেয়। আকেরজন খারিজী একটি শূকর দেখে তার দেহে নিজের তরবারি দিয়ে আঘাত করে। তৎক্ষণাৎ তার বন্ধুরা প্রতিবাদ করে বলে, এতো অন্যায়, তুমি এভাবে আল্লাহর যমীনে বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছ ও পরের সম্পদ নষ্ট করছ! তখন সেই খারিজী শূকরের অমুসলিম মালিককে খুঁজে তাকে টাকা-পয়সা দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেয়।

রসূলুল্লাহ স. এদের ধর্মনিষ্ঠা ও উগ্রতার বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। আবু সাঈদ আল খুদরী রা. বলেন, রসূলুল্লাহ স. বলেন: ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি সম্প্রদায় বের হবে, যাদের সালাতের সামনে তোমাদের সালাত তোমাদের কাছে তুচ্ছ মনে হবে, যাদের সিয়ামের সামনে তোমাদের সিয়াম তুচ্ছ মনে হবে, যাদের সৎকর্মের কাছে তোমাদের কর্ম তোমাদের কাছেই নগণ্য মনে হবে, তারা কুরআন পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তীর যেমন শিকারের দেহ ভেদ করে বেরিয়ে যায়, তেমনিভাবে তারা দীন থেকে বেরিয়া যাবে।’ 

এই অর্থে ১৭ জন সাহাবী থেকে প্রায় ৫০টি পৃথক সূত্রে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ সকল হাদীস প্রমাণ করে যে, বাহ্যিক আকর্ষণীয় ধর্মনিষ্ঠা, সততা ও ঐকান্তিকতা সত্ত্বেও অনেক মানুষ উগ্রতার কারণে ইসলাম থেকে বিচ্যুত হবে। এ সকল হাদীস যদিও সবর্জনীন এবং সকল যুগেই এরূপ মানুষের আবির্ভাব হতে পারে, তবে সাহাবীগণের যুগ থেকে মুসলিম উম্মাহর আলেমগণ একমত যে, এ ভবিষ্যদ্বাণীর প্রথম প্রতিফলন হয়েছিল খারিজীদের আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে।

রসূলুল্লাহ স.-এর প্রায় অর্ধশত হাদীস থেকে আমরা এদের বিভ্রান্তির কারণ ও এদের কিছু বৈশিষ্ট্য জানতে পারি। আবূ সাঈদ খুদরী রা. বলেন, ইয়ামন থেকে আলী রা. মাটি মিশ্রত কিছু স্বর্ণ প্রেরণ করেন। রসূল স. উক্ত স্বর্ণ ৪ জন নওমুসলিম আরবীয় নেতার মধ্যে বণ্টন করে দেন। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ