ঢাকা, রোববার 02 March 2017, ১৯ চৈত্র ১৪২৩, ০৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

১৮৬৩ সালের আজকের দিনে মোহামেডান লিটারারি সোসাইটির প্রতিষ্ঠা

১৮৫৭ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের ছয় বছর পর ১৮৬৩ সালের ২ এপ্রিল নওয়াব আব্দুল লতিফ কোলকাতায় প্রতিষ্ঠা করলেন ‘মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি’। সশস্ত্র সংগ্রামোত্তর মুসলিম জাতীয় জীবনে এ ধরনের সংস্থা, সমিতি গঠন এই প্রথম। সমিতির প্রথম  বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় কোলকাতার নওয়াব আব্দুল লতিফের ১৬নং তালতলা লেনস্থ বাড়িতে ২রা এপ্রিল তারিখে।
মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি বিরাট এক দুঃসময়ে মুসলিম জাতি-স্বার্থকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে। ভারতীয় স্বার্থের সাইনবোর্ডে হিন্দুরা যখন সব অধিকার একাই কুক্ষিগত করছিল, তখন মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি প্রথমবারের মতো মুসলিম স্বার্থের প্রয়োজন আলাদাভাবে তুলে ধরে। মোহসীন ফান্ডের টাকা লুটেপুটে খাওয়া হচ্ছিল। যাদের জন্যে এই টাকা এবং যাদের জন্যে এটা বেশি প্রয়োজন, সেই মুসলমানরা মোহসীন ফান্ডের টাকা পাচ্ছিল না। নওয়াব আব্দুল লতিফ তাঁর অক্লান্ত চেষ্টা দ্বারা বাংলার গবর্নর স্যার ক্যাম্পবলকে বুঝাতে সক্ষম হলেন যে, মোহসীন ফান্ডের টাকা দাতার ইচ্ছানুযায়ী ব্যবহৃত হচ্ছে না। ফলস্বরূপ বাংলার বৃটিশ প্রশাসন ১৮৭৩ সালের ২৯ জুলাই গৃহীত এক প্রস্তাব অনুসারে মোহসীন ফান্ডের টাকা শুধু মুসলমানদের জন্যে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তখন থেকে হুগলী কলেজ সরকারি হয়ে গেল এবং মোহসীন ফান্ডের টাকা মুসলমানদের শিক্ষার কাজে নিয়োজিত হয়। এই টাকায় হুগলী ও কোলকাতা মাদরাসার উন্নতি, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে মাদরাসা স্থাপন এবং মুসলিম ছাত্রদের জন্যে বৃত্তির ব্যবস্থা করা হলো। সরকার ৯টি জিলা স্কুলে আরবী ও ফার্সির শিক্ষক রাখার নির্দেশ দিলেন। এত বড় কাজ সম্ভব হয়েছিল বৃটিশ প্রশাসনের সাথে নওয়াব আব্দুল লতিফের সুসম্পর্কের ফলেই। উল্লেখ্য, মোহামেডান লিটারারি সোসাইটির দ্বিতীয় আলোচনাসভাতেই নওয়াব আব্দুল লতিফ গবর্নর জেনারেল স্যার লরেন্সকে প্রধান অতিথি করে আনতে সমর্থ হন। এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৬৬ সালের ৬ মার্চ।
মোহামেডান লিটারারি সোসাইটির মাধ্যমে নওয়াব আব্দুল লতিফের চেষ্টায় জাতি হিসেবে মুসলমানরা ঊনিশ শতকের সত্তরের দশকেই আরও কিছু সুবিধা অর্জনে সমর্থ হলো। ১৮৭১ সালের ৭ আগস্ট ভারতের বৃটিশ সরকার প্রাদেশিক সরকারগুলোকে  নির্দেশ দিল যে, (ক) সকল সরকারি বিদ্যালয় ও কলেজে মুসলমানদের ধর্মীয় ও মাতৃভাষা শিখবার উৎসাহ দিতে হবে, (খ) মুসলিম অধ্যুষিত জিলাসমূহে স্থাপিত ইংরেজি বিদ্যালয়গুলোতে অধিকতর যোগ্য মুসলমান ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে, (গ) নিজেদের মাতৃভাষা শিক্ষায় বিদ্যালয় ও ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য মুসলমানদের অধিকতর অর্থ সাহায্য দিতে হবে, (ঘ) নিজেদের মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনার জন্যে মুসলমানদের অধিকতর উৎসাহ দিতে হবে।’
আজকের বিচারে এই পাওয়াগুলো হয়তো খুব বড় নয় কিংবা এর অন্য রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও হতে পারে। যখন বৃষ্টিশ শাসন বিদ্রোহী জাতি মুসলমানদের পিষে ফেলতে ব্যস্ত এবং হিন্দুরা যখন জাতি হিসেবে মুসলমানদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব মুছে ফেলতে মরিয়া, তখনকার সেই ঘোর অমানিশার দিনগুলোতে জাতি হিসেবে মুসলমানদের এই আলাদা প্রাপ্তি মোটেই ছোট ঘটনা ছিল না। এই সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে অন্তত শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানদের আলাদা জাতীয় স্বীকৃতি ও স্বার্থ চিহ্নিত হয়েছিল। জাতি হিসেবে মুসলমানদের স্বতন্ত্র উত্থানের ক্ষেত্রে এ ছিল এক পাতার এমন একটা চারাগাছ যা ক্রমে বহু পত্র, বহু শাখায় শোভিত হয়ে তার গর্বোন্নত মাথা ঊর্ধ্বে বিস্তার করেছিল ১৯০৬ সালে ঢাকার শাহবাগে। (‘একশ বছরের রাজনীতি’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত ও সংক্ষেপিত)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ