ঢাকা, রোববার 02 March 2017, ১৯ চৈত্র ১৪২৩, ০৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

উগ্রপন্থী দলের উত্থান ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : [তিন]
কিন্তু খারিজীরা সাহাবীগণ ও সাধারণ মুসলিমদেরকে কাফির বলেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা তাদেরকে ঢালাওভাবে হত্যা করার বৈধতা দিয়েছে। তারা মুসলিম দেশকে ‘দারুল কুফর’ বা অনৈসলামিক রাষ্ট্র বলে গণ্য করেছে এবং তারা মুসলিম নাগরিকদেরকে ঢালাওভাবে হত্যা ও তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করার বৈধতা ঘোষণা করেছে। অবশ্য তারা মুসলিমদেরকেই হত্যা করেছে এবং অমুসলিম নাগরিকদের হত্যঅ করা থেকে বিরত থেকেছে। ইসলামের মাধ্যমে রসূলুল্লাহ স. গোত্র কেন্দ্রিক শতধাবিভক্ত আরব সমাজকে বিশ্বের সর্বপ্রথম আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেন।
আরবরা রাষ্ট্রীয় আনুগত্য বুঝতো না। তারা বুঝতো গোত্র প্রধাননের আনুগত্য। বিচ্ছিন্নভাবে ছোট বা বড় গোত্রের অধীনে তারা বাস করতো। গোত্রের বাইরে কারো আনুগত্য বা অধীনতাকে তারা অবমাননাকর মনে করত। এছাড়া ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবোধ, স্বাধীনতাবোধ ইত্যাদি তাদেরকে তাদের মতের বাইরে সকল সিদ্ধান্ত অমান্য করতে প্ররোচিত করতো।
রসূলুল্লাগ স. এই বিচ্ছিন্ন জাতিকে প্রথমবারের মত কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসেন। তিনি এজন্য বারবার তাদেরকে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের মধ্যে অবস্থান করতে নির্দেশ দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় ঐক্য বা ‘আল-জামা’আত’, রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য বা ‘আল-ইমাম’, বা ‘আল-আমীর’ রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের শপথ বা ‘বাইয়াত’ ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর অগণিত সুষ্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য বর্জন করা, রাষ্ট্রদ্রোহিতা করা, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে বা রাষ্ট্রহীনভাবে বাস করাকে তিনি জাহিলী জীবন ও এই অবস্থার মৃত্যুকে জাহিলী মৃত্যু বলেছেন। পছন্দ হোক বা না হোক মুসলিম রাষ্ট্র প্রশাসনের বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে গণমানুষের অশান্তি ও ক্ষয়ক্ষতি করা যাবে না। সংঘাতে লিপ্ত হওয়া যাবে না। প্রয়োজনে রাষ্ট্র প্রধানকে সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ ও সংশোধন করতে হবে। কিন্তু বিদ্রোহ, গৃহযুদ্ধ ও হানাহানি তিনি কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন।
সুন্নাতে নববী ও সাহাবীগণের দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে কুরআন ও ইসলাম বুঝতে গিয়ে খারিজীরা মারাত্মক বিভ্রান্তিতে পতিত হয়। ‘ন্যায়ের আদেশ, অন্যায়ের প্রতিরোধ’- এর নামে তারা রাষ্ট্রদ্রোহিতা করে ও রাষ্ট্রীয় আনুগত্য অস্বীকার করে। এছাড়া তারা রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তাও বুঝতে অক্ষম হয়। তারা শুধু বলতো ‘কর্তৃত্ব বা দিবান কেবলমাত্র আল্লাহরই’। এ দ্বারা তারা বুঝাতো, আল্লাহ ছাড়া কোনো শাসন বা কর্তৃত্ব চলবে না। আল্লাহর বিধান যে যেভাবে বুঝবে সেভাবে পালন করবে। এভাবে প্রথমে খারিজীগণ রাষ্ট্র, রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রশাসনের কোনো গুরুত্ব স্বীকার করত না। পরবর্তীতে কেউ কেউ তাদেরকে রাষ্ট্র, ইমাম, বাইয়াত ইত্যাদির গুরুত্বের বিষয়ে বললে তারা তাদের মধ্যে থেকে একজনকে ‘আমীর’ বা ইমাম বলে ‘বাইয়াত’ করে নেয়। এভাবে রাষ্ট্রীয় পরিভাষাগুলোকে ‘দলের’ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে। ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্র বিষয়ে তাদের মধ্যে বিভিন্ন মতবাদের জন্ম নেয়।
কুরআন-হাদীসে অগনিত স্থানে জিহাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং জিহাদের জন্য মহান পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছাড়াও মুসলিম-অমুসলিম সকলের মধ্যে ‘সৎকাজের আদেশ ও অন্যায় থেকে নিষেধ করতে’ নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে বিভ্রান্তির ফলে খারিজীরা রাষ্ট্রীয় ফরয ও ব্যক্তিগথ ফরযের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতো না। তারা জিহাদ ও ‘আদেশ-নিষেধ’ বিষয়ক কুরআনী নির্দেশনার আলোকে প্রচার করে যে, জিহাদ ও আদেশ-নিষেধ ইসলামের রুকন ও ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয।
‘খারিজীদের আগ্রাসী আদর্শবাদের দ্বিতীয় ভিত্তি ছিল জিহাদ। খারিজীরা জিহাদকে ইসলামের মূল ভিত্তি বা রুকন বলে মনে করে। অধিকাংশ মুসলিমের মতের বিপরীতে খারিজীরা কুরআন নির্দেশমত ‘সৎকাজের আদেশ ও অন্যায় থেকে নিষধ’ বলতে তরবারির জোরে সত্য প্রতিষ্ঠা বুঝাতো।... তারা ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের সাথে জিহাদকে ষষ্ঠ স্তম্ভ হিসেবে যুক্ত করে..। প্রকৃতপক্ষে তারা ‘জিহাদ’- কে ইসলামের সবচেয়ে বড় করুন মনে করতো ‘জিহাদের’ নামে ইসলামে নিষিদ্ধ খুনখারাবিতে লিপ্ত হতো। এটিই ছিল তাদের মারাত্মক বিভ্রান্তি। কোনো মুসলিমকে কাফির বলা কঠিন বিভ্রান্তি। তা সন্ত্রাসের পথ উন্মুক্ত করে। ঢালাওভাবে যোদ্ধা-অযোদ্ধা সকল কাফিরকে হত্যা করা বৈধ মনে করা মারাত্মক বিভ্রান্তি।
ইসলামী আইনে কোন মুসলিমকে কোনো কারণে কাফির বলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ যদি না সেই ব্যক্তি ইসলামের কোন মৌলিক বিশ্বাসকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করে। বিচারের মাধ্যমে হত্যাযোগ্য অপরাধীকে এবং যুদ্ধের ময়দানে যোদ্ধা পুরুষ ছাড়া অন্য কোনো কাফিরকে হত্যা কারাও কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। যুদ্ধ ঘোষণা ও বিচার ব্যবস্থাকে একান্তভাবেই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। যেন কেউ কখনো ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দিতে বা হত্যা করতে না পারে। পাশাপাশি জার্তি- ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রাণ, সম্পদ ও মর্যাদার ক্ষতি করাকে হারাম ঘোষাণা দেয়া হয়েছে। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ