ঢাকা, রোববার 02 March 2017, ১৯ চৈত্র ১৪২৩, ০৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মুমিনের জয়-পরাজয়

মনির হোসেন হেলালী : “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের থেকে তাদের প্রাণ ও ধন-সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে অত:পর তারা (কাফেরদের) মারে এবং (নিজেরাও) মরে। তাদের প্রতি তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনে (জান্নাত) দানের পাকাপোক্ত ওয়াদা করা হয়েছে। আল্লাহর চাইতে বেশি ওয়াদা পূরণকারী কে আছে? অতএব, (হে মুমিনরা!) তোমরা খুশি হয়ে যাও সেই বেচা-কেনার জন্য, যা তোমরা আল্লাহার সাথে করেছো। আর এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। [সূরা আততাওবাহ : ১১১]” আয়াতটি মুমিন হৃদয়ে নাড়া দেয় বারবার।
মুমিনের পরিচয় : সাধারণত মুমিন শব্দটি আরবি। এর অর্থ বিশ্বাসী, আত্মসমর্পণকারী, নতশির ইত্যাদি। নিজের সকল চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, সুখ-আনন্দকে বিসর্জন দিয়ে জীবনের সকল ক্ষেত্রে কেবলমাত্র মহান রবের নির্দেশকে যিনি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন বা মেনে নেন তাকেই পরিভাষায় মুমিন বলা হয়।
কুরআনের ভাষায় মুমিনের পরিচয় : কুরআন মাজীদের ভাষায় প্রকৃত ঈমানদার তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান এনেছে এবং এ ব্যাপারে পরে আর কোন সন্দেহ পোষণ করেনি। তারপর জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে। তারাই সত্যবাদী। [সূরা হুজুরাত-১৫] এ ছাড়াও কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় মুমিনের বিভিন্ন পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। যেমন- সূরা আল মুমিনুন-এর ২ থেকে ৯ নং আয়াতে, সূরা আল ফুরকানের ৬৩ থেকে ৬৮ নং আয়াতে, সূরা আলআনফালের ২-৩ নং আয়াতে এক এক করে মুমিন জীবনের বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। এসব কিছু মুমিনজীবনের স্থায়ী কর্মনীতির বহিঃপ্রকাশ। মুমিনের জীবনের স্থায়ী কর্মনীতি সংগ্রাম বা জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহ। জিহাদে ফি-সাবিলিল্লাহের কথা বর্ণিত হয়েছে সূরা বাকারার ১৯০-১৯৩, ২৪৪ নং আয়াতে, সূরা নিসার ৮৪ ও ৯৫ নং আয়াতে, আলআনফাল এর ৭২, ৭৪, ৭৫ নং আয়াতে, সূরা তওবা এর ১২-১৬, ২০, ২৪, ৩৬, ১২৩ নং আয়াতে, সূরা মুহাম্মদ এর ৪ নং আয়াতে, সূরা সফ এর ১১ নং আয়াতসহ কুরআনের বিভিন্ন সূরাতে।
জিহাদ বিবর্জিত জীবন মুমিনের জন্য অসম্ভব। মুমিনের জিহাদ বিবর্জিত জীবনের কামনাকারীরা ইসলামের শত্রু ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু বিশ্বময় ইসলামের শত্রুরা বিজয়ীর আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে মুসলমানদের জিহাদবিমুখ করে তুলছে, ইসলামকে শুধুমাত্র তপস্যা ভারাক্রান্ত একটি ধর্ম হিসেবে মানতে উদ্বুদ্ধ করছে।
মুমিনের জীবনের লক্ষ্য : মুমিনের জীবনের লক্ষ্য ও কর্মবিন্দু একটি, আর তা হলো দুনিয়া জাহানের মালিক ও খালিক আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা এবং তার নারাজ ও ক্রোধ থেকে বাঁচবার জন্য সাধ্যমত অবিরাম চেষ্টা সাধনা করা বা জিহাদ চালিয়ে যাওয়া। মুমিন বান্দাহ মেহনত ও পরিশ্রম দ্বারা আল্লাহ নিয়ামত বরকত ও ফজিলতের যে ব্যবস্থা মুমিন বান্দাহর জন্যে করে রেখেছেন তা সে হাসিল করতে সক্ষম হবে। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় আমাদের সমাজে অনেকেই ‘জিহাদ’ ও ‘মেহনত’কে বিকৃত অর্থে ব্যবহার করতে চায়। আবার কেউ কেউ আল্লাহর রাস্তায় মেহনতকে খুব সীমিত অর্থে ব্যবহার করে। প্রকৃত পক্ষে ‘আল্লাহর রাস্তায় মেহনত করার অর্থ খুব ব্যাপক এবং তা উম্মতের প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর অবশ্য কর্তব্য। নিজের সাধ্যানুযায়ী আল্লাহর পয়গামকে মানুষের কাছে পেশ করা, আল্লাহর হুকুমকে সমাজে চালু করা ও আল্লাহর কলেমাকে বুলন্দ করা এবং আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে লিখনী ও বক্তৃতা, কূটনীতি এবং অস্ত্রের দ্বারা অবিরাম সংগ্রাম (জিহাদ) করার অর্থ হলো আল্লাহর রাস্তায় মেহনত করা।’ [মা‘আরেফুল হাদীস]
জান্নাতের পথই মুমিনের পথ : আল্লাহ তা‘আলার সাথে মুমিন বান্দাহ জান্নাতের বিনিময়ে জান-মাল, লেনদেনের যে চুক্তি করেছে- এর জন্য আনন্দ প্রকাশ করা উৎফুল্ল হওয়া উচিত। কেননা খাঁটি মুমিনরা স্থায়ী জান্নাতের বিনিময়ে অস্থায়ী জান-মালের বিনিময় করেছে, যা মুমিনদের জন্য এক অতি বড় নিয়ামতপূর্ণ সফলতা। প্রকৃতপক্ষে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় এবং চূড়ান্ত সফলতাই তো হলো চির সুখের জান্নাত লাভ। মুমিন জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যই হলো আখিরাতে নাজাতের মাধ্যমে জান্নাত লাভ। আর এ সুসংবাদ যে দুনিয়া থেকে নগদে পাওয়া যায় তা আমরা দেখতে পাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীদের জীবনে। সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী মুসয়াব বিন উমাইর রাদিআল্লাহু আনহু যিনি মদীনায় গিয়ে ব্যাপকভাবে ইসলামের দাওয়াত এবং কুরআনের শিক্ষা দিতে থাকেন। যার ফলে মদীনাবাসীর বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী ইসলামের পতাকাতলে শামীল হয়ে যায়। এই মুসয়াব বিন উমাইর রাদিআল্লাহু আনহু ওহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আল্লাহর হাবীব তাঁর হাতে ইসলামের পতাকা তুলে দেন। মুসলিম সেনাপতি মুসয়াব বিন উমাইর রাদিআল্লাহু আনহু জিহাদের ময়দানে অসংখ্য কাফিরকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়ে ইবনে কুমিয়্যার হাতে তিনিও নির্মমভাবে শহীদ হন। মুসয়াব বিন উমাইর রাদিআল্লাহু আনহু এমনই সাহাবী যিনি বদরী সাহাবীদের জন্য দু’শ’ দিরহাম মূল্যের কাপড় কিনে হাদিয়া করে দিয়েছিলেন। আল্লাহর হাবীব শোহাদায়ে ওহুদদের জানাজা পড়লেন এবং দু‘আ করলেন। এমনিভাবে মহিলা সাহাবীও ছিলেন যার নাম নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জবানে বারবার বলতেন তিনি আর কেউ নন নাসিয়া বিনতে কা’ব রাদিআল্লাহু আনহা। যিনি ওহুদের ময়দানে নিজের দু’সন্তান এবং স্বামীসহ অংশগ্রহণ করেন। অতএব, সুসংবাদ প্রাপ্তদের পথই হলো জান্নাতের পথ। এটাই প্রত্যেক মুমিনের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
মুমিনের জয়-পরাজয় : বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘জয়’ এর অর্থ করেছে- বশে আনা, আয়ত্তকরণ, বিপক্ষের পরাভব বা পতন সাধন, সাফল্য, কৃতকার্যতা ইত্যাদি। আর পরাজয় বলতে আমরা বুজি হারা বা অন্যের কাছে ধরাশায়ী হওয়া ইত্যাদি।
জয়-পরাজয় শব্দ দু’টির সাথে আমরা মোটামুটি ভালই পরিচিত। কারণ প্রায় দুইশ’ বছর ধরে ব্রিটিশদের শোষণ, দীর্ঘ সময় পাকিস্তানি শাসন আমাদেরকে তা ভালভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে। বাকিটুকু ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের সংগ্রাম চোখে আঙ্গুল দিয়ে উপলব্ধি করিয়েছে। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বাধহীন রক্তস্রোতের বিনিময়ে পেয়েছি ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের স্বাদ। এ দিনেই আমরা পরিত্রাণ পেয়েছিলাম পাকিস্তানি শোষণ থেকে, পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে। তাই ১৬ ডিসেম্বর আমাদের শৌর্য ও বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের মহান বিজয়ের দিন। এ বিজয় দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী বিজয়। মুমিনের জন্য পরকালে রয়েছে আরো বড় বিজয়। কিন্তু পরকালের কঠিন বিভীষিকাময় দিনগুলো পার করে আমরা কি অর্জন করতে পারবো সে বিজয়?
মহান আল্লাহও যার প্রতি উৎসাহ মূলক নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, এরূপ সাফল্যের জন্যই ‘আমলকারীদের আমল করা উচিত। [ সূরা সাফ্ফাত : ৬১]
সাফল্যের আরবি শব্দরূপ হচ্ছে, ‘ফওয’, লিসানুল আরব অভিধানে এর অর্থ করা হয়েছে, কল্যাণ ও কাক্সিক্ষত লক্ষ্য সাধনের মাধ্যমে কৃতকার্য হওয়া। প্রখ্যাত ভাষাবিদ ইমাম রাগেব বলেছেন, ‘ফওয’ অর্থ, শান্তি ও নিরাপত্তাসহ কল্যাণ সাধনের মাধ্যমে কৃতকার্য হওয়া।
সাফল্যের উপায়-উপকরণ : মানব জীবনে সফলতার জন্য যে সব উপায়-উপকরণগুলো খুবই জরুরি তা নিম্নরূপ।
এক. ঈমান ও নেক আমল : কুরআন মাজীদে এসেছে, ‘অত:পর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের রব পরিণামে তাদেরকে স্বীয় রহমতে প্রবেশ করাবেন। এটিই সুস্পষ্ট সাফল্য।’ [সূরা জাসিয়া : ৩০] ‘নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। যার তলদেশে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ। এটাই বিরাট সফলতা।’ [সূরা বুরূজ : ১১]
দুই. সততা : কুরআন মাজীদে এসেছে, আল্লাহ বলবেন, ‘এটা হল সেই দিন যেদিন সত্যবাদীগণকে তাদের সততা উপকার করবে। তাদের জন্য আছে জান্নাতসমূহ যার নীচে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সেখানে তারা হবে স্থায়ী। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। এটা মহাসাফল্য।’ [সূরা মায়েদা : ১১৯]
তিন. মুমিনদের পারস্পরিক বন্ধুত্ব : কুরআন মাজীদে এসেছে, ‘আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদেরকে আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ, তাতে তারা চিরদিন থাকবে এবং (ওয়াদা দিচ্ছেন) স্থায়ী জান্নাতসমূহে পবিত্র বাসস্থানসমূহের। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি সবচেয়ে বড়। এটাই মহাসাফল্য।’ [সূরা তাওবা : ৭১-৭২]
চার. আল্লাহভীতি ও তাকওয়া : কুরআন মাজীদে এসেছে, ‘আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করে, তারাই সফল ও কৃতকার্য।’ [সূরা আননূর : ৫২]
পাঁচ. সম্পদ ও জীবন দ্বারা জিহাদ করা : কুরআন মাজীদে এসেছে, ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে আর আল্লাহর পথে নিজদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করেছে, আল্লাহর কাছে তারা বড়ই মর্যাদাবান আর তারাই সফলকাম।’ [ সূরা তাওবা : ২০]
এখানে মালকে জানের আগে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, যে ব্যক্তি মাল ব্যয় করতে পারে না তার দ্বারা জান ব্যয় করার আশাও করা যায় না। প্রকৃত মুজাহিদ দুনিয়া ও পার্থিব সামগ্রীকে একেবারে তুচ্ছ জ্ঞান করে, এর অসারতা তার কাছে দিবালোকের মত পরিষ্কার থাকে। তাই নিজ জান ও মাল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার জন্য পেশ করা তার কাছে কোন ব্যাপারই না। যদি পার্থিব জীবন ও তার ভোগ সামগ্রীর কোন মূল্য তার কাছে থাকতো তাহলে এত অনায়াসে এমনটি করতে পারতো না। [তাফসির আর-রাযি : ৭/৪৮২]
ছয়. নির্যাতন, নিপীড়ন ও তিরস্কারের মুখে ধৈর্য্যধারণ করা : কুরআন মাজীদে এসেছে, ‘নিশ্চয় আমি তাদের ধৈর্য্যরে কারণে আজ তাদেরকে পুরস্কৃত করলাম, নিশ্চয় তারাই হল সফলকাম।’ [সূরা মুমিনূন : ১১১]
সাত. আল্লাহর সাথে কৃত আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা :  কুরআন মাজীদে এসেছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের থেকে তাদের প্রাণ ও ধন-সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে অতঃপর তারা (কাফেরদের) মারে এবং (নিজেরাও) মরে। তাদের প্রতি তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনে (জান্নাত) দানের পাকাপোক্ত ওয়াদা করা হয়েছে। আল্লাহর চাইতে বেশি ওয়াদা পূরণকারী কে আছে? অতএব, (হে মুমিনরা!) তোমরা খুশি হয়ে যাও সেই বেচা-কেনার জন্য, যা তোমরা আল্লাহার সাথে করেছো। আর এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। [সূরা আততাওবাহ : ১১১]
আট. আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য এবং সত্য ও ন্যায়সঙ্গত কথা বলা : কুরআন মাজীদে এসেছে, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজগুলোকে শুদ্ধ করে দেবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই এক মহা সাফল্য অর্জন করল।’ [সূরা আহযাব : ৭০-৭১]
আনুগত্য তো নিজেই এক মহা সাফল্য। আনুগত্য হচ্ছে, আল্লাহর নির্দেশিত পথে অবিচল থাকা। আর আল্লাহর নির্দেশিত পথে অবিচল থাকা হলো স্বস্তি ও প্রশান্তি। আর স্বচ্ছ-সঠিক রাস্তার দিশা পাওয়া ও সে পথে পরিচালিত হওয়া পরম সৌভাগ্য। [ফী জিলালিল কুরআন : ৬/১০২]
কুরআন মাজীদে সাফল্যের কিছু চিত্র
প্রথমত, জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভ ও জান্নাতে প্রবেশ : কুরআন মাজীদে এসেছে, ‘সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে।’ [সূরা আলে ইমরান : ১৮৫] অর্থাৎ যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে মুক্তি দেয়া হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে মুক্তি পেয়ে গেল এবং মহা সম্মানে পুরস্কৃত হয়ে উচ্চতর সফলতা লাভ করল। [তাফসির তাবারি : ৭/৪৫২]
সাহাবি সাহল বিন সা’দ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, জান্নাতে তোমাদের লাঠি রাখার সমপরিমাণ জায়গা দুনিয়া ও তাতে যা আছে তার থেকে অনেক উত্তম। অতঃপর এই আয়াত তিলাওয়াত করেছেন, (অনুবাদ) সুতরাং যাকে  জাহান্নাম  থেকে  দূরে  রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। [সহীহ আলবুখারী : ৩০১১] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, যে ব্যক্তি কামনা করে যে, তাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করান হবে, তার কাছে মৃত্যু যেন এমতাবস্থায় উপস্থিত হয় যে, আল্লাহ ও পরকালের প্রতি তার ঈমান আছে এবং মানুষের সাথে এমন আচরণই করে, তাদের থেকে সে নিজে যেমনটি আশা করে। [সহীহ মুসলিম : ৬৯৬৪]
হাদীসে নির্দেশিত বিষয়দ্বয়ের প্রথমটি আল্লাহর অধিকার সংরক্ষণ সম্পর্কিত আর দ্বিতীয়টি বান্দার অধিকার সংরক্ষণ সম্পর্কিত। অর্থাৎ, যদি কোন লোক হক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদের প্রতি বিশেষ যতœবান থেকে পার্থিব জীবন অতিবাহিত করে, তাহলে পরকালীন জীবনে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভের কাক্সিক্ষত আশা তার পূরণ হওয়াতে আর কোন বাধা থাকবে না। আর সে হবে মহা সফলতায় সফল।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর পক্ষ হতে সন্তুষ্টির ঘোষণা : আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ, তাতে তারা চিরদিন থাকবে এবং (ওয়াদা দিচ্ছেন) স্থায়ী জান্নাতসমূহে পবিত্র বাসস্থানসমূহের। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি সবচেয়ে বড়। এটাই মহাসফলতা। [সূরা তাওবা : ৭২]
মহান আল্লাহর জান্নাতবাসীদের সাথে কথোপকথন প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী উদ্ধৃত করেছেন, সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতবাসীদেরকে সম্বোধন করে বলবেন, হে জান্নাতিরা! তারা উত্তর দিবে, লাব্বাইকা রাব্বানা ওয়া সা’দাইকা ওয়াল খাইরু বিয়াদাইকা ... আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ? তারা বলবে, কেন হব না... হে রব? অথচ আপনি আমাদের দান করেছেন যা আপনার আর কোন সৃষ্টিকে করেননি? তখন আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমাদেরকে তার চেয়েও উত্তম (বস্তু) দেব না? তারা বলবে, হে রব, তার চেয়েও উত্তম আর কী আছে? আল্লাহ বলবেন, আমার সন্তুষ্টি তোমাদের জন্য উন্মুক্ত-অবারিত করে দিলাম, আজকের পর থেকে আর কখনো তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হব না। [সহীহ আলবুখারী : ৬৯৬৪]
অবিশ্বাসী মুনাফেকের দৃষ্টিতে মহাসাফল্য : কুরআন মাজীদে এসেছে, ‘আর তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন অনুগ্রহ এসে পৌঁছলে অবশ্যই সে বলবে যেন তোমাদের ও তার মধ্যে কোন হৃদ্যতা ছিল না, হায়! যদি আমি তাদের সাথে থাকতাম, তাহলে আমি মহাসাফল্য অর্জন করতাম।’ [সূরা নিসা : ৭৩] অর্থাৎ, তাদের সাথে যদি থাকতাম তাহলে আমারও একটি ভাগ (গণিমত) নিশ্চিত হত। পার্থিব ভোগ সামগ্রীই তার মূল লক্ষ্য। চূড়ান্ত আকাক্সক্ষা তার এসবকে ঘিরেই। [তাফসির ইবন কাসির : ২/৩৫৮]
সাহাবাদের দৃষ্টিতে সফলতা : সাহাবি আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনী সুলাইম গোত্রের সত্তর জনের একটি দল বনী আমের গোত্রের প্রতি প্রেরণ করেন। তারা সেখানে পৌঁছলে আমার মামা বললেন, তোমাদের আগে আমি যাই, যদি তারা আমাকে রাসূলুল্লাহ সম্বন্ধে বলার সুযোগ ও নিরাপত্ত দেয়। (তাহলে ভাল) আর না হয় তোমরা আমার নিকটবর্তী থাকবে। এরপর তিনি অগ্রসর হলেন এবং তারাও নিরাপত্তা দিল। তিনি তাদেরকে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্বন্ধে বলছিলেন এরই মাঝে তারা তাদের এক লোককে ইঙ্গিত করল, আর সে বর্শা নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করে ফেলল। তিনি বললেন, আল্লাহু আকবার, কাবার রবের শপথ, আমি সফল হয়ে গেছি। [সহীহ আলবুখারী : ২৫৯১] এরপর হত্যাকারী বলল, সেটি কোন সফলতা যার মাধ্যমে সে সফল হয়েছে? বলা হল, শাহাদাত, পরবর্তীতে এই বাক্যটিই তার ইসলাম গ্রহণের কারণ ও উপলক্ষ হয়েছিল।
এমন সফলতাই হোক আমাদের প্রত্যাশা। মহান রবের কাছে সে আরজিই পেশ করছি বারবার।
লেখক : প্রবন্ধকার, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ