ঢাকা, রোববার 02 March 2017, ১৯ চৈত্র ১৪২৩, ০৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাত : মানব জীবনে এক অনন্য সওগাত

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : ॥ পূর্ব প্রকাশিতের পর ॥
সাফা-মারওয়ার পাদদেশ দিয়ে ৭ বার দৌড়ানোর যোগসূত্র রয়েছে বিবি হাজেরার সঙ্গে। বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আ:)  তাঁর স্ত্রী হাজেরা এবং দুধের শিশু ইসমাঈল (আ:)-কে মক্কার জনমানব শূন্য একটি নির্জন স্থানে রেখে আসেন। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁদের খাবার পানি নিঃশেষ হয়ে যায়। মাতৃস্নেহ মা হাজেরাকে অস্থির চঞ্চল করে তোলে। পিপাসায় কাতর শিশুর জন্য এক ফোটা পানির অন্বেষণে তিনি ছুটাছুটি করতে থাকেন।অতঃপর নির্গত হল যমযম। মা হাজেরা যে স্থান বরাবর পানির জন্য ছুটাছুটি করেছিলেন, মুসলমানরা এখনো সেখানে গিয়ে এর পুনরাবৃত্তি করে থাকেন। এটা তারা করে থাকেন মাতৃ-ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং আল্লাহ্র অনুগ্রহের প্রতি শুকরিয়া জানানোর উদ্দেশ্যে।
হজ্জের সামাজিক তাৎপর্যও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। হজ্জ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই মুসলিম উম্মাহ্র মধ্যকার ভ্রাতৃত্ববোধ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। বর্ণ ভাষা গোত্র স্থান ও আভিজাত্যের তারতম্যের কথা ভুলে গিয়ে সকল মু’মিন মুসলমান কা’বা ঘরে আসার জন্য তীব্র তাকিদ অনুভব করে। এখানে তারা পরস্পরের সাথে মিলিত হয় আন্তরিক ও সাম্যের ভিত্তিতে। নির্জন মরুভূমিতে তাঁরা ছাউনি ফেলে দিন যাপন করেন এবং হজ্জের আরকান-আহকাম পালন করেন সমবেতভাবে এবং নির্দিষ্ট সময়ে। এমনিভাবে তাঁরা অতিবাহিত করেন কয়েকটি দিন। এ সময়ের মধ্যে তারা নির্ধারিত নিয়মে কখনো সফরে থাকেন কখনো বিশ্রাম করেন, আবার তাঁবুর মধ্যে অথবা খোলা আকাশের নিচে রাত্রি যাপন করেন। বস্তুতপক্ষে এর ব্যাপকতা ও গুরুত্ব অনেক বেশি। এসব কিছুর মধ্য দিয়ে মূলত আল্লাহ্র সৈনিকগণ সুশৃঙ্খল জীবনের প্রশিক্ষণ লাভ করে।
নবী করীম (সা:) ইন্তেকালের মাত্র কয়েক মাস পূর্বে হজ্জ পালন করেন। সে সময়ে তিনি জাবালুর রহমতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ইসলামের ইতিহাসে এই ভাষণ মুক্তি সনদ হিসাবে পরিচিত। সে বছর আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ১,৪০,০০০ লোক হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় আসেন। রাসূলে করীম (সা:)-এর ভাষণ শোনার জন্য তাঁরা সমবেত হন জাবালুর রহমতের পাদদেশে। তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে জগদ্বাসীকে ইসলামের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন যে, (ক) এক আল্লাহ্র উপর অবিচল বিশ্বাস রাখতে হবে এবং কোন মূর্তি বা বস্তু তাঁর প্রতীক হতে পারে না। (খ) সকল মানুষ সমান। ধর্ম বা কৌলিন্যের কারণে মানুষের মধ্যে কোন রকম তারতম্য বা ভেদাভেদ হতে পারে না। কেউ দাবি করতে পারে না একজনের উপর আরেকজনের শ্রেষ্ঠত্ব। এখানে শ্রেষ্ঠত্ব বিবেচিত হবে কেবলমাত্র ব্যক্তির আল্লাহ্ ভীতি এবং আমলে সালেহ-এর নিরিখে। (গ) জীবন, সম্পদ এবং সম্মানের ব্যাপারে প্রত্যেক মানুষের রয়েছে মৌলিক অধিকার। (ঘ) সুদী কারবারকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করলেন। (ঙ) রহিত কররেন বংশগত বিরোধ এবং মানুষের তৈরি মতলবী বিচার ব্যবস্থাকে। (চ) নারী জাতির সঙ্গে ভাল ব্যবহার করার নির্দেশ দিলেন। (ছ) সম্পদ মুষ্টিমেয় লোকের হাতে পুঞ্জীভূত না হয়ে অবিরত বণ্টন এবং হাত বদল হতে হবে। সে জন্য উত্তরাধিকার আইন ও উইল সংক্রান্ত বিধি নিষেধ মেনে চলতে হবে। (জ) তিনি আরো ঘোষণা দিলেন যে, আমাদের জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই আল্লাহ্র কালাম আল-কুরআনই হবে সকল আইনের উৎস।
জানা যায় যে, হজ্জের ব্যাপারে জাহেলিয়াত যুগের কিছু আচার-অনুষ্ঠান ইসলামের আবির্ভাবের প্রথম যামানা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। যেমন- বিশাল জনসমাবেশ উপলক্ষে এ সময়ে একটি বাৎসরিক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করা হত। এ সম্মেলনে কবিরা তাদের স্বরচিত কবিতা পাঠ করত। অনলবর্ষী বক্তারা উচ্চস্বরে বক্তৃতা দিয়ে তাঁদের মেধা প্রকাশ করত। পেশাদার কুস্তিগীরেরা দর্শকদের মাতিয়ে রাখত। আবার ব্যবসায়ীরা নিয়ে আসত হরেক রকমের বিক্রয় সামগ্রী। খলীফা হযরত উমর (রা:)-এর আমলে এ সমাবেশ প্রশাসনিক গুরুত্ব লাভ করে। তিনি এ সমাবেশকে ব্যবহার করেন একটি আপীল কোর্ট হিসাবে। এ সময়ে জনসাধারণ গভর্ণর ও সেনাপতিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলতে পারত। অভিমত পেশ করতে পারত সরকারের নতুন নতুন প্রকল্প সম্পর্কে।
পরিশেষে আবারো স্মরণ করা যেতে পারে যে, ইসলামে জাগতিক এবং ধর্মীয় জীবনের সাধারণ বিষয়গুলো সমানভাবে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি এগুলোর মধ্যে রয়েছে চমৎকার সঙ্গতি ও সংযোগ।
সাধারণ অর্থে যাকাত বলতে মওজুদ অর্থ বা সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশকে বছরান্তে দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করাকে বুঝায়। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি ফসল, ব্যবসা-বাণিজ্যের পুঁজি, গৃহপালিত পশু, মওজুদ অর্থ এবং অন্যান্য সম্পদের উপর ধার্যকৃত অর্থ। গোড়ার দিকে যাকাত হিসাবে পরিশোধযোগ্য সমস্ত অর্থ সরাসরি সরকারী তহবিলে জমা দিতে হত। কিন্তু খলীফা উসমান (রাঃ)-এর খিলাফতকালে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, মওজুদ অর্থের উপর যে যাকাত হয় তা মুসলমানরা নিজেরাই ব্যয় করতে পারবে। তবে কুরআন মজীদে যে সমস্ত খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন রয়েছে, এ ব্যয় কেবলমাত্র সে সমস্ত খাতে হতে হবে।
কুরআন মজীদে ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, সম্পদ হল মানুষের বেঁচে থাকার জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় এবং মৌলিক উপাদান। ইসলামে যাকাত প্রদান করাকে ঈমানের একটি অঙ্গ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নামায, রোযা ও হজ্জের ন্যায় যাকাতকেও দেয়া হয়েছে অবশ্য পালনীয় কর্তব্যের মর্যাদা। তবে স্মরণ রাখতে হবে যে, রাষ্ট্র প্রধানের আরাম আয়েশ বা শান-শওকতের জন্য কেউ যাকাত দেয় না। বরং ব্যক্তির উপর সমাজের বিশেষ করে অভাবগ্রস্ত মানুষের যে অধিকার রয়েছে তারই অংশ হিসেবে সে যাকাত দেয়। এভাবেই সে নিজের আত্মাকে পবিত্র এবং উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বুৎপত্তিগত দিক থেকে বিবেচনা করলেও এটাই যাকাতের উদ্দেশ্য।
নবী করীম (সা:) বলেছেন যে, “রাষ্ট্রপ্রধান বা শাসক হল মানুষের খাদেম”। আর নবীজী ছিলেন মুসলমানদের আধ্যাত্মিক নেতা ও রাষ্ট্রনায়ক। নবীজীর এ উক্তির যথার্থতা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর একটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন যে, “মুসলমানরা ট্যাক্স হিসেবে যে অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিবে তা তাঁর নিজেরও বংশের কোন লোকদের জন্য নিষিদ্ধ।” আর এটা তো জানা কথা যে রাষ্ট্রপ্রধান যদি ন্যায় নীতির প্রতি নিষ্ঠাবান হয়, তাহলে  অধস্তন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও তাদের কাজ-কর্মের ব্যাপারে অধিকতর দায়িত্বশীল হয়ে থাকে।
রাসূলে করীম (সাঃ) এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলে ইসলামী রাষ্ট্রের মুসলমান নাগরিকদের যাকাত ব্যতীত আর কোন কর দিতে হত না। উল্লেখ্য যে, যাকাতের সঙ্গে দান-খয়রাতের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। মুসলমানগণকে নির্দিষ্ট পরিমাণ এবং বাধ্যতামূলকভাবে যে যাকাত পরিশোধ করতে হত সেটাই বিবেচিত হত রাজস্ব হিসাবে। রাসূলে করীম (সাঃ)  যাকাতকে একটি ধর্মীয় দায়িত্ব বা ইবাদত হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। একজন মুসলমানের অন্তরে যাকাত আদায়ের ব্যাপারে নিষ্ঠা এবং আগ্রহ সৃষ্টি করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। তা ছাড়া এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস, নামায, রোযা ও হজ্জের মতো যাকাতও আল্লাহ্র প্রদত্ত বিধানের অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বাসকে যদি আধ্যাত্মিক ইবাদত এবং নামায, রোযা ও হজ্জকে শারীরিক ইবাদত হিসাবে গণ্য করা হয়, তাহলে যাকাতকে বিবেচনা করা যেতে পারে অর্থ সংক্রান্ত ইবাদত হিসাবে। ফকীহ্গণ একে বলেছেন ইবাদতে মালিয়াহ, অর্থাৎ সম্পদের মাধ্যমে আল্লাহ্র ইবাদত। এ কথা দ্বারা আবারো এটা প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম সমগ্র মানবজীবনকে একটি সত্তায় বিকশিত করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হল দেহ ও আত্মার মধ্যে একটি সুন্দর সামঞ্জস্য বিধান করা। এখানে দেহ ও আত্মার মধ্যেএকটি হেয় করে অপরটি প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শনের অবকাশ নেই।
কুরআন-হাদীসে কর অর্থে মোটামুটি অনেকগুলো শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো হল- যাকাত, সাদকা, হক। কুরআনের অসংখ্য আয়াতে যাকাতের উল্লেখ রয়েছে। এর অর্থ সমৃদ্ধ এবং পবিত্রকরণ। যাকাত শব্দ দ্বারা এ কথাই বোঝান হয়েছে যে, সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সম্পদের একটি অংশকে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। সম্পদকে পবিত্র করার জন্য এটা আবশ্যক। এর পরে আসে সাদকা। সাদাকা শব্দটি সততা এবং বদান্যতা উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ যারা পশ্চাদপদ, যাদের ভাগ্য ততটা সুপ্রসন্ন নয়, মানবতার খাতিরে তাদের প্রতি সহৃদয়বান এবং দয়াপরবশ হওয়াটাই হল সাদাকা। খাজনা বা কর হিসাবে ব্যবহৃত আরেকটি শব্দ হল এক। ‘হক’-এর অর্থ ন্যায্য অধিকার। একজনের জন্য যেটা অধিকার সেটাই অপরের জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসাবে বিবেচিত হয়। অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে, দায়িত্ব ও অধিকার পরস্পরের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। এবং এটাই হল সমাজের সকল প্রকার কাজ-কর্মের মূল ভিত্তি।
বিভিন্ন জিনিসের জন্য কর প্রদান করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে সঞ্চিত সম্পদ, ব্যবসা সামগ্রী, সরকারী চারণ ভূমিতে পালিত গবাদি পশু, খনিজ সম্পদ, পানিতে উৎপন্ন দ্রব্যাদি প্রভৃতি। এ সমস্ত দ্রব্যাদির উপর আরোপিত কর বা শুল্কের পরিমাণের মধ্যে তারতম্য থাকতে পারে।
রাসূলে করীম (সাঃ)-এর আমলে শুল্ক বা করের নিয়ম-নীতিগুলো অতটা কঠোর ছিল না। অথবা এটা এমনও কোন বিষয় ছিল না যেখানে কোন রকম পরিবর্তন বা সংশোধনের সুযোগ নেই। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি যে, রাসূল (সাঃ) নিজে তায়েফবাসীদের যাকাত প্রদানের দায়িত্ব থেকে  অব্যাহতি দিয়েছিলেন। অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণের নজীর রয়েছে। আবু উবায়েদের সূত্রে বর্ণিত আছেযে, মহান খলীফা হযরত উমর (রাঃ)  মদীনায় আমদানীকৃত খাদ্যসামগ্রীর উপর থেকে কর বা শুল্কের পরিমাণ হ্রাস করেছিলেন। রাসূল (সাঃ)-এর জীবদ্দশায় কখনো এমন ঘটনা ঘটেছে যে, তিনি মুসলমানদের নিকট থেকে বিশেষ ধরনের কর প্রদানের জন্য আবেদন করেছেন। উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে যে, বহিঃশত্রুর আগ্রাসনের মুখে তিনি দেশের প্রতিরক্ষার জন্য এ ধরনের করের জন্য আবেদন জানাতেন। বস্তুতপক্ষে এ ঘটনাবলী থেকে আইনবেত্তাগণ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, প্রয়োজনবোধে সরকার নতুন নতুন শুল্ক আরোপ করতে পারে। আরবি পরিভাষায় এটাকে বলে নাবায়িব। তা ছাড়া কোন কোন বিষয়ের উপর কর আরোপ করা যাবে, অথবা করের হার কত হবে কুরআন মজীদে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই।
তবে সরকারী বাজেটের প্রধান প্রধান খাত এবং রাষ্ট্রীয় খরচ সম্পর্কে কুরআন মজীদে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। “সাদাকা তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদর চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাস মুক্তির জন্য, ঋণ ভারাক্রান্তদের জন্য, আল্লাহ্র পথে সংগ্রামকারী ও মুসাফিরদের জন্য” (৯: ৬০)। সাদাকা এবং যাকাত মোটামুটিভাবে সমঅথবোধক শব্দ। এটা কেবলমাত্র মুসলমান নাগরিকদের নিকট থেকে আদায় করা হয়। আবার অমুসলিম নাগরিকদের নিকট থেকে আদায়যোগ্য পাওনাকে বলা হয় খারাজ, জিযিয়া, গনীমাহ প্রভৃতি। এগুলো সাদাকা বা যাকাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার এ দু’ধরনের অর্থ বা সম্পদ থেকে যারা সুবিধা ভোগ করবে, তাদের মধ্যেও প্রচুর প্রভেদ রয়েছে।
রাজস্ব আয় সম্পর্কে নিয়ম-নীতি ও বিধি-বিধান প্রণয়ন করা আইনবিদগণের দায়িত্ব। অপরদিকে রাষ্ট্রীয় খরচের নিয়ম-নীতিগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে কুরআন মজীদে। যাকাতের অর্থ যারা ভোগ করতে পারেন তাদেরকে আটটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হযেছে। উপরের আয়াতে তাদের বিবরণ রয়েছে। লক্ষ্যণীয় বিষয়এই যে, এই আটটি শ্রেণীর মধ্যে রাসূলে করীম (সাঃ)-এর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। নিম্নে উপরোক্ত আয়াতের উপর কিছুটা আলোকপাত করা হল। আয়াতের ব্যাপকতা ও মর্মকথা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে এটা সহায়ক হবে।
খলীফা হযরত উমর (রাঃ) ছিলেন নবী করীম (সাঃ)-এর আদর্শের একজন অন্যতম ব্যাখ্যাতা। তাঁর বর্ণনা মতে নিঃস্ব বলে দরিদ্র বা মিসকীনকে। আর অভাবী  মুসলমানকে বলে ফকীর। অবশ্য অভাবীও মিসকীন উভয়ের সাহায্যের প্রয়োজন। এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক যে, অমুসলিমদের নিকট থেকে রাজস্ব হিসাবে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা সাদাকার অন্তর্ভুক্ত নয়। তবু ইসলাম মুসলমানদের নিকট থেকে আদায়কৃত রাজস্ব থেকে অমুসলিমদের সুবিধা লাভের সুযোগ দিয়েছে।
রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায়ের কাজেযারা নিয়োজিত রয়েছে তাদেরকে কালেক্টর বলে। অপরদিকে যারা রাজস্ব খরচের দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদেরকে বলে কন্ট্রোলার এবং অডিটর। বস্তুতপক্ষে বেসামরিক কর্মকা- থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা পর্যন্ত গোটা প্রশাসনই কোন না কোনভাবে রাজস্ব সংগ্রহ বা ব্যয়ের সাথে জড়িত। এদিক থেকে বিবেচনা করলে প্রশাসনের সমস্ত বিভাগই রাজস্ব সুবিধা প্রাপ্তদের তালিকার মধ্যে এসে যায়।
মুসলমানদেরকে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর লোকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। প্রখ্যাত ফকীহ আবু ইয়ালা আল ফাররা (আল আহকাসুস সুলতানিয়াহ, পৃ. ১১৬)-এর মতে এদেরকে ৪টি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। প্রথমত যারা মুসলমানদের উপকারে আসতেপারে। দ্বিতীয় যারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। তৃতীয়ত এমন কিছু লোক যারা মুসলমানদের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকবে। চতুর্থত যাদের মাধ্যমে তাদের গোত্র বা গোষ্ঠীর লোকজনকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা সম্ভব হবে।
সাধারণ অর্থে বন্দিমুক্তি শব্দটি দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়। প্রথমত দাসত্বের শৃংখলা থেকে ক্রীতদাসদের অব্যাহতি প্রদান, দ্বিতীয়ত যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ প্রদান। এখানে ক্রীতদাস সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করা যেতে পারে। ইসলামের পূর্বে বিশ্বের অন্য কোন ধর্মই দাসত্বের দুরবস্থা দূরীকরণের প্রতি নজর দেয়নি। ঐতিহাসিক সারাকসীর বর্ণনায় উল্লেখ আছেযে, প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) সর্বপ্রথম দাস প্রথাকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। কুরআন মজীদে এরূপ বিধান রয়েছেযে, দাস-দাসীদের মধ্যে কেউ মুক্তি বাবদ অর্থ পরিশোধ করার প্রস্তাব দিলে মালিক তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। এমন কি দাসকে অর্থ উপার্জন এবং মুক্তি বাবদ প্রয়োজনীয় অর্থ জমা করার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়ার জন্য আদালত মালিককে বাধ্য করতে পারে। উপরন্তু মুসলিম সরকার মুক্তি প্রত্যাশী দাসদের সাহায্যে বাৎসরিক বাজেট অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখে।
উপরের আলোচনার সূত্র ধরে কেউ বলতে পারে যে, ইসলামে দাস প্রথার অনুমোদন ছিল। কিন্তু স্মরণ রাখতে হবেযে এরও কতগুলো উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে যারা সর্বস্ব হারায়, নিঃস্ব হয় এবং যারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেনি-তাদের আশ্রয় দানের ব্যবস্থা করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। দ্বিতীয়ত তাদেরকে ইসলামী পরিম-লের মধ্যেরেখে ইসলামী আচরণ ও ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে জ্ঞান দিতে হত। উল্লেখ্য যে, এখানে জুলুম বা শোষণের কোন সুযোগনেই। তাছাড়া ইসলামে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের উপর শোষণ চালাতে পারে না। উপরন্তু এখানে যে দাসের কথা বলা হয়েছে তারা ছিল ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের মাধ্যমে আটক বন্দী। লুন্ঠন বা অপহরণের মাধ্যমে কেউ কাউকে দাসত্বে আবদ্ধ করতে পারে না। এমনকি ইসলামে পিতা-মাতা স্বেচ্ছায় সন্তানকে দাস হিসাবে বেচা-বিক্রী করতে পারে না।
আবার যারা ঋণভারে নিমজ্জিত, তাদেরকে সাহায্য প্রদান করা যেতে পারে। ঋণগ্রস্তদের সাহায্যার্থে খলীফা হযরত উমর (রা) সুদমুক্ত ঋণ প্রদানের কর্মসূচি চালু করেছিলেন। দয়াপরবশ ও সদিচ্ছা নিয়েযে কাজ করা হয় তা সবই ফী সাবিলিল্লাহর অন্তর্ভুক্তি। দুনিয়ার বুকে আল্লাহ্র শাসন কায়েম করাই ইসলামের উদ্দেশ্য। সে কারণেই ফকীহগণ ইসলামের প্রতিরক্ষার্থে সমরাস্ত্র ক্রয়করাকে দানশীল কাজ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
মুসাফিরদেরকে আতিথেয়তা করা ছাড়াও আরো অনেকভাবে সাহায্য করা যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মুসাফিরদের যাতায়াতের পথে স্বাস্থ্য ও আরামের নিশ্চয়তা দেওয়া, সফরকালীন নিরাপত্তা বিধান করা, তাদের সুখও কল্যাণের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। এ স্থলে মুসাফির স্বদেশী কি বিদেশী, মুসলিম কি অমুসলিম তা বিবেচ্য বিষয়।
উপসংহার: এ পর্যন্ত ইসলামের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে একটি বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হলো। এ স্থলে একথা পুনরায় উল্লেখ করাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, উল্লিখিত আচার-অনুষ্ঠানসমূহের  যথাযথ প্রতিপালন এবং বিভিন্ন বিধান সমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধনই হল ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মূল নীতি।
কুরআন মজীদে এ নির্দেশের মধ্য দিয়ে মূলত একই সঙ্গে এবং একই সময়ে এক আল্লাহ্র ইবাদত-বন্দেগী ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করার কথা বলা হয়েছে।দেহ ও আত্মার মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এর চেয়ে উত্তম মাধ্যম আর কি হতে পারে? ইসলামের দৃষ্টিতে আধ্যাত্মিক সাধনা যেমন পার্থিব সুযোগ-সুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, তেমনিভাবে জাগতিক দায়-দায়িত্বের সাথে জড়িয়ে আছে আধ্যাত্মিক গুরুত্ব। এবং এসব কিছুই নির্ভর করেছে ব্যক্তির ইচ্ছা এবং নিয়তের উপর। আর এটাই হল ব্যক্তি আচার-আচরণের প্রধান চালিকা শক্তি। (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ