ঢাকা, সোমবার 03 March 2017, ২০ চৈত্র ১৪২৩, ০৫ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা নেতার চ্যালেঞ্জের মুখে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী

২ এপ্রিল, রয়টার্স : মিয়ানমারে সেনা-গণতান্ত্রিক ডি ফ্যাক্টো ক্ষমতার সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন একজন রোহিঙ্গা নেতা। ভয়াবহ জাতিগত নিপীড়নের শিকার হওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওই নেতা জানিয়েছেন, নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য তারা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবেন। সু চি এবং সেনাপ্রধানের নেতৃত্বাধীন দেশটির ক্ষমতাসীন ডি-ফ্যাক্টো সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি রোহিঙ্গাদের রক্ষার ঘোষণা দিয়েছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষৎকারে আরাকান রোহিঙ্গা সেলভ্যাশন-এর নেতা আতা উল্লাহ এসব কথা বলেন।
গত বছর ৯ অক্টোবর বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ এলাকায় পুলিশ চেকপোস্টে চালানো হামলায় নয় পুলিশ সদস্য নিহত হন। ওই হামলার দায় চাপানো হয় রোহিঙ্গাদের ওপর। আর তখন থেকেই শুরু হয় সেনাবাহিনীর দমন প্রক্রিয়া। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দাবি, এরপর থেকেই রাখাইন রাজ্যে ‘ক্লিযারেন্স অপারেশন’ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এবারের সংঘর্ষে রাখাইন রাজ্যের নিহতের সংখ্যা ৮৬ জন বলে জানিয়েছে তারা। জাতিসংঘের হিসাব মতে,এখন পর্যন্ত ঘরহারা হয়েছেন প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ। অজ্ঞাত স্থান থেকে স্কাইপে দেয়া সাক্ষাৎকারে আতা উল্লাহ জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের মুক্তিই তাদের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘যদি আমরা নিজেদের অধিকার না পাই, তাহলে ১০ লাখ, ১৫ লাখ, বা সব রোহিঙ্গাদের মরতে হলেও আমরা তাতে রাজি আছি। আমরা নিজেদের অধিকারের জন্য নিষ্ঠুর সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাব।’
জাতিসংঘ এরইমধ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জাতিগতভাবে নির্মূল করার অভিযোগ এনেছে। গত মাসে এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘ গণহত্যা ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ করে মিয়ারমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। প্রতিবেদনে একে মানবতাবিরোধী কর্মকা- বলে উল্লেখ করা হয়। তবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিদ্রোহী রোহিঙ্গা নেতার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা জবাব দেওয়ার কথা উল্লেখ করে শুক্রবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সু চির মুখপাত্র জ তাই রয়টার্সকে বলেন, ‘আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়। যদি তারা সহিংস হামলা চালায়, তাহলে আমরাও সহিংসভাবেই জবাব দেবো।’
জাতিগত নিপীড়ন : ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাস করেন। কিন্তু মিয়ানমার তাদের নাগরিউকত্ব দেবে না বলে জানিয়েছে। মিয়ানমারের শাসকরা রোহিঙ্গাদের বাংদেশি বলে উল্লেখ করে তাদের রাখাইনে থাকার অধিকার নেই বলেও জানিয়েছে। ২০১২ সালে রোহিঙ্গা ও রাখাইনদের জাতিগত সংঘাতে অন্তত ১০০ মানুষ নিহত হন। ঘরহারা হন এক লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ। এ সম্পর্কে আতা উল্লাহ বলেন, ‘২০১২ সালের হত্যাকাণ্ডের পরই আমরা বুঝতে পারি যে, তারা আমাদের অধিকার দেবে না।’
গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের সংঘর্ষের পর সৌদি আরবে হারাকাহ আল-ইয়াকিন নামক একটি বিদ্রোহী সংগঠন গড়ে উঠে। ৯ অক্টোবর হামলার পর একাধিক ভিডিওতে আতা উল্লাহ ওই হামলার দায় স্বীকার করেছেন বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চেকপোস্টে হামলা চালানোর কারণ সম্পর্কে আতা উল্লাহ বলেন, ‘আমরা রাতে লাইট জ্বালাতে পারি না। দিনের বেলায়ও আমরা নির্বিঘেœ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারি না। সবখানে চেকপোস্ট। এটা কোনও মানুষের জীবন নয়।’
‘কোনও দেশী বা বিদেশী শক্তি নেই’ : এর আগে প্রকাশিত ভিডিওতে আতা উল্লাহ তাদের লড়াইকে ‘জিহাদ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দাবি করে, এই বিদ্রোহীদের সঙ্গে বিদেশি ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সংযোগ রয়েছে। তবে এসব দাবিকে অস্বীকার করে আতা উল্লাহ জানিয়েছেন, তাদের পেছনে কোনও দেশি বা বিদেশি শক্তি নেই।
গত সপ্তাহে আতা উল্লাহর সংগঠন এক বিবৃতিতে নিজের নাম পরিবর্তন করে আরাকান রোহিঙ্গা সেলভ্যাশন আর্মি বলে পরিচয় দিয়ে বলেছে, তাদের সঙ্গে কোনও দেশি বা বিদেশি জঙ্গি সংগঠনের যোগাযোগ নেই।
সাক্ষাৎকারে আতা উল্লাহ বলেন, ‘দেশে বা বিদেশে আমাদের পেছনে কোনও সংগঠন নেই। আমরা গরু বিক্রি করে টিকে আছি।’
রয়টার্সের পক্ষ থেকে আতা উল্লাহকে তার সংগঠনের ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন করা হলেও তিনি তার উত্তর দেননি।
তবে রোহিঙ্গাদের উপর চলা নিপীড়নে সু চিকে প্রদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন আতা উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রতি সেনাবাহিনী খুবই নিষ্ঠুর। একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে তার (সু চি) এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো উচিৎ।’
তবে সু চি কেন রোহিঙ্গাদের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন না, সে কথাও আতা উল্লাহ ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন। ‘তিনি যদি আমাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেন, তাহলে সেনাবাহিনী তার সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে। আর এজন্য তিনি আমাদের রক্ষা করবেন না।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ