ঢাকা, সোমবার 03 March 2017, ২০ চৈত্র ১৪২৩, ০৫ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা গঠন

শাহ আহমদ রেজা : ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রথম সরকার গঠিত হয়েছিল। এটা ছিল যুক্তফ্রন্ট সরকার। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত প্রদেশের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং ‘শেরে বাংলা’ আবুল কাশেম ফজলুল হকের নেতৃত্বে ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই প্রতিষ্ঠিত কৃষক-শ্রমিক পার্টির সমন্বয়ে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে হাজী মোহাম্মদ দানেশ ও মাহমুদ আলীর নেতৃত্বাধীন গণতন্ত্রী দল (প্রতিষ্ঠা: ১৭ জানুয়ারি, ১৯৫৩) এবং পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট্রের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগ সম্পাদক আবুল হাশিমের খেলাফতে রব্বানী পার্টিও (প্রতিষ্ঠা: সেপ্টেম্বর, ১৯৫৩) যুক্তফ্রন্টের মিত্র সংগঠন হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে মওলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম পার্টি (প্রতিষ্ঠা: ১৯৫৩) কৃষক-শ্রমিক পার্টির সঙ্গে পৃথকভাবে স্বাক্ষরিত ‘১০ দফা’ চুক্তির ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্টে যোগ দিয়েছিল।
যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী কর্মসূচি হিসেবে ১৯৫৪ সালের জানুয়ারিতে ঘোষিত ২১ দফায় প্রধানত পূর্ব বাংলার জনগণের বিভিন্ন দাবি ও অধিকার আদায়ের অঙ্গীকার করা হয়েছিল (তখন পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনো সংবিধান ছিল না, প্রদেশের নামও ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখা হয়নি)। স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ২১ দফার ১৯তম দফায় বলা হয়েছিল, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলাকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেয়া ও সার্বভৌমিক করা হবে এবং দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত সকল বিষয়কে প্রদেশের কর্তৃত্বে আনা হবে। দেশরক্ষা বিভাগের স্থল বাহিনীর সদর দফতর পশ্চিম পাকিস্তানে ও নৌবাহিনীর সদর দফতর পূর্ব বাংলায় স্থাপিত হবে, পূর্ব বাংলাকে আত্মরক্ষায় স্বয়ংসস্পূর্ণ করার জন্য প্রদেশে অস্ত্র নির্মাণের কারখানা স্থাপন করা হবে। আনসার বাহিনীকে সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করা হবে।
ঐতিহাসিক এ ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচার অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী এবং পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের আহ্বায়ক ও অবিভক্ত বাংলার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই দু’জনের পাশাপাশি ছিলেন ‘শেরে বাংলা’ ফজলুল হক। তিনিও অবিভক্ত বাংলার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। ‘হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী’র নেতৃত্বেই যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। অন্যদিকে ছিল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের নেতৃত্বে তৎপর ক্ষমতাসীন দল মুসলিম লীগ।
১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত পূর্ব বাংলার প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিল। ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট জিতেছিল ২২৩টিতে। এর মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৪৩, কৃষক-শ্রমিক পার্টি ৪৮, নেজামে ইসলাম পার্টি ১৯ এবং গণতন্ত্রী দল ১৩টি আসন পেয়েছিল। অমুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত ৭২টি আসনের মধ্যে গণতন্ত্রী দল তিনটি এবং কমিউনিস্ট পার্টি চারটি আসন পাওয়ায় যুক্তফ্রন্টের সর্বমোট সদস্য সংখ্যা হয়েছিল ২৩০। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ পেয়েছিল মাত্র ১০টি আসন। বিজয়ের পর ১৯৫৪ সালের ২ এপ্রিল মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত যৌথ সভায় ‘শেরে বাংলা’ আবুল কাশেম ফজলুল হককে যুক্তফ্রন্টের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করা হয়েছিল। পরদিন ৩ এপ্রিল ফজলুল হক যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রধান বা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। কোন দল থেকে কতজনকে মন্ত্রী করা হবে- সে প্রশ্নে মতপার্থক্য সৃষ্টি হওয়ায় আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রথমে মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। ফলে ৩ এপ্রিল ফজলুল হক মাত্র তিনজনকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করেন। তারা ছিলেন কৃষক-শ্রমিক পার্টির আবু হোসেন সরকার ও সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া এবং নেজামে ইসলাম পার্টির আশরাফউদ্দিন চৌধুরী।
আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মন্ত্রী নেয়া হয়েছিল ১৫ মে। মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ, আবদুস সালাম খান, হাশিমউদ্দিন আহমদ এবং শেখ মুজিবুর রহমান। কেএসপির নেতা হলেও কফিলউদ্দিন চৌধুরীকেও আওয়ামী মুসলিম লীগের কোটা থেকে মন্ত্রী করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক ছাড়া মোট ১২ জনকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা। এই মন্ত্রিসভা অবশ্য বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। আদমজীতে সংঘটিত দাঙ্গা এবং পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করা হবে বলে কলকাতায় ‘শেরে বাংলা’র কথিত ঘোষণা প্রভৃতির অজুহাতে ২৯ মে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে বাতিল করা হয়। একই সাথে পূর্ব বাংলায় ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের ১২-ক ধারা জারি করে গবর্নরের শাসন প্রবর্তন করা হয়েছিল। গবর্নর পদে নিযুক্তি দেয়া হয় মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জাকে। এর মধ্য দিয়ে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের সে রাজনীতিরই বাস্তবায়ন ঘটেছিল, যার কারণে প্রতিষ্ঠাকালেই পাকিস্তান থেকে সংসদীয় গণতন্ত্র নির্বাসিত হয়েছিল।
প্রসঙ্গক্রমে এখানে কয়েকটি তথ্যের উল্লেখ করা দরকার : ১. পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পর ১৯৪৯ সালে অনুষ্ঠিত টাঙ্গাইলের একটি আসনের উপনির্বাচনে প্রথমে মওলানা ভাসানীর কাছে এবং পরে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের কাছে করটিয়ার জমিদার খুররম খান পন্নী পরাজিত হয়েছিলেন। জমিদার পন্নী ছিলেন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রার্থী। এই পরাজয়ের কারণে সরকার ১৯৫৪ সালের আগে পূর্ব বাংলা প্রদেশে আর কোনো নির্বাচনের আয়োজন করেনি। ফলে ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট নির্বাচিত পাকিস্তান গণপরিষদে পূর্ব বাংলা সত্যিকার অর্থে প্রতিনিধিত্বহীন অবস্থায় ছিল। কারণ, ৭৯ সদস্যের গণপরিষদে জনসংখ্যার ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধির সংখ্যা ৪৪ জন থাকলেও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের মতো মোহাজের ব্যক্তিরা প্রতিনিধিত্ব করে আসছিলেনÑ যারা পূর্ব বাংলা বা বাঙালির পক্ষে কোনো ভূমিকা রাখেননি।
২. যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার জন্য সম্ভাবনার সৃষ্টি হলেও বানোয়াট অভিযোগে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভাকে বাতিল করার পাশাপাশি ৯২-ক ধারার আড়ালে বিশেষ করে আওয়ামী মুসলিম লীগের অধিকাংশ নেতাকে গ্রেফতার করেছিল সরকার। দলের সভাপতি মওলানা ভাসানীকে প্রকাশ্যে গুলী করে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন গবর্নর ইস্কান্দার মির্জা। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগ দেয়ার কারণে মওলানা ভাসানী সে সময় দেশে ছিলেন না। তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে করাচীকেন্দ্রিক ক্ষমতাসীন চক্র ও ষড়যন্ত্রকারীরা সাফল্যের সঙ্গে যুক্তফ্রন্টে ভাঙন সৃষ্টি করেছিল। ১৯৫৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তফ্রন্টের সংসদীয় দলের সভায় আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ‘শেরে বাংলা’ ফজলুল হকের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং তার ফলে যুক্তফ্রন্টে ভাঙন ঘটে। উল্লেখ্য, কলকাতা থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী যুক্তফ্রন্টের ঐক্য টিকিয়ে রাখার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব অনমনীয় থাকায় যুক্তফ্রন্ট ভেঙে গিয়েছিল।
৩. যুক্তফ্রন্টের এই ভাঙনে দলগতভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আওয়ামী লীগ। এর কারণ, ৯২-ক ধারা প্রত্যাহারের পর ১৯৫৫ সালের ৬ জুন আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় গঠিত মন্ত্রিসভা ‘যুক্তফ্রন্ট’ নাম নিয়েই শপথ নিয়েছিল। অর্থাৎ যুক্তফ্রন্ট সরকারই ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল। কিন্তু যুক্তফ্রন্টের প্রধান শরিক আওয়ামী মুসলিম লীগ এতে সুযোগ পায়নি। এরই পাশাপাশি দলত্যাগ করেছিলেন আওয়ামী লীগের ৩৯ জন সদস্য, যার ফলে দলটির পরিষদ সদস্য সংখ্যা কমে হয়েছিল ১০৪। ওদিকে গণপরিষদের ৩১টি মুসলিম আসনের নির্বাচনে ‘যুক্তফ্রন্ট’ পেয়েছিল ১৬টি। বড় দল হলেও আওয়ামী লীগের ভাগে এসেছিল মাত্র ১২টি আসন। পরবর্তীকালে উপনির্বাচনের মাধ্যমে একটি আসন পাওয়ায় দলটির সদস্য সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ১৩।
 নৈরাশ্যজনক এ ঘটনাপ্রবাহ সত্ত্বেও এদেশের ইতিহাসে ৩ এপ্রিল স্মরণীয় হয়ে আছে একটি প্রধান কারণে। সেদিনই প্রথমবারের মতো জনগণের ভোটে নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়েছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ