ঢাকা, সোমবার 03 March 2017, ২০ চৈত্র ১৪২৩, ০৫ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

উগ্রপন্থী দলের উত্থান ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : [চার]
এখানে প্রশ্ন হলো, তাহলে কিভাবে ইসলামের নামে এ সকল জানবাজ আবেগী মানুষগুলো ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হলো? এর মূল কারণ হলো ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব। এজন্য আমরা দেখতে পাই যে, রসূলুল্লাহ স. এর সাহচর্যে লালিত সাহাবীগণ যেখানে দীন প্রতিষ্ঠা ও জিহাদের গুরুত্ব স্বীকার করার পাশাপাশি রক্তপাত ও হত্যার ভয়াবহতা অনধাবণ করতেন এবং সকল উগ্রতা থেকে আত্মরক্ষা করতেন, সেখানে সঠিক জ্ঞানের অভাবের কারণে এ সকল আবেগী মানুষেরা জিহাদের নামে খুন, রক্তপাত, ধনসম্পদের ক্ষতি, বান্দার হক নষ্ট ইত্যাদি কঠিন অপরাধে লিপ্ত হতো।
ইতোপূর্বে উল্লেখি করেছি যে, আলী রা.- এর পক্ষ থেকে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ও অন্য কয়েকজন সাহাবী খারিজীদের সামনে তাদের মাতমতের বিভ্রান্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। অনেকে এই প্রচেষ্টায় সংশোধিত হলেও অনেকেই তাদের উগ্রতা পরিত্যাগ করেনি। এর মূল কারণ ছিল, কুরআন বুঝঅর ক্ষেত্রে তাদের নিসজেদের পারঙ্গমতা সম্পর্কে তাদের অহংকার। সাহাবীগণ আজীবন রসূলুল্লাহ স.- এর সাহচর্যে থেকে কুরআন বুঝেছেন। কিন্তু তাদের ব্যাখ্যা ও মাতমতের বিশেষ কোনো গুরুত্ব খারিজীরা মনত না। এই মানসিকতাই ছিল সকল বিভ্রান্তির উৎস। বস্তুত, কুরআনের বাস্তব প্রয়োগ রসূলুল্লাহ স.- এর কর্ম ও বাণীই হলো সুন্নাত (হাদীস)। আর সুন্নাতের আলোকেই কুরআনের প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করা সম্ভব। পরবর্তী প্রায় অর্ধ শতাব্দী যাবৎ সাহাবীগণ এভাবে সুন্নাতের আলোকে খারিজীদের উন্মাদনা রোধের চেষ্টা করেছেন। প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থসমূহে সংকলিত হাদীসের আলোকে দেখা যায় যে, সাহাবীগণ তাদের ‘জিহাদ’ কেন্দ্রিক বিভ্রান্তিগুলো অপনোদনের চেষ্টা করেছেন।
প্রথমত, খারিজীরা ইবাদতের গুরুত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে সুন্নাতের বিরোধিতা করে। তারা যে সকল আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করে সেগুলো আদেশ, নিষেধ, পরিবর্তন, জিহাদ, দীন প্রতিষ্ঠা ও ফিতনা দূরীকরণের গুরুত্ব প্রমাণ করে। কিন্তু কখনোই এই কর্ম ফলয করা হয়েছে। সকল ফরয কর্মই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেগুলোর মধ্যে কোনোটির চেয়ে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গুরুত্বের বেশিকম সাদারণভাবে সকলের জন্য হতে পারে আবার ব্যক্তিগত অবস্থার কারণে হতে পারে। সর্বাবস্থায় গুরুদ্বের কমবেশি আবেগ বা যুক্তি দিয়ে নয়, বরং ‘সুন্নাতেরর’ আলোকে বা রসূলুল্লাহ স.- এর আজীবনের কর্ম, শিক্ষা ও আচরণের আলোকে বুঝতে হবে। সাহাবীগণ সুন্নাতের আলোকে তাদের এই ভুল অপনোদনের চেষ্টা করেন।
দ্বিতীয়ত, ফরযে আইনের চেয়ে ফরযে কিফাইয়া বা নিজের চেয়ে অপরের সংশোধনের বিষয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা। খারিজীদের কাউকে ব্যক্তিগতমত লালনে বা ব্যক্তিগত মতানুসারে ইবাদত বন্দেগী, ব্যক্তিজীবন বা পারিবারিক জীবন পালনে আলী রা. বা অন্য কোনো সাহাবী বা পরবর্তী শাসক বা আলিমগণ বাধা দেননি। রাষ্ট্র, শাসক বা জনগণের অন্যায়েল প্রতিবাদ করতে বা আদেশ-নিষেধ করতেও কেউ তাদেরকে রাধা দেয়নি। তাত্ত্বিক বির্তক হলেও তাদের কর্মে বাধা দেয়া হয়নি। কিন্তু এতে তারা পরিতৃপ্ত থাকেনি। তাদের একমাত্র লক্ষ ছিল ‘অন্যান্যদের জীবনে ‘আল্লাহর দীন’ বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্টা করা।’ এজন্য কল্পিত অপরাধে অপরাধী বা সত্যিকার অপরাধে অপরাধী শাসক, প্রশাসক ও জনগণকে সংশোধন ও ফিতনা দূর করে দীণ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে তারা নিজেরা পাপের মধ্যে নিমজ্জিত হচ্ছিল। তাদের মানসিকতা ছিল, সমাজের অন্য মানুষের জীবনে ‘দীন’ প্রতিষ্ঠা না হলে বোধ হয় আমার নিজের দীন পালন মূল্যহীন হয়ে গেল। সাহাবীগণ সুন্নাতের আলোকে তাদের এই বিভ্রানিস্ত সংশোধনের চেষ্টা করেন। এখানে কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করছি।
তাবিয়ী নাফে র. বলেন, এক ব্যক্তি (খারিজী নেতা নাফে ইবনুল আযরাক) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের রা. নিকট এসে বললো, ‘হে আব্দুর রহমান! কি কারণে এক বছর হজ্জ করেন আরেক বছর উমরা করেন এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহান পরিত্যাগ করেন। অথচ আপনি জানেন যে, আল্লাহ জিহাতের জন্য কী পরিমাণ উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়েছেন? আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, ভাতিজা! ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাঁচটি বিষয়ের উপর আল্লাহ ও তাঁর রসূলের স. উপর বিশ্বাস স্থাপন করা পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও রমযানের সিয়াম আদায় এবং যাকাত প্রদান ও বাইতুল্লাহর হজ্জ। সে বললো, হে আবূ আব্দুর রহমান! আল্লাহর তাঁর কিতাবে যা উল্লেখ্য করেছেন তা কি শুনছেন? তিনি বলেন, ‘মুমিনগণের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে। যদি তাদের একদল অপর দলের উপর সীমালঙ্ঘন করে তাহলে তোমরা জুলুমকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো যতক্ষণ না তারা আল্লাহ নির্দেশের দিকে দিকে ফিরে আসে।’ (তিনি আরো বলেছেন): ‘এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাবৎ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠিত হয়।’ ইবনে উমর রা. বলেন, আমরা তো রসূলুল্লাহ স.- এর যুগে তা করেছিলাম। ইসলাম দুর্বল ছিল, ফলে মুসলিম ব্যক্তি তার দীনের কারণে বিপদগ্রস্ত হতেন। কাফিররা তাকে হত্যা করত অথবা তার উপর অত্যাচার করত। যখন ইসলাম শক্তিশালী হয়ে গেল তখন তো আর ফিতনা থাকলো না।’ এখানে ইবনে উমর রা.- এর বক্তব্য থেকে আমরা কয়েকটি বিষয় বুঝতে পারি।
প্রথমত, শুধু ফযীলত, নির্দেশনা বা প্রেরণামূলক আয়াত ও হাদীসের ভিত্তিতে কোনো ইবাদতের গুরুত্ব নির্ধারণ করা যায়না। কুরআন কারীম ও রসূলুল্লাহ স.- এর সামগ্রিক শিক্ষার আলোকেই তা নির্ধারণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কুরআন কারীম সালাত, সিয়াম, যাকাত, দাওয়াত, আদেশ, নিষেধ ইত্যাদি অনেক ইবাবাদতের দেয়া হয়েছে। তবে এগুলোর মধ্যে কোনটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনটি কম গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি ব্যক্তিগথ এবং কোনটি সমষ্টিগত, কোনটি সকলের জন্য সার্বক্ষণিক পালনীয়, কোনটি বিশেষ অবস্থায় পালনীয় ইত্যাদি প্রয়োজনীয় বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি। এ সকল কুরআনী নির্দেশ যিনি গ্রহণ করেছেন, তাঁর বাস্তব জীভন ও বাণী থেকেই এ সকল বিষয় বিস্তারিত জানা যায়।
রসূলুল্লাহ স.-এর বাস্তব জীভনের শিক্ষা ও কর্ম থেকে জানা যায় যে, কুরআনে উল্লিখিত সকল নির্দেশের মধ্যে উপরোক্ত পাঁচটি কর্ম সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং এগুলোর উপরেই দীনের ভিত্তি। জিহাদ, দাওয়াত, আদেশ-নিষেধ, দীন প্রতিষ্ঠা ইবাদতের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তবে সেগুলোর পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অবস্থার আলোকে যে ছাড় বা সুযোগ আছে তা আরকানে ইসলামের ক্ষেত্রে নেই। তাঁরা বুঝতেন যে, জিহাদ আরকানে ইসলামের মত ব্যক্তিগত ফরয ইবাদত নয় যে, তা পরিত্যাগ গুনাহ হবে। বরং বিভিন্ন হাদীস শুধুমাত্র আরকানে ইসলাম পালনকারীকে পূর্ণ মুসলিম ও জান্নাতী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যান্য হাদীস জিহাদের গুরুত্ব বর্ণনার সাথে সাতে জিহাদ পরিত্যাগকারী পঞ্চ আরকান পালনকারী মুমিনেরও প্রশংসা করা হয়েছে। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ