ঢাকা, মঙ্গলবার 04 March 2017, ২১ চৈত্র ১৪২৩, ০৬ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গরু জবাই করলেই ফাঁসি!

‘ছত্তিশগড়ে গরু জবাই করলেই ফাঁসি’ শিরোনামে একটি খবর মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকান্তরে। ৩ এপ্রিল মুদ্রিত খবরটিতে বলা হয়, গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে নিজের কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রমন সিং। তার রাজ্যে কেউ গরু জবাই করলে তাকে ফাঁসি দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তিনি। গরু জবাই ইস্যুতে ভারতীয় রাজনীতিতে তুমুল আলোচনা সমালোচনা চলছে। মুখ্যমন্ত্রী রমন সিং এমন এক সময় ফাঁসি দেয়ার কথা উচ্চারণ করলেন যার মাত্র এক দিন আগে গুজরাট রাজ্যে গরু জবাই বন্ধে নতুন আইন পাস করা হয়। ‘অ্যানিমেল প্রিজারভেশন অ্যাক্ট’ নামে এই কালাকানুনের অধীনে গরু জবাইয়ের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। আর কারো বিরুদ্ধে গরুর গোস্ত সরবরাহের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ১০ বছরের কারাদ- হবে। এছাড়া জরিমানা গুণতে হবে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ রুপি। ভারতে গরু জবাই নিয়ে যেসব তৎপরতা চলছে তা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের আর কোথাও গরু নিয়ে এমন কর্মকা- লক্ষ্য করা যায় না। ভারত তো সাংবিধানিকভাবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে তো সব ধর্মের ও মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকে। মুসলমানরা যে শুধু হালাল খাদ্য হিসেবে গরুর গোস্ত খায় তা নয়, ধর্মীয় উৎসব কুরবানি ঈদে তারা গরু কুরবানি করে থাকে। এটি তাদের ধর্মীয় বিধান এবং পুণ্যের কাজও বটে। তাহলে এমন কাজে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বাধা  দেয়া হবে কেন? কিন্তু ভারতের কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো গরু জবাই নিষিদ্ধ করার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করে আসছে। তবে ২০১৫ সালের মে মাসে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে গরু রক্ষা আন্দোলন আরো জোরদার হয়েছে। তখন থেকে এ পর্যন্ত ভারতের কয়েকটি রাজ্যে গরু জবাই ও গোস্ত বিক্রি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
আমরা সবাই তো এ কথা জানি যে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। এ পৃথিবীর মানুষ আমিষ ও নিরামিষ উভয় প্রকার খাদ্যই খেয়ে আসছে মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই। আর আমরা এ কথাও জানি যে, আমিষের উৎস পশু ও মৎস্য এবং নিরামিষ খাদ্যের উৎস তরুলতা-বৃক্ষ। এবং আমরা এ কথাও জানি যে পশু ও মৎস্যের মতো তরুলতা বৃক্ষেরও জীবন আছে। তাই প্রশ্ন জাগে, আমিষের উৎস পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে বাধা দেয়া হচ্ছে কেন? এই বাধা কি মানবিক চেতনা কিংবা ধর্মীয় নির্দেশনার কারণে? ভারতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ধর্মীয় ভাবনার কারণে মুসলমানদের গরু জবাইতে বাধা দেয়া হচ্ছে। তাহলে তো আমাদের ধর্মের কাছেই ফিরে যেতে হয়। আসলেই কি গরু জবাইতে ধর্মের বাধা-নিষেধ আছে? প্রকৃত ব্যাপার হলো, হিন্দু ধর্মের গ্রন্থগুলো আমিষ তথা মাংস ভক্ষণের অনুমতি দেয়। ধর্মগ্রন্থসমূহে উল্লেখ আছে যে, হিন্দু সাধু সন্ন্যাসীরা আমিষজাতীয় খাদ্য গ্রহণ করতেন। হিন্দু ধর্মের আইনের গ্রন্থ মনুশ্রুতির ৫ম অধ্যায়ে ৩০ নং শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছেÑ “খাবার গ্রহণকারী সেসব পশুর মাংসই খায় যা খাওয়া যায়, তবে এতে সে কোন মন্দ কিছু করে না। এমনকি সে যদি এটা দিনের পর দিনও করে যায়; কেননা ঈশ্বরই কতককে ভক্ষিত হওয়ার জন্য এবং কতককে ভক্ষক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।” মনুশ্রুতির একই অধ্যায়ে ৩১ নং শ্লোকে বলা হয়েছে, “উৎসর্গের শুদ্ধতার জন্য মাংস ভক্ষণ যথার্থ, এটা ঈশ্বরের বিধান হিসেবে প্রচলিত।” এ ছাড়া মহাভারতের অনুশাসন পর্বের ৮৮ নং অধ্যায়েও শ্রাদ্ধের সময় গরুর মাংস পরিবেশনের কথা বলা হয়েছে। উদ্ধৃতির সংখ্যা আরো বাড়ানো যেতে পারে, তবে এর বোধ হয় আর প্রয়োজন নেই। আসলে আমিষ ও নিরামিষ উভয়জাতীয় খাদ্যই মানুষের জন্য স্বাস্থ্যপ্রদ। মানুষ তার রুচি-অভিরুচির প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করবে। ধর্ম এখানে অযৌক্তিক কোন বাধ সাধেনি। খাদ্য নিয়ে বিভিন্ন সময় যে বিতর্ক বা বিতণ্ডা বিভিন্ন জায়গায় সৃষ্টি করা হয়েছে তার পেছনে মদদ জুগিয়েছে মতলববাজ কিছু সমাজপতি, ধর্মগুরু ও রাজনীতিবিদ। এদের ব্যাপারে মানুষের সতর্ক থাকা প্রয়োজন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সামাজিক দায়িত্ব পালনও মানবিক কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ভারতের গুজরাটে মুসলমানদের গরুর গোস্ত খাওয়ার বিরুদ্ধে কুরআনের অপব্যাখ্যা দিয়ে বিলবোর্ড টানানো হয়েছে, এটা মোটেও ধর্মসম্মত কাজ হয়নি। হিন্দু ধর্মের আইনের গ্রন্থ মনুশ্রুতিতেও পশুর মাংস খাওয়ার পক্ষে কথা বলা হয়েছে। আসলে ওইসব বিলবোর্ড বা প্রচারণা অনাকাক্সিক্ষত সাম্প্রদায়িক চেতনা কিংবা রাজনীতির মন্দ মস্তিষ্ক থেকে উৎসারিত হতে পারে। আমরা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব মানুষের প্রতি আহ্বান জানাবো- ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে ধর্মের বিধিবিধান জেনেশুনেই ধর্ম পালন করুন। ধর্মজ্ঞান অর্জনের কথা বলে, জ্ঞানের আলো না থাকলে ধর্মের আলো পাওয়া যায় না। অতীতে অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে মতলববাজ সমাজপতি, ধর্মগুরু ও রাজনীতিবিদরা মানব সমাজের অনেক ক্ষতি করেছেন। এই সুযোগ আর তাদের দেয়া যায় না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ