ঢাকা, মঙ্গলবার 04 March 2017, ২১ চৈত্র ১৪২৩, ০৬ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মঙ্গল শোভাযাত্রায় যোগদানের পরিপত্রটি প্রত্যাহার করা উচিত

ড. মো. নূরুল আমীন : বাংলা একটি প্রবচন আছে, ‘সারা গায়ে ক্ষত অসুধ দেব কত’, আমাদের সমাজ জীবনের এমন কোনো খাত নেই সাম্প্রতিককালে যে খাতটি সমস্যাগ্রস্ত নয়। জাতীয় অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে পরিচিত ব্যাংকিং ও অর্থখাত প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অযোগ্যতা, অদক্ষতা, জবাবদিহিতার অভাব, অস্বচ্ছতা ও পরিচালনা সঙ্কট এই খাতটিকে এতই ব্যধিগ্রস্ত করে তুলেছে যে, স্বয়ং কেন্দ্রীয় ব্যাংকই তার সামর্থ্য, নির্ভরযোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বাণিজ্যিক ও তফসিলি ব্যাংকসহ বিশেষায়িত অর্থ প্রতিষ্ঠানসমূহের কাজকর্ম, লেনদেন এবং অন্যান্য তৎপরতা পরিধারণ ও মূল্যায়নের সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে। তার অযোগ্যতার কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে রিজার্ভের অর্থ স্বচ্ছন্দে চুরি হয়ে যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধন খোয়া যাওয়ায় সরকারকে মূলধন ভর্তুকি দিয়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হয়। তাদের প্রদত্ত ঋণ ও আগামের হাজার হাজার কোটি টাকা শ্রেণিবিন্যাসিত হয়ে বড় বড় শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ ও চোর-বাটপারদের পেটে যায়। এর কোনো প্রতীকার হয় না।
রাজনৈতিক খাতে আমরা এখন শিষ্টাচার, ভদ্রতা, নম্রতা সবকিছুই হারিয়ে ফেলেছি। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে আমরা এখন শত্রুর থেকে অধম বলে গণ্য করি এবং কিভাবে দুনিয়া থেকে তাকে বা তাদেরকে নিঃশেষ করে দেয়া যায় এটিই অনেকের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট হয়ে পড়েছে এবং পরিস্থিতি এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন তার সম্ভাব্যতাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সকল দল ও মতের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং শ্রদ্ধাভাজন কোনো জাতীয় নেতা আমাদের সামনে যেমন জীবিত নেই, তেমনি স্বাধীনতার স্থপতিসহ ঘোষক এবং অন্যান্য মৃত মহান নেতাদেরও আমরা এমনভাবে বিতর্কিত করে তুলেছি যে, তাদের সকলেই আগামী প্রজন্মের রোল মডেল হবার উপযোগিতা হারিয়ে ফেলেছেন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকারকে আমরা সম্পূর্ণভাবে পদদলিত করে চলেছি। সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক প্রথায় অবক্ষয় ঘটছে। ব্যভিচার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড দেশকে গ্রাস করে ফেলছে। এ কাজগুলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় না হলেও সরকারি নিষ্ক্রিয়তা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল ও তাদের অঙ্গ সংস্থার নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের অব্যাহত ঊর্ধ্বগতি, মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ শ্রমিক, কৃষক, নি¤œ আয়ের আমজনতার জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। মাইক্রো ইকোনমির গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহের প্রতি প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার না দিয়ে মাইক্রোইকনমির বিভিন্ন খাতে মেগা প্রকল্প প্রণয়ন এবং সময়ে সময়ে অহেতুক ও অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির ফলে অর্থ ও সামাজিক খাতে যে চাপ পড়ছে তাতে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে। এর মধ্যে গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উগ্রবাদীদের উৎপাত দেশের সংহতি এবং সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তায় সাংঘাতিক বিঘেœর সৃষ্টি করছে। এই সঙ্কটগুলোর সমাধান আমরা এখনো বের করতে পারিনি। ফলে দেশের মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করতে বাধ্য হচ্ছে।
একথা অনস্বীকার্য যে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ নামক এই ভূখ-টি আমাদের সকলের। এই দেশকে সমৃদ্ধশালী করা এবং একটি শান্তির নীড়ে পরিণত করার দায়িত্ব আমাদের সকলের; যেমন সরকারের তেমনি দলমত নির্বিশেষে সকল সচেতন নাগরিকের। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে এই যে, আমাদের কিছু লোক দায়িত্বশীল পদের দায়িত্বহীন অপব্যবহার করে পুরাতন সমস্যার সমাধান যেমন জটিল করে তুলছেন তেমনি নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে দেশ ও জাতির স্থিতিশীলতা ধ্বংসে লিপ্ত আছেন বলে মনে হয়। অধুনা এ ধরনের একটি অপপ্রয়াস দেশপ্রেমিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে এবং দেশের আলেম-ওলামা এবং দ্বীনদার লোকদের বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে বলে মনে হচ্ছে। তাদের এই অপপ্রয়াসটি হচ্ছে দেশের সকল প্রতিষ্ঠানকে আসন্ন পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করার নির্দেশ। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এই নির্দেশটি জারি করা হয়েছে। এর ফলে দেশের নব্বই শতাংশ মুসলমানের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এর কারণ মঙ্গল শোভাযাত্রা ইসলামী সংস্কৃতিতে নেই, ছিল না এবং থাকতে পারে না।
মঙ্গল শোভা যাত্রার পরিচয়
হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছে অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে। তাই তারা অকল্যাণ তাড়াতে প্রতি বছর শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিনে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করেন। অন্যদিকে মঙ্গল কাব্য হচ্ছে হিন্দুদের দেব-দেবীর গুণ-কীর্তন। হিন্দুরা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী মঙ্গলের প্রতীক হিসাবে পেঁচা, রামের বাহন হিসাবে হনুমান, দুর্গার বাহন হিসাবে সিংহ, দেবতার প্রতীক হিসাবে সূর্য ইত্যাদি নিয়ে শরীরে দেব-দেবী ও বিভিন্ন জন্তু-জানোয়ারের প্রতিকৃতি ধারণ করে পয়লা বৈশাখে শোভাযাত্রা করে এবং এর মাধ্যমে তারা পূজা অর্চনা করে।
আগেই বলেছি, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৯০ ভাগেরও বেশি মুসলমান লা শরীক আল্লাহতে বিশ্বাসী এবং দেব-দেবী ও শিরক এ অবিশ্বাসী। মঙ্গল শোভাযাত্রা ও জন্তু-জানোয়ারের ছবি ধারণ করা তাদের সংস্কৃতিতে নেই এবং তাদের ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী এটি শিরক এবং আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা ইসলামে সবচেয়ে বড় গুনাহ। এই গুনাহে তারা অংশ নিতে পারে না। এই উপমহাদেশ বিশেষ করে এই ভূখ-ের মুসলমানরা কখনো মঙ্গল শোভাযাত্রা অথবা মঙ্গল কীর্তনে অংশগ্রহণ করেনি; মুঘল আমল, বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশ আমলের গত ৪৫ বছরে কখনো এই ঘটনা ঘটেনি। হঠাৎ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে তাদের ছাত্রছাত্রীদের এতে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়ায় সকল মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে বলছেন, প্রতিবেশী একটি দেশকে খুশী করার জন্য এটি করা হয়েছে। কথাটি বিশ্বাস করা কঠিন। মুসলমানদের গরু জবাইকে কেন্দ্র করে ভারতে যেসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে তা কি আমরা ভুলে গেছি? ফ্রিজে গরুর গোশত রাখা হয়েছে এই সন্দেহে উগ্র হিন্দুবাদীরা একটি মুসলিম পরিবারের সদস্যদের কি মর্মান্তিকভাবে হত্যা করেছে তা দুনিয়াবাসী দেখেছে। আমি বিশ্বাস করি যারা সরকার পরিচালনা করছেন তাদের মধ্যে অনেক ভাল মানুষ আছেন। ঈমানদার ব্যক্তিও আছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যারা পরিচালনা করেন তাদের মধ্যে হয়ত নাস্তিক ও মুশরেক থাকতে পারেন কিন্তু তারা তাদের বিশ্বাস অন্যদের উপর বিশেষ করে আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের উপর চাপিয়ে দিতে পারেন না।
ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই পরিপত্রের বিরুদ্ধে দেশের আলেম সমাজ- ওলামা-মাসায়েখরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ধর্ম ও ধর্মীয় বিধান নিয়ে খেলা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এই কাজের ফল শুভ হয় না। বৃটিশ আমলে ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামকালে উপমহাদেশের হিন্দু মুসলমান উভয় ধর্মাবলম্বী সিপাহীরা বিদ্রোহ করেছিলেন। তার একটা প্রধান কারণ ছিল এনফিল্ড রাইফেলের টোটা। সিপাহীদের দাঁত দিয়ে এই টোটা খুলতে হতো এবং তাতে গরু ও শুকরের চর্বি লাগানো ছিল। এই রাইফেল ইংল্যান্ডের এনফিল্ড নামক স্থানে স্থাপিত অস্ত্র কারখানায় তৈরি হতো। এই স্থানটি আমি নিজে পরিদর্শন করেছি এবং গরু ও শুকরের চর্বি লাগানোর বিষয়টি যে সত্য তা সেখানকার লোকের মুখেই শুনেছি। গরু হিন্দুদের এবং শুকর মুসলমানদের জন্য হারাম। ধর্ম রক্ষার জন্য তাই উভয় সিপাহীরা জীবনবাজি রেখে বৃটিশদের ন্যায় একটি ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন যাদের সাম্রাজ্যে সূর্যাস্ত হতো না। আমার একথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, যারা এই পরিপত্রটি জারি করেছেন তাদের অনুরোধ করা যাতে তারা ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে খেলা না করেন। আগুন নিয়ে খেললে নিজেকেও জ্বলতে হয়, অন্যরাও জ্বলেন যা আমাদের কাম্য নয়। মেহেরবানি করে পরিপত্রটি প্রত্যাহার করুন এবং নতুন সমস্যার সৃষ্টি না করে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করুন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ